২৬ আগস্ট ছিল মাদার টেরিজার জন্মদিন। যিনি বলতেন, ‘‌জন্মসূত্রে আমি আলবেনিয়ান, কিন্তু হৃদয়ে ভারতবর্ষের।’ এই দেশকেই তিনি হৃদয় দিয়েছিলেন। স্মরণ করেছেন অনুপ গুপ্ত।

ঊনবিংশ শতকে এক তেজোদীপ্ত আইরিশ মহিলা মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল আর্ত–পীড়িত ভারতবাসীর সেবায় আত্মনিয়োগ করে হয়েছিলেন সিস্টার নিবেদিতা। কলকাতা ছিল তাঁর প্রধান কর্মভূমি। আর যুগোস্লাভিয়ার অ্যাগনেস গোনশা বোজাশিউ–‌ও সেই ভারতবর্ষেই বাংলার মাটিতে শুরু করেন সেবার কাজ, আর হয়ে ওঠেন ‘মাদার’।
অ্যাগনেসের বয়স যখন আঠেরো, তখন ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম সংস্থা জেসুইট সঙ্ঘ, আর্ত–পীড়িত বাঙালিদের সেবার কাজ করার জন্যে যুগোস্লাভিয়ার জেসুইট সঙ্ঘের কাছে আবেদন করেন কিছু লোক পাঠানোর জন্য। মন আগেই যেন তৈরি হয়ে ছিল অ্যাগনেসের। জেসুইট যাজকদের কাছে আর্জি জানালেন, তিনি যাবেন। এই সময় যোগাযোগ হল আয়ারল্যান্ডের লরেটো সন্ন্যাসিনীদের সঙ্গে। ডাবলিন বন্দর থেকে যাত্রা শুরু হল জাহাজে। সাত সপ্তাহ পর, ১৯২৮–‌এর এক শীতের দুপুরে খিদিরপুর বন্দরে নামলেন অ্যাগনেস। কালো গাউন, গলায় ক্রস, মাথায় বাঁধা কালো রুমাল, হাতে কালো কাপড়ের ব্যাগ আর একটি বাক্স। ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে অ্যাগনেস চললেন মিডলটন রো। সেখানেই লরেটোর সিস্টারদের ‘‌নাজারি’।
১৯২৯–‌এর জানুয়ারিতে দার্জিলিং যেতে হল সন্ন্যাসিনীর প্রশিক্ষণ নিতে। ‘সেন্ট মেরিজ নেভিশিয়েটে’‌ অ্যাগনেস ছিলেন দু’‌বছর। অ্যাগনেস সেবাব্রত গ্রহণ করে সন্ন্যাসিনী হলেন। নতুন নাম হল টেরিজা। সংসারের বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে আর এক বিশাল সংসারের কাজে নিয়োজিত হলেন। ১৯৩১ সালে ফিরে এলেন কলকাতায়। ততদিনে বাংলায় কথা বলা শিখে ফেলেছেন। সেন্ট মেরিজ লরেটো কনভেন্টের বাংলা বিভাগে পড়াতে শুরু করলেন। ১৯৩৭ সালে সেই স্কুলের প্রিন্সিপালও হলেন টেরিজা।
১৯৪২। ভয়াবহ বাংলার মন্বন্তর। অভুক্ত শীর্ণকায় মানুষের পথে পথে অন্নের সন্ধান। এন্টালি কনভেন্টের নিজের ঘরের জানলা দিয়ে মতিঝিল বস্তির অভুক্ত মানুষের কাতর ক্রন্দন টেরিজাকে অস্থির করে তুলেছিল। দেশ জুড়ে তখন সাম্প্রদায়িক হানাহানি। মহাত্মা গান্ধী অনশন করছেন।
১৯৪৬ সালের ১০ ডিসেম্বর দার্জিলিং মেলে বসে অন্তরাত্মার আদেশ টেরিজা শুনেছিলেন— ‘‌দারিদ্র‌্যের মাঝে থাকো। দরিদ্রের সেবা করো।’ টেরিজা মনস্থির করলেন, তিনি সেবার কাজ শুরু করবেন। কিন্তু ক্যাথলিক অনুশাসনে পথে নামার অনুমতি পেলেন না। তখন দাঙ্গার অশান্ত পরিবেশ। তঁাকে যেতে হল আসানসোলের লরেটো কনভেন্টে। ১৯৪৭ সালেই ফের সেবার কাজ শুরু করার অনুমতি চাইলেন। সম্মতি এল ১৯৪৮ সালে। শিক্ষিকার জীবন থেকে ছুটি নিয়ে পাটনা থেকে রোগীর সেবার প্রশিক্ষণ নিলেন। নানের পোশাক ছেড়ে গ্রহণ করলেন নীলপাড় সাদা শাড়ি।
১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট টেরিজা শিক্ষিকার চাকরি ছেড়েছিলেন। স্কুলের বাসস্থান ছেড়ে দিনের পর দিন খুঁজেছিলেন একটি আশ্রয়। কোথাও জায়গা হয়নি এত বড় শহরে। তাই বাধ্য হয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন ২ নম্বর লোয়ার সার্কুলার রোডের সেন্ট জোসেফ স্কুলের সিঁড়ির তলায়।
ইতিমধ্যেই শুরু করেছেন তাঁর সেবার কাজ মতিঝিল বস্তিতে। মাত্র পাঁচ টাকা সম্বল করে সেবার কাজ চলেছে। সুহাসিনী দাস তখন থেকে তাঁর সঙ্গী। তার পর ফাঁকা মাঠে গাছের তলায় দু–চারটি শিশু নিয়ে শুরু হল শিক্ষাদান। মাটিতে দাগ কেটে কেটে বাংলা অক্ষর লিখে দরিদ্র শিশুদের হাতেখড়ি দিতে লাগলেন। একজনের দানে দু–‌একটা বসার জায়গা হল। দু–‌একজন শিক্ষিকাও এলেন এগিয়ে। শিশু ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে লাগল। তখন টেরিজার পাশে দশজন সঙ্গী। ১৪ নম্বর ক্রিক লেনের বাড়িতে জায়গা হল। ছোট্ট একটা ঘর থেকে শুরু হল সেবার কাজ। ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হল মিশনারিজ অফ চ্যারিটি। তার পর কোনও বাধাই আর বাধা নয়। অন্য সন্ন্যাসিনীদের সঙ্গে শুধু নুন–ভাত খেয়ে থেকেছেন। ভিক্ষা করে যে চাল আর সবজি সংগ্রহ হত, তা থেকেই জুটত পথ থেকে তুলে আনা আর্তদের আহার।
এভাবেই এগিয়েছেন। ’‌৫৪–এ আচার্য জগদীশচন্দ্র বোস রোডের বাড়ি থেকে শুরু। একে একে গড়ে উঠেছে কালীঘাটে নির্মল হৃদয়, সার্কুলার রোডে শিশুভবন, টিটাগড়ে, চিত্তরঞ্জনের কাছে সিধাবাড়িতে আর দিল্লিতে কুষ্ঠাশ্রম। সেবার আদর্শ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছে। তার পর অন্য দেশে। একে একে আফ্রিকা, জাপান, পোল্যান্ড, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়ায় গড়ে উঠেছে টেরিজার সেবা প্রতিষ্ঠান। বিত্তবান ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ চাকুরে, রাজা–রানি থেকে দরিদ্র ভিখারি থেকে, সবাই অকাতরে দান করেছেন মাদার টেরিজার কাজ চালু রাখতে। যিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরের কাজ ঈশ্বরই ঠিক করিয়ে নেবেন।
মাদার হাউসের দেওয়ালে ইতস্তত টাঙানো থেকেছে ১৯৬২–‌তে পাওয়া পদ্মশ্রী, অথবা ম্যাগসাইসাই–‌এর মানপত্র। ১৯৭২–‌এ ‘‌সোবিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার’‌, আর ১৯৮০–‌তে ‘‌ভারতরত্ন’। ১৯৮৩–‌তে ব্রিটেনের ‘‌অর্ডার অফ মেরিট’‌ সম্মান। এরই মধ্যে ১৯৭৯–‌তে মাদার টেরিজা পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার। মাদার তাঁর বক্তৃতায় খুব বেশি কিছু না বললেও, মানুষকে ভালবাসার কথা বারবার বলেছিলেন। মাদার টেরিজা কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন ভগবানকে— এবং নোবেল পুরস্কার দানের সংগঠকদের। তিনি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি অনেকের থাকার জন্যে এক বাসস্থান তৈরি করবেন— যেখানে অবহেলিত, দুঃস্থ মানুষ গৃহের শান্তিটুকু লাভ করতে পারবেন। মাদার বিশ্বাস করতেন ভালবাসার স্রোতের সন্ধান মেলে নিজের ঘরে। আর এই বিশ্বাসবোধ থেকেই তিনি নিপীড়িতদের ভালবাসার আর সেবার জন্যে তাদের নিজের ঘর তৈরি করেছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়, এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে। সেই সব ঘরেই তিনি রয়ে গেছেন একটু করে। ভ্যাটিকানের ঘোষণামতো তিনি এখন সেন্ট টেরিজা। কিন্তু আসলে তিনি এখনও মাদার, আতুর অসহায় মানুষের মমতাময়ী মা।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top