অশোককুমার মুখোপাধ্যায়: একশো-হাজার অসংখ্য প্রতিশ্রুতি ফেল করবার পর মোদিরাজা সেই জানাচেনা হাল্লারাজার পথই ধরেছেন। প্রতিনিয়ত প্রচারিত হচ্ছে ‘হিন্দুপ্রেম’ জাগাবার খবর,‘দেশপ্রেম’ জাগাবার আস্ফালন। ২৬ ফেব্রুয়ারি বালাকোটে বিমান হানার পরই প্রচারের উত্তাপ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েক ডিগ্রি। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সচিব বিজয় গোখেল নিহত সন্ত্রাসবাদীর সংখ্যা না বলে চমৎকার ভাষায় বলেছিলেন--‘ভেরি লার্জ নাম্বার্স অফ টেররিস্টস হ্যাভ বিন এলিমিনেটেড।’ কিন্তু ভাষার ওই চমৎকারিত্ব নষ্ট হল, ঘটনার ফয়দা তুলতে মোদি সহ অন্যান্য বিজেপি
নেতাদের রাজনৈতিক সভায় ভাষণ দিতে নেমে পড়ায়। শুরু হল সংখ্যার ফুলঝুরি। এক-একজন একেকরকম সংখ্যা বলতে থাকলেন। অমিত শাহ বললেন ২৫০ জঙ্গি খতম,যোগী আদিত্যনাথ বললেন ৪০০। মোদি সরকারের বন্ধু টিভি চ্যানেলগুলিও ‘সূত্র’ উদ্ধৃত করতে বলতে শুরু করল সংখ্যা--তিনশো, সাড়ে তিনশো, চারশো এমনকী পাঁচশো।
যারা সংবাদমাধ্যমে খবর প্রচার করার কাজের সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত তারা জানেন প্রেস বিজ্ঞপ্তির বাইরে কিছু প্রচার করতে গেলে, তা করা হয় ‘অফ দ্য রেকর্ড’ মন্তব্যের নির্ভরে এবং ‘খাওয়ান হয়’ বন্ধু সংবাদমাধ্যমকে, যারা ‘বিশ্বস্ত সূত্রে’ পাওয়া খবর হিসাবে তা চালিয়ে দেন। সেক্ষেত্রে খবরদাতার দায় থাকে না ওইসব তথ্যের সত্যতা প্রমাণের। ঝামেলায় পড়লে যাতে কথা পালটান যায় তার জন্যই এমন ব্যবস্থা।সব সরকারের মন্ত্রী আমলা এবং কিছু নামী কোম্পানির প্রচারবিভাগ এই অফ দ্য রেকর্ড খবর ছড়িয়ে থাকে। তবে বিজেপি এই খেলাটা রপ্ত করেছে ভালোই। অন দ্য রেকর্ডের পাশাপাশি অফ দ্য রেকর্ডের খেলা! এক বুধবার সকাল ১১:৪৯-এ পাকিস্থানের সামরিক বিভাগের মুখপাত্র সরকারিভাবে ঘোষণা করলেন বায়ুসীমানা অতিক্রম করবার জন্য পাক বায়ুসেনা দুটি ভারতীয় বিমানকে গুলি করে নামিয়েছে।
এবং একজন পাইলট গ্রেপ্তার। বিকেল ৩:১৫’তে ওই সংবাদের সত্যতা স্বীকার করবার আগে এমন গুরুত্বপূর্ণঘটনার কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি ভারতের দিক থেকে। আগের রাতে মোদি ৮০০ কেজি ওজনের ভাগবত গীতা উদ্বোধন করেছেন। সকালে তিনি খেলো ইণ্ডিয়া অ্যাপ উদ্বোধন নিয়ে ব্যস্ত। রাজনাথ সিং ছত্তিশগড়ে গিয়ে দলের সমাবেশে বোঝাচ্ছেন আগামী নির্বাচনে ভালো করে খাটতে হবে! প্রথম যে প্রতিক্রিয়া ভারতের দিক থেকে এসেছিল, তা নির্বাচিত বন্ধু সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একটি অসরকারি, ‘অফ দ্য রেকর্ড’ মন্তব্য--‘ভারতীয় বায়ুসেনার প্রতিটি পাইলট
ঠিকঠাক আছে।’ যেহেতু সূত্রের খবর হিসাবে এই সংবাদ প্রচারিত অতএব এই বক্তব্যের কোনও দায় নিতে হবে না সরকারকে। বস্তুত, লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিজেপি এইভাবেই তার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।এরই সঙ্গে শুরু হয়েছে অর্থনীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানের কাজে
যুক্ত যে-সব প্রতিষ্ঠান, তাদের কাজে হস্তক্ষেপ। যে পরিসংখ্যান সরকারের অনুকূল নয়, তাকে চেপে যাওয়া হচ্ছে। সারা বিশ্বে সুনাম আছে যে সংস্থাগুলির তাদেরকেও নিজেদের ভৃত্য বানাবার চেষ্টা! এ ঘটনা অভূতপূর্ব, অবৈজ্ঞানিক! পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে বলার অপরাধে গ্যালিলিওর মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল স্বৈরাচারী ‘সমাজপালক’, এ ঘটনা তারই সমতুল। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শতাধিক নামী অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সচেতন হবার ডাক দিয়েছেন। কিন্তু মোদি সরকার তাদের কথা শুনবে কী না সন্দেহ।কারণ, রাজপাট চালনার এই সুচারু শিল্পকলা মোদি শিখেছেন ইতিহাস পড়ে। তার তিন শিক্ষক--বেনিটো মুসোলিনি, অ্যাডলফ্‌ হিটলার আর পল জোসেফ গোয়েবেলস। মুসোলিনি বলেছিলেন ফ্যাসিজম আর কর্পোরেটিজম একই কথা। রাষ্ট্র আর কর্পোরেট ক্ষমতার একাত্মকরণ। মহাজ্ঞানী মুসোলিনির পথে চলেই মোদি চেয়েছেন ভারত নামক রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে আম্বানি আদানি নীরব মোদি মেহুল চোকসি প্রমুখের ক্ষমতার মেলবন্ধন ঘটাতে। এইজন্যেই হয়তো তাদের কিছু দাক্ষিণ্য বিতরণ করতে হয়েছে! মুসোলিনি আর একটি কথাও বলেছিলেন--অসামরিক নাগরিকের সঙ্গে একজন সৈনিকের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক। অতএব প্রতিটি অসামরিক মানুষকে সৈনিক করে তুলতে চেয়েছেন মোদিরাজা। এক নামী জাতীয় টিভি চ্যানেলের সমীক্ষা অনুযায়ী গত চার বছরে মোদি জমানায় নেতাদের ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনা বেড়েছে ৫০০ শতাংশ।ফলশ্রুতিতে আমাদের চোখের সামনে ঘটে গেছে গৌরী লঙ্কেশ-কালবুর্গি-দাভোলকর-পানসারে-আখলাখ-প্রদীপ রাঠোর প্রমুখের হত্যা। বিজেপির প্রভাবে সাধারণ মানুষ এখন সৈনিক! বিরুদ্ধ মত হলেই সে দেশদ্রোহী। অতএব তাকে খতম করা যায়--শারীরিকভাবে অথবা মানসিকভাবে। সাংবাদিক স্বাতী চতুর্বেদী বিশদে লিখেছেন বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া’র সৈনিকেরা কীরকম সংগঠিত ভাবে অশালীন ভাষায়,
কদর্য ভঙ্গিতে প্রতিবাদী, যুক্তিবাদী মানুষজনকে আক্রমণ করে। কীভাবে মানসিকভাবে নিপীড়ন, খতম করতে উদ্যোগ নেয়। আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জানালেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। (আই অ্যাম আ ট্রোল) ১৯৩২ সালের প্রারম্ভে ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি, ডাক নামে যাদের নাৎসী বলা হত, তাদের দুশ্চিন্তা ছিল, হাতে টাকা নেই ভোট লড়া হবে কেমন করে? ২৭ জানুয়ারি হিটলার শিল্পপতিদের সামনে আড়াই ঘণ্টা ধরে নাটুকে ভঙ্গিতে বক্তৃতা দেন। বিরতিহীন। ব্যস, নাৎসী পার্টির কোষাগার ভরে উঠল। কারণ,শিল্পপতিরা বুঝে গেলেন এতদিনে এমন লোক পাওয়া গেছে, যে কমিউনিজমের বিপদ থেকে, ট্রেড ইউনিয়নের দাবি দাওয়ার হাত থেকে তাদের বাঁচাবে। কারণ, বক্তৃতায়
হিটলার দুটি খুব দরকারি কথা শিল্পপতিদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন--মশায়রা, আপনাদের মধ্যে যারা মনে করেন ন্যাশনাল সোশালিস্টদের কোনও কিছু করবার মুরোদ নেই, তারা নিজেদের ঠকাচ্ছেন। আমরা আজ না থাকলে জার্মানিতে বুর্জোয়া শ্রেণীর কোনও অস্তিত্ব থাকত না। বলশেভিজম সব গ্রাস করে নিত। আমরাইসিদ্ধান্ত নিয়েছি জার্মানির মাটি থেকে মার্কসিজমকে মূল শুদ্ধ উপড়ে ফেলবার।
দ্বিতীয় যা বলেছিলেন--আগামী দিনে জার্মানির প্রতিটি রাস্তা আমরা উদ্ধার করব জার্মানদের জন্য, আর কেউ থাকবে না। এই পাঠ নিয়ে মোদিও মাঝে মধ্যেই বলে থাকেন ‘নক্সালিজম’ দেশের সবচেয়ে বড় বিপদ। বিজেপি-আর এস এস হিন্দুত্বের হুংকার ছাড়ে। মুসলমানদের খতম করবার আহ্বান ছুঁড়ে দেয়। ঠারেঠোরে বোঝাবারচেষ্টা চলে ভারত হল হিন্দুদের জায়গা, মুসলমানরা কেটে পড়।তবে অফ দ্য রেকর্ডে মিথ্যা গুঁজে দেবার শিক্ষাটা গোয়েবেলস-এর থেকে নেওয়া--‘যদি একটা বড় নির্জলা মিথ্যে বারবার বলতে থাক, বারবার, মানুষ ক্রমশ তা বিশ্বাস করবেই। ততক্ষণ অবধিই এই মিথ্যে ধরে রাখা যাবে, যতক্ষণ রাষ্ট্র তার জনগণকে এই মিথ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক পরিণামের ধাক্কা বুঝতে দেবে না। এইজন্যই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে সর্বশক্তি দিয়ে দমন করা রাষ্ট্রের পক্ষে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সত্যের সঙ্গে মিথ্যার কাটাকাটির সম্পর্ক এবং সত্যই হল রাষ্ট্রের সবথেকে বড় শত্রু।’ অতএব আর কোনও উপায় নেই। মোদিরাজাকে এমনভাবেই সত্যের টুঁটি চেপে ধরে, মিথ্যার প্রচার-প্রসার, দমন-পীড়ন করে যেতেই হবে। কেউ-কেউ বলছেন, ভোটের আগেই আবার একটা সার্জিকাল স্ট্রাইকের বন্দোবস্ত করতেই হবে মোদিকে। মিথ্যা বজায় রেখে ভোট
জিততে হবে যে! তবে মোদিসাহেব একটা পাঠ নিতে ভুলে গেছেন সম্ভবত। সেই যে দাড়িওলা জার্মান সাহেব, কার্ল মার্কস, কবেই বলেছেন, ইতিহাসের পুনরভিনয় হয় ঠিকই, কিন্তু তা হয় প্রহসন হিসাবে। দেশবাসী সেই প্রহসন দেখার অপেক্ষায়।

জনপ্রিয়

Back To Top