‌‌তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: স্বাধীনতার বাহাত্তর বছর পরেও, কয়েক হাজার বড়, মাঝারি ও ছোট নদী বাঁধ ও জোড় বাঁধার পরও আজও আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। বিশেষত, বর্ষাকালে। কখন বৃষ্টি শুরু হবে। আজও ভারতের বৃহত্তম অংশের প্রকৃত সেচ ব্যবস্থা বর্ষার জল–‌নির্ভর। যে চেন্নাই ২০১৩ সালের বন্যায় ডুবে গিয়েছিল সেই চেন্নাইয়ের এক কোটি ১১ লক্ষ মানুষ আজ জলের ট্যাঙ্কার কখন আসবে তার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে বাধ্য। ওই ট্যাঙ্কারের কিছু আসবে দক্ষিণ–‌পশ্চিমের কেরল থেকে, বাকিটা তামিলনাড়ুরই উত্তর–‌পূর্বের ভেলোর থেকে। ছ’‌বছর আগেও যে মহানগর অতি বর্ষণে ভেসে গিয়েছিল এবার সেই নগরেই জলের জন্য হাহাকার। একই সত্য কলকাতা, মুম্বই, দিল্লির মতো মেট্রোপলিটন শহরগুলির ক্ষেত্রে। গঙ্গার পাড়ে কলকাতা, যমুনার পাড়ে দিল্লি, আরব সাগরের কূলে মুম্বই, তবু বর্ষায় বৃষ্টি চাই–‌ই চাই। আর এ তো গেল পানীয় জলের কথা। খেতের জন্য, ফসলের জন্য সেচের হাল যে এই ২০১৯–‌এও বর্ষার বৃষ্টি–‌নির্ভর। এ সত্য ভারত সরকারের চেয়ে ভাল আর কে জানে?‌
তিস্তা এই মুহূর্তে ভারত–‌বাংলাদেশ দুয়ের গলার কাঁটা হয়ে আছে। শুরু সেই ১৯৭২–‌৭৩ সালে, যখন কংগ্রেসের সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। জলপাইগুড়িতে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলের প্রান্তে গাজোলডোবায় ব্যারেজ তৈরি করা হয়ে গেছে সেই গত শতাব্দীর সাতের দশকেই। কিন্তু ওই ব্যারেজের রিজার্ভারের জল উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির মাঠে মাঠে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দু’‌দিকে যে খাল কাটার কথা ছিল, তার একদিকের কাজ আংশিকভাবে হলেও, অন্যদিকের কাজ বলতে গেলে অসম্পূর্ণ। সম্ভবত তিস্তা উপত্যকা নদী প্রকল্পই এই মুহূর্তে গোটা পৃথিবীতে দীর্ঘস্থায়ী নদী বাঁধ প্রকল্প। ১৯৭২–‌৭৩ থেকে ২০১৯, একুনে ৪৬ বছর।
প্রায় সমপর্যায়ে নদী বাঁধ প্রকল্প নর্মদা উপত্যকা বাঁধ। ৩০টি বড়, ১৩৫টি মাঝারি ও ৩০০০ ছোট বাঁধ নিয়ে এই প্রকল্পটির সম্পূর্ণ হওয়ার কথা। বহু বাদ–‌বিসম্বাদ, রাজ্যে রাজ্যে কাজিয়ার শেষে নর্মদা রিভার ভ্যালি ডিসপিউট রিড্রেসাল ট্রাইব্যুনালের রায়ে ১৯৭৯ সালে কাজ শুরু হয়। ২০০৬ নাগাদ গুজরাটে সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণ কোর্টের রায়ে যখন শেষ হয়, ততদিনে পার হয়ে গেছে সাতাশটি বছর। তিনটি রাজ্যের— মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের চার কোটি মানুষ, প্রকল্প অনুযায়ী সেচের ও পানের জল পাবেন। চলতি জুন মাসের শেষ সপ্তাহের শুরুতে বর্ষার বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ ও মারাঠাওয়াড়ার খেতের পর খেত ঝলসে যাচ্ছিল। কাগজে সে সব ফুটিফাটা চাষের জমি, সঙ্গে অসংখ্য বলিরেখায় আচ্ছন্ন বৃদ্ধচাষির মুখের ছবিও বেরিয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গকে বাঁচানোর জন্যই দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন গঠন করে স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়েছিল দামোদর ও তার বিভিন্ন শাখা নদীর বাঁধ ও ব্যারেজ বাঁধার কাজ। উদ্দেশ্য ছিল, (‌১)‌ বন্যা নিয়ন্ত্রণ (‌২)‌ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন (‌৩)‌ জলাধারে মৎস্য চাষ (‌৪)‌ এবং নৌভ্রমণ ইত্যাদি। ১৯৪৮ থেকে ২০১৯— ৭১ বছর পরে ডিভিসি–‌র অস্তিত্ব আজ পুরোপুরি নির্ভরশীল কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা থার্মাল পাওয়ার স্টেশনগুলির ওপর। বাঁধগুলিতে পলি জমে বুক এত উঁচু হয়ে গেছে, বর্ষায় বেশি বৃষ্টি হলেই কোনার, তিলাইয়া, পাঞ্চেতের তিনটি বাঁধ বা দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে জল ছাড়া অনিবার্য হয়ে ওঠে। কারণ না–‌হলে বাঁধ ও ব্যারেজ সব ভেসে যাবে। এ জন্য যে বছর বর্ষার বৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দক্ষিণবঙ্গে বন্যার জন্য ডিভিসি–‌কে দায়ী করে, ডিভিসি সঙ্গে সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় প্রফুল্লচন্দ্র সেন দুর্গাপুর ব্যারেজের দক্ষিণের নদীখাত বজায় রাখার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের তরফে নিয়েছিলেন। এবং ওই নদীখাতগুলিতে আজ মনুষ্য–‌বসতি রীতিমতো ঘন। ফলে ডিভিসি জল ছাড়লেই দক্ষিণবঙ্গ ভেসে যায়।
ডিভিসি, মহানদীর ওপর হীরাকুঁদ, পাঞ্জাবে ভাকরা–‌নাঙ্গাল, দক্ষিণে নাগার্জুন সাগর, বা পশ্চিমে নর্মদা ভ্যালি রিভার প্রজেক্টের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে যেমন রাজ্যের উদ্যোগে কংসাবতী, ময়ূরাক্ষী, তিস্তা ইত্যাদি নদী প্রকল্প হয়েছে বা হচ্ছে, তেমনি ভারতের ২৯টি রাজ্য ও ৭টি ইউনিয়ন টেরিটোরিতে অসংখ্য বড়, মাঝারি ও ছোট নদী নালায় বাঁধের কাজ হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু তার জল কোথায়?‌ আজও বর্ষায় সময়মতো বৃষ্টি ও পর্যাপ্ত পরিমাণে না হলে রবিশস্য ও খরিফ শস্য মার খায়। আমনের ধান পর্যাপ্ত রোয়া যায় না। তাহলে লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যয় করে এই সব নদী বাঁধ ও ব্যারেজ কেন গড়ে তোলা হচ্ছে?‌
অধ্যাপক কপিল ভট্টাচার্য ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, পেশায় ও পড়াশোনায়। তাঁকে দেশসুদ্ধু লোক চিনত নদী বিশেষজ্ঞ বলে। সেই পাঁচের দশকেই তিনি বড় বড় নদী বাঁধগুলিকে বলেছিলেন নদীগুলির মরণফাঁদ। আজ সেটাই সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঁধ, ব্যারেজে আটকে বহু নদীর মৃত্যু হয়েছে। নদী শুধু বন্যা দিত তাই নয়, ওই বন্যার জলেই ভেসে আসত পলিমাটির স্তর, যা বছর না ফুরোতেই বন্যার জল ধোয়া জমিতে দিত অফুরান ফসল। পরবর্তীকালে কল্যাণ রুদ্র ও জয়া মিত্ররাও নদীর আয়ু নিয়ে বার বার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক প্রভুরাই ঠিক করেন, সাধারণ মানুষের কোনটা প্রয়োজন, কোনটা অপ্রয়োজন। তাই বর্ষার বৃষ্টি সময়মতো না হলে হাজার নদীবাঁধ থাকা সত্ত্বেও খেতে সেচ হয় না, টান পড়ে ভাতে।   ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top