মহঃ নুরুল ইসলাম খান: মহরম ও আশুরার উৎসব খুব ঘটা করে পালিত হল। যদিও এটা কোনও উৎসবের মাস নয়। তথাকথিত আংশিক ধর্মাবলম্বীরা এটাকে উৎসবে পরিণত করেছেন। এ সম্পর্কে আল কোরান, হাদিসে উৎসবের নির্দেশ নেই। যদিও চান্দ্রমাসের প্রথম পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ চারটি মাসের অন্যতম এই মাস। আসলে উৎসব বলে ইদ ও বকরি–ইদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে নীরবে–‌নিভৃতিতে আরাধনা ও উপাসনার কথা। গভীর বেদনাদায়ক ও বিষাদময় কারবালার করুণ ইতিহাসের স্মরণে তাঁদের আত্মার জন্য শান্তি কামনা ও মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার কথা উল্লেখ আছে। আর যেগুলো কঠোরভাবে করতে বারণ করা হয়েছে, কিছু মানুষ সেগুলো বুক ফুলিয়ে করছে এবং ইসলাম ধর্মকে অচ্ছুৎ করে তুলছে। 
সত্যি কথা বলতে কী, পবিত্র মহরম মাসকে কেন্দ্র করে এবারে প্রকাশ্যে সোশ্যাল মাধ্যম–সহ প্রচারমাধ্যমে যা অপকর্ম ঘটল, তা অতীব দুঃখজনক ও শরিয়তের ঘোর বিরোধী। এই অস্ত্রসজ্জিত মিছিল আমাদের মনে বহুবিধ প্রশ্ন সঞ্চার করেছে। এই বাড়বাড়ন্তের কি আদৌ প্রয়োজন ছিল?‌ নাকি এটা অলিখিত কোনও প্রতিযোগিতা!‌ দুঃখিত, মহরমের নামে এই অস্ত্রসাজ মেনে নেওয়া যায় না।
এই বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মাধ্যমে যুদ্ধ যুদ্ধ উন্মাদনা দেখে অবাক হয়ে পড়েছিলাম। বিদ্ধ হচ্ছিলাম বিভিন্ন প্রশ্নবাণে। সত্যিই কি এই লাঠি, তরোয়াল খেলার নাম ইসলাম?‌ কই, ইসলামে কোনও উৎসবকে কেন্দ্র করে এমন বর্বরতার কথা তো কোথাও নেই। বরং কিছু মানুষের অনৈস্লামিক কাজকর্ম ইসলাম ধর্মকে বদনাম করছে, এ কথা হলফ করে বলা যায়। শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য ইসলাম ধর্মের মূল কথা। সেখানে মহরম নিয়ে এই উচ্ছ্বাস ইসলাম ধর্মটাকেই আসামির কাঠগড়ায় তুলেছে। সময় এসেছে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা দরকার। জনমত তৈরি করতে হবে। আমাদেরকেই সামাজিক দায়িত্ব পালন করে মানব সমাজের কল্যাণের কথা ভাবতে হবে। আমাদের জীবনে আর কোনও নবি, রসুল আসবেন না। কোনও বার্তাবাহকও আমাদের সংবাদ দেবেন না। কিংবা কোনও মনীষী হয়ত আর এসে সমাজ সংস্কারের কাজ করবেন না। আমাদের নিজেদেরই এগিয়ে যেতে হবে। 
বিশ্বের অন্যান্য ইসলামি দেশে মহরমের নামে এই অপকর্ম হয় না। তা হলে আমাদের এই নির্বুদ্ধিতা কেন?‌ আমাদের পড়শি দেশ, বাংলাদেশেও এই আদিম উন্মাদনা নেই। সেখানেও অনেক আগে অস্ত্র নিয়ে মিছিল বন্ধ হয়ে গেছে। প্রশ্ন দানা বাঁধে, আমরা পারব না কেন?‌ সব ধর্মেরই মোদ্দা কথা মানবসেবা। মানুষের বিবেকই হল ঈশ্বরের বাণী। তারপরও আমরা অধার্মিক কাজকর্মে মেতে উঠি। আর যেসব কাজকর্ম করতে বলা হয়েছে, তার বিপরীত  করে বসি। গভীর দুঃখের হলেও সত্যি, আমরা পথভ্রান্ত। যে কারণে সারা বিশ্বে মুসলিম ধর্মের মানুষ আজ বিপন্ন। প্রত্যহ, প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছি। মহরমকে কেন্দ্র করে যত ধরনের অপকর্ম কাজ করে চলেছি, এর থেকেও শত গুণ বেশি অনৈস্লামিক কাজ করার ফলে বার বার বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। যদি কোরান, হাদিস অনুযায়ী আমরা দৈনন্দিন জীবন না পালন করি, তা হলে আর বড় বড় বিপদ আমাদের সামনে অপক্ষা করছে। যে ধর্মে একটা পিপীলিকাকেও মারতে বারণ করেছে, সেখানে মহরমকে নিয়ে তথাকথিত বেলেল্লাপনার ন্যায় অস্ত্রের মিছিল ইসলামে কোনওকালেই অনুমোদিত নয়। মানুষকে বিপদে ফেলে, পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে, স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করে, পথশ্রান্ত মানুষকে বিপদগ্রস্ত করে, জরুরি পরিষেবাকে বুড়ো আঙুল দেখানো সভ্যতা নয়।
তারপর পরিবেশ–পরিস্থিতি বদলেছে। গোভক্ষণ–সহ একাধিক ‘‌অপরাধে’‌ গৈরিকবাহিনীর তাণ্ডবে সংখ্যালঘুদের প্রাণ যাচ্ছে। সেখানে এই মধ্যযুগীয় সংস্কার তো আরও বড় বিপদ যে ডেকে আনবে, সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়। রামনবমীতে অমুসলিম সম্প্রদায়ের অস্ত্র মিছিলের জন্য তা হলে আমাদের যুদ্ধ যুদ্ধ রব তুলে লাভ নেই। অনুরূপ কাজের কাজি হলাম। পার্থক্য আর কিছুই রইল না। অত্যাধুনিক সমাজব্যবস্থার পথিক আমরা, সেখানে এই কাজকর্ম প্রকৃতিও মেনে নেবে না। তা ছাড়া বর্তমান মুসলিম সম্প্রদায়ে অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রীর বিকাশ ঘটছে। নামীদামি স্কুল–কলেজ তৈরি হচ্ছে। নজরকাড়া সাফল্যও পাচ্ছে সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা। সেই সুশিক্ষিত নব্য সমাজব্যবস্থায় মহরমের লাঠিখেলা ও তাজিয়া এবং অস্ত্র নিয়ে মিছিল কি মানানসই?‌ অথচ তাজিয়া করার প্রবণতাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে কয়েকটি জায়গা থেকে তাজিয়া বের হত। এখন প্রত্যেক গলি থেকে তাজিয়া বের হয়। 
অধিক কন্যাসন্তান হওয়ার ফলে কিংবা রান্নায় কম লবণ হওয়ার জন্য যখন–তখন নিষ্পাপ মহিলাদের তালাক দেওয়ার প্রবণতা যেমন ধর্মের বদনাম করে, মহরম নিয়ে এই মাত্রাছাড়া উৎসাহও ঠিক তাইই করছে। হ্যাঁ, আমাদের আদিখ্যেতাই কট্টর হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে অক্সিজেন জোগাচ্ছে। এটা যত তাড়াতাড়ি আমরা বুঝব, ততই মঙ্গল।

জনপ্রিয়

Back To Top