হাসানুল হক ইনু: ‘বেইমানের ক্ষমা নাই; সাপের শেষ রাখতে নাই’— এই কথাটা স্মরণে রাখতে আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার ওমর চাচা।
ওমর চাচার সতর্ক বাণীর যথার্থতা অনুধাবন করতে পারলাম যখন ১৫ আগস্ট, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু হত্যা একটা বড় কলঙ্কজনক ঘটনা। একটা ঐতিহাসিক বিরাট বেইমানির ঘটনা। ১৯৭৫ সালে যখন এই কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটে, তখন ওপারে কলকাতায় লেখক অন্নদাশংকর রায় তাঁর বন্ধু ও কথাসাহিত্যিক মনোজ বসুকে ফোনে বলেন, ‘আসুন আমরা দুজনে বসে কাঁদি’। তাঁদের কান্না পেয়েছিল, আর বাংলাদেশের মানুষ স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল।
১৯৭৫ সালে শুধু একজন মানুষ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা ঘটেনি। ঘাতকরা, অবৈধ দখলদাররা, সামরিক শাসকরা জাতির আত্মাকে হত্যার প্রচেষ্টা চালায়। সাম্প্রদায়িকতার ছুরিতে বিদ্ধ হয় জাতির আত্মা। রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ১৯৭৫ থেকে একুশ বছরের সামরিক শাসন বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত করে রাখে। ১৯৯৬ সালে নির্বাসন থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন শুরু হয় যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। 
১৫ আগস্টের কলঙ্কজনক ঘটনা ছাড়াও বাংলাদেশের বুকে আরও চারটি কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটে। তা হল, ১৯৭১–এ মহাযুদ্ধের মাঠে যুদ্ধাপরাধের ঘটনা, ১৯৭৫ থেকে উপর্যুপরি অবৈধ ক্ষমতাদখল ও সামরিক শাসনের ঘটনা, সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল চার নীতি ছেঁটে ফেলা ও সাম্প্রদায়িকতা আমদানি এবং ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা–সহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলার ঘটনা। এই পাঁচ কলঙ্কের ছাপ ললাটে নিয়ে তাই বাংলাদেশ এগুনোর চেষ্টা করেছে।
আজও বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িকতার ছুরিতে বিদ্ধ জাতির আত্মার রক্তক্ষরণ ও পাঁচ কলঙ্ক মোছার কঠিন সংগ্রামের ভেতর বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবস পালন করছে। এখনও সাম্প্রদায়িকতার, সামরিক শাসনের সকল চিহ্ন মোছা শেষ হয়নি। এখনও সামরিক শাসকদের “একটু গণতন্ত্র, একটু ধর্মতন্ত্র, একটু সামরিকতন্ত্র”–এর গোঁজামিল তত্ত্ব রাজনীতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তির ধূম্রজাল ছড়াচ্ছে। এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে চিনলেই বাংলাদেশকে চেনা হবে। বঙ্গবন্ধু কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি নন। বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন— একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, একটি দেশ, বাঙালি জাতীয়তার একটি মহাকাব্য, একটি আন্দোলন, জাতি নির্মাণের কারিগর, ঠিকানা প্রদানের সংগ্রাম, একটি বিপ্লব, একটি অভ্যুত্থান, একটি ইতিহাস, বাঙালি জাতির ধ্রুবতারা: জাতির উত্থান রাজনীতির কবি, জনগণের বন্ধু, রাষ্ট্রের স্থপতি, স্বাধীনতার প্রতীক, ইতিহাসের মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।
১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক ভুল শোধরান বঙ্গবন্ধু। যে হিন্দু ও মুসলিম ভারতে আলাদা হয়ে পড়ে, সেই তাদের সবাইকে একত্রিত করে এক অখণ্ড-বাঙালি জাতিতে পরিণত করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান।” 
বাংলাদেশের জনগণকে বঙ্গবন্ধু তিন ধাপে তাদের পরিচয় সাজাতে বললেন, আগে মানবতা, তারপর জাতিসত্তা, তারপর ধর্ম। এটাই হল বঙ্গবন্ধু–রচিত বাঙালির বাংলাদেশ উত্থানের, প্রতিষ্ঠার, স্বশাসনের স্বাধীনতার মহাকাব্য। সবাই বাঙালি হয়ে গেল। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি-তত্ত্বের আলখাল্লা ফেলে দিল। 
১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর তিন নেতার মাজার প্রাঙ্গণে সোহরাওয়ার্দির মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন “আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তান না শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।”
১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান সৌদি বাদশা ফয়সালের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। আমি জানতে চাই, কেন সৌদি আরব স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি দেয়নি?’
বাদশা ফয়সাল বলেন, “আপনি সৌদি আরবের স্বীকৃতি পেতে হলে বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’  করতে হবে।”
বঙ্গবন্ধু জবাব দেন, “এই শর্ত বাংলাদেশে প্রযোজ্য হবে না। বাংলাদেশের জনগণের প্রায় অধিকাংশই মুসলিম। আমাদের প্রায় এক কোটি ভিন্ন ধর্মের নাগরিকও রয়েছে। সবাই একসাথে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে বা যুদ্ধের ভোগান্তিতে পড়েছে। তাছাড়া সর্বশক্তিমান আল্লাহ শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্যই নন। তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা। তাছাড়া আপনার দেশের নামও তো ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব সৌদি আরব’ নয়। আরব বিশ্বের একজন গুণী ও খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ প্রয়াত বাদশা ইবনে সৌদের নামে নাম রাখা হয়েছে ‘কিংডম অব সৌদি আরব’। আমরা কেউই এই নামে আপত্তি করিনি।”  
জাতির পিতার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বও ছিল বিস্ময়কর। নাইজেরিয়ার জেনারেল ইয়াকুব গাওয়ান যখন বললেন, ‘অবিভক্ত পাকিস্তান একটি শক্তিশালী দেশ, কেন আপনি দেশটাকে ভেঙে দিতে গেলেন।’ উত্তরে শেখ মুজিব বললেন, “শুনুন মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনার কথাই হয়তো ঠিক, অবিভক্ত পাকিস্তান হয়তো শক্তিশালী ছিল। তার চেয়েও শক্তিশালী হয়তো হত অবিভক্ত ভারত। কিন্তু সে সবের চেয়েও শক্তিশালী হত সংঘবদ্ধ এশিয়া, আর মহা শক্তিশালী হত একজোট এই বিশ্বটি। কিন্তু মহামান্য রাষ্ট্রপতি, সব কিছু চাইলেই কি পাওয়া যায়।”
বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার ভিত্তিতে স্বশাসনের পক্ষে দাঁড়াতে ঘোষণা দিলেন; সামরিক স্বৈরতন্ত্র হঠানোর কথা বললেন; গণতন্ত্রের ওপর দাঁড়াতে বললেন। গণসংগ্রাম-নির্বাচন-সশস্ত্র যুদ্ধ এই তিনের অপূর্ব সমন্বয় করলেন। ১৯৭০–এর নির্বাচনকে গণরায়ে রূপান্তর করলেন। অসহযোগ আন্দোলনের নামে স্বশাসিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন। নিরস্ত্র জনগণের সশস্ত্র সংগ্রামের মানস গঠনের রাজনীতি উপহার দিলেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। বঙ্গবন্ধু তাই আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক আর বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু অভিন্ন সত্তা।
ফরাসি লেখক মালরোর জীবনের শেষ রচনায় দেখিয়েছেন, একজন শিল্পীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে, তাঁর পায়ের আঙুলগুলো কোনওরকমে একটু মাটি স্পর্শ করে আছে। শিল্পী তাঁর স্বভাব অনুযায়ী ওই অবস্থাতেই আঙুল দিয়ে কয়েকটি ইঁদুরের ছবি আঁকেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, ইঁদুরগুলো অলৌকিকভাবে প্রাণ পেয়ে গেল এবং ফাঁসির রজ্জু কেটে শিল্পীকে মুক্ত করে দিল। বঙ্গবন্ধুর পায়ের আঙুলগুলো যদি মাটি স্পর্শ করত, তাহলে কী হত? বঙ্গবন্ধু পায়ের আঙুল দিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্রই আঁকতেন। যে মানচিত্র জুড়ে থাকত বঙ্গবন্ধুর বিশাল শরীর। কবি রফিক আজাদের ভাষায়, ‘স্বদেশের মানচিত্র জুড়ে পড়ে আছে বিশাল শরীর।’
কবি বাবলু জোয়ার্দারের ভাষায়—
“সে ছিল দীঘল পুরুষ—
হাত বাড়ালেই ধরে ফেলতো
পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল,
সাড়ে সাত কোটি হৃদয়,
ধরে ফেলতো বৈশাখী মেঘ অনায়াসে।”
বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর অন্নদাশংকর রায় লিখেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান সাধারণ রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন জাতির জনক। পদত্যাগ নয়, দেহত্যাগই জাতির জনকের অন্তিম কর্তব্য।” 
কিন্তু এখনও দেশ কলঙ্কমুক্ত নয়। এখনও সাম্প্রদায়িকতার ছুরিকাবিদ্ধ জাতির আত্মার রক্তক্ষরণ হচ্ছে, যুদ্ধ এখনও চলছে। বঙ্গবন্ধুর স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন কেবল তখনই নিরাপদ হবে যখন বাংলাদেশের কপাল থেকে যুদ্ধাপরাধ, বঙ্গবন্ধু হত্যা, সামরিক শাসন, সংবিধান থেকে চার মূলনীতির বিসর্জন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা- এ পাঁচ কলঙ্কের ছাপ মোছা হবে, জাতির আত্মায় বিদ্ধ সাম্প্রদায়িকতার ছুরিটাকে সম্পূর্ণরূপে টেনে তুলে রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হবে, অপসৃত হবে বৈষম্যের পাহাড়। সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই বাংলাদেশ অন্ধকার থেকে আলোর পথে হাসতে হাসতে দাঁড়াবে।
প্রাবন্ধিক: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমন্ত্রী ও 
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল— জাসদ সভাপতি

জনপ্রিয়

Back To Top