দেবাশিস পাঠক: বিরোধিতার সব কণ্ঠস্বরগুলো চাপা পড়ে গেল। উড়ে গেল তাবৎ প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো। স্রেফ সংখ্যার দাসত্ব করে গণতন্ত্র লুটিয়ে পড়ল জাতীয় নিরাপত্তার পদতলে। আপাতদৃষ্টিতে কোনও অসুবিধা নেই। বরং এ হল ভীষণ কাঙ্ক্ষিত, দারুণ ঈপ্সিত একটি অবস্থায় উত্তরণ। কিন্তু, সত্যিই কি তাই? নাকি এক সর্বাত্মক পুলিশি রাষ্ট্রের লক্ষ্যে এ এক অনিবার্য অগ্রগমন? গত এক পক্ষকালের মধ্যে সংসদে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (সংশোধনী) বিল, ২০১৯ পাশ হয়ে যাওয়ার পর এই প্রশ্নগুলোই মস্তিষ্কে ক্রমাগত ঠোক্কর মারছে, মেরেই চলেছে। বিলটি এখন সংসদের উভয় কক্ষে পাশ হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায়। তারপর আর একটিমাত্র ধাপ। বিজ্ঞপ্তি জারি। ব্যস! তারপরই হয়তো এটা হয়ে উঠবে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার প্রধানতম হাতিয়ার, দেশ বাঁচানোর একমাত্র আইন। হয়তো বলছি কেন? হবে, এমনটা হবেই। গতিপ্রকৃতি অন্তত তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ব্যাপারটা ঠিক কি হল, আর কি হতে চলেছে , তা টের পেতে হলে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া দরকার এই সংশোধনীতে যে যে পরিবর্তনগুলো আনা হল, সেদিকে।
যা ছিল
২০০৯ সাল। ২৬/১১–‌তে মুম্বইতে সন্ত্রাসবাদী হামলা। গোটা দেশ স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ। বারুদ গন্ধ আর রক্ত গায়ে মেখে ফুঁসছে, রাগে ও অসহায়তায়। সেই কর্কটক্রান্তির বেলায়, হানাদারির ৩৫ দিনের মধ্যে তৈরি হল ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি, সংক্ষেপে এনআইএ। তার জন্য সেদিন সংসদে পাশ হয়েছিল দুটো বিল, ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বিল ও আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ (প্রিভেনশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল। এনআইএ–‌র ডিরেক্টর জেনারেল ওয়াই সি মোদির কথা যদি মেনে নিই, তবে এনআইএ ২০০৯ থেকে ২০১৮–‌র জুন–‌জুলাই অবধি ১৮৫টি কেস ফাইল করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ১৬৭ জন। সাফল্যের হার চোখ ধাঁধানো, ৯৫ শতাংশ।
এই সময়কালে ঠিক কী কী কাজ করেছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি?
হালকা চালে বলতে গেলে এনআইএ–‌র গোয়েন্দাদের কাজ অনেকটা দেশি জেমস বন্ড গোছের, কিংবা বলা চলে ‘এক থা টাইগার’–‌এ সলমন খানের মতো। সে কাজে সাফল্য এলে আমরা কাগজে হেডলাইন দেখি:‌ ‘বোমা বাঁধতে গিয়ে এনআইএ–‌র হাতে ধরা পড়ল দুজন’। আর ব্যর্থ হলে পুলওয়ামার মতো কাণ্ড ঘটে। দেশের যে কোনও অংশে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হতে পারে এরকম যে কোনও ঘটনার তদন্তে নামতে পারে এনআইএ। বোমা বিস্ফোরণ থেকে বিমান ছিনতাই, পরমাণু কেন্দ্রে হামলার ঘটনা থেকে জাহাজ ছিনতাই, সব কিছু নিয়ে তদন্তের ক্ষমতা আছে এনআইএ–‌র।
কারা চালান এই তদন্ত?
এনআইএ–‌র সরকারি ওয়েবসাইটের ভাষ্য অনুযায়ী, ইন্ডিয়ান রেভেনিউ সার্ভিস, আয়কর বিভাগ, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, রাজ্য পুলিশ এবং আইপিএস আধিকারিকদের মধ্যে থেকে নিজেদের অফিসারদের বেছে নেয় এই তদন্তকারী সংস্থা। তদন্তের স্বার্থে এই অফিসাররা যে কোনও পুলিস অফিসারের মতোই ক্ষমতা ও সুযোগ–‌সুবিধা ভোগ করেন। এই অফিসারদের রুজু করা মামলার বিচার হয় এনআইএ–‌র বিশেষ আদালতে, জরুরি ভিত্তিতে। দেশে এরকম বিশেষ আদালতের সংখ্যা ৩৮টি। দরকার বোধ করলে রাজ্য সরকারগুলো এরকম আদালতের সংখ্যা বাড়াতেও পারে। সে ক্ষমতা তাদের আছে।
২০১৮–‌র অক্টোবরে এনআইএ–‌র তরফে একটি ‘সন্ধান চাই’–‌এর তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সেটাই সংস্থার তরফে প্রকাশিত এরকম শেষ তালিকা। সেটিতে ১৫ জন মহিলা–‌সহ ২৫৮ জনের নাম ছিল। সর্বোচ্চ পুরস্কার মূল্য ঘোষণা করা হয়েছিল মাওবাদী সংগঠনের নেতা মুপাল্লা লক্ষ্মণ রাও ওরফে গণপতির জন্য।
যা হল
নয়া সংশোধনীতে মূলত তিনটে বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এদের মধ্যে দুটি বিষয় একেবারেই নিরামিষ।
এক, এবার থেকে এনআইএ–‌র অফিসাররা ভারতের বাইরেও সঙ্ঘটিত কোনও ভারতবিরোধী কার্যকলাপের বিষয়ে তদন্ত করতে পারবে। এ নেহাতই পর্বতের মূষিক প্রসব। শুনতে যতই ভাল লাগুক, এতে কাজের কাজ কিছু হওয়ার সুযোগ কম। কারণ, আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইন এ ব্যাপারে পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
দুই, এতদিন পর্যন্ত এনআইএ–‌র মামলাগুলোর বিচারের জন্য কেন্দ্র বিশেষ আদালত তৈরি করতে পারত।  নয়া সংশোধনী তাদের যে কোনও সেশন কোর্টকে ওরকম মামলার বিচারের ভার দেওয়ার অধিকার দিয়েছে।
তৃতীয় বিষয়টাই মারাত্মক। এটা অপরাধের প্রকৃতি সংক্রান্ত বদল। এতদিন এনআইএ পরমাণু শক্তি আইন, ১৯৬২ এবং বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধক আইন, ১৯৬৭–‌র মতো আইনি বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করত। নয়া সংশোধনী কার্যকর হলে এই তদন্তকারী সংস্থার কাজের পরিধিতে ঢুকে পড়বে আরও কিছু বিষয়। যেমন, মানুষ পাচার, জাল টাকা তৈরি, বেআইনি কিংবা নিষিদ্ধ অস্ত্র কেনাবেচা, সাইবার সন্ত্রাস ইত্যাদির মতো বিষয়। সেই সঙ্গে ১৯০৮–‌এর বিস্ফোরক বস্তু সংক্রান্ত আইনের আওতাভুক্ত বিষয়গুলো।
আপাতদৃষ্টিতে দেখলে, এগুলো এনআইএ–‌র কাজের আওতায় আসাটা স্বাভাবিক। কারণ এগুলোর সঙ্গে লেপ্টে আছে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। কিন্তু গোল বেধেছে অন্য জায়গায়। কোন কোন ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত আর কোন কোন ক্ষেত্রে নয়, সেটার কথা কোথাও সুস্পষ্ট করে বলা হয়নি। অথচ এনআইএ–‌র সংশোধনী মোতাবেক, এই তদন্তকারী সংস্থা ‘ভারতের স্বার্থ বিরোধী’ যে কোনও বিষয়ে তদন্ত করতে পারে। যে যে আইন সংক্রান্ত বিষয়গুলো এনআইএ–‌র কাজের পরিধিতে পড়ে, সেগুলোর কোত্থাও ‘ভারতের স্বার্থবিরোধী কাজের’ কোনও সংজ্ঞা দেওয়া নেই। এনআইএ আইনও এ ব্যাপারে নীরব। এখন, পাড়ায় ছেনো গুন্ডা বোমা বাঁধলে সেটা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন, জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু নয়। এটা সহজেই বোধগম্য একটি বিষয়। কিন্তু স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে এনআইএ–‌কে লেলিয়ে দেওয়া হতে পারে ছেনো মস্তানের ডেরাতেও। মুশকিলটা সেখানেই। এমন কাজ তো আদতে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে তছনছ করে রাজ্যের পরিসরে কেন্দ্রের ঢুকে পড়া। দিল্লির মাতব্বরদের ক্ষমতার পরিধি বাড়ানো। রাজ্য সরকারকে নস্যাৎ করে দিয়ে আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিপত্য কায়েম।
প্রশ্ন উঠতে পারে, উঠতেই পারে, ছেনোর বোমা বাঁধা আটকানোটাই তো মোদ্দা কথা। সে কাজ কেন্দ্র করল না রাজ্য, তাতে কী–‌ই বা আসে যায় ! আসল কথাটা হল, আমরা, ছাপোষা মানুষগুলো তো বেঁচে গেলাম। ঠিক কথা। কিন্তু এ ব্যাপারে একটা আঁশটে গন্ধ আছে। সেটা আছে বিজেপি-র অতীত রেকর্ডের কারণে। এই ধরুন না কেন গোয়ার কথা। আটানাশিও ‘বাবুশ’ মনজারেটের কথা। অজস্র অভিযোগ, অগুন্তি মামলা তাঁর নামে। ২০১৬–‌তে নাবালিকাকে ধর্ষণের কলঙ্কও তেনার মাথায়। মাস দুয়েক আগেও, পানাজির উপনির্বাচনে বিজেপি-র স্লোগান ছিল, ‘বাবুশ হটাও, গোয়া বাঁচাও’। স্লোগানটা কাজে আসেনি। বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়ে বাবুশ বিধায়ক হন। আর দুমাস পর সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। বিজেপির আলিঙ্গনে এখন আবদ্ধ আটানাশিও ‘বাবুশ’ মনজারেট। তাঁর স্ত্রী জেনিফার এখন মন্ত্রী। বাবুশের বিরুদ্ধে তাবৎ অভিযোগ এখন ঠান্ডাঘরে লুডো খেলছে।
রাজ্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে জলাঞ্জলি দেওয়া, এসব শক্ত শক্ত কথার পাশাপাশি এরকম রত্নাকর–‌বাল্মীকি লুকোচুরি খেলাতেও এনআইএ–‌কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানোর শঙ্কার চৌহদ্দিটাও বড় কম নয়।
তার সঙ্গে রয়েছে ‘শহুরে নকশাল’ সংক্রান্ত বিষয়। যে কোনও বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নকশাল বার্তা বলে দেগে দেওয়াটাই এখন দস্তুর। আশঙ্কা, যা আদৌ অমূলক নয়, এবার সেই রীতি নয়া সংশোধনীর দৌলতে সিলমোহর পেয়ে গেল।
মনে পড়ে যাওয়া একটি কথা
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল একটা কথা। নরেন্দ্র মোদির শাসনাধীন গুজরাট। সে রাজ্যের দশম শ্রেণির ইতিহাসের পাঠ্যবইতে গান্ধীর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিলেন নাৎসি হিটলার। সেখানে বলা হয়েছিল, হিটলারের নীতি অতি অল্প সময়ের মধ্যে জার্মানিকে সম্মান ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। বেকারত্বের অবসান ও পরিকাঠামো নির্মাণে হিটলারের নীতি দারুণভাবে সফল হয়। নাৎসি জার্মানির কদর্য ইতিহাসকে আড়াল করে হিটলারি নীতির কদর করতে ওই বইতে ব্যবহার করা হয়েছিল পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।
সেদিন যাঁরা গুজরাটের শাসক ছিলেন, আজ তাঁরাই দেশের মাথায়। এনআইএ–র সংশোধনী তাই কেন জানি না মনে হচ্ছে, এদেশের বুকে হিটলারি জমানা নিয়ে আসার লক্ষ্যে একটা বড়সড় পদক্ষেপ। সাধু সাবধান।‌

জনপ্রিয়

Back To Top