তাপস কুমার দাস: ‘‌এক দেশ এক ভাষা’‌ তত্ত্বের কথা বলতে গিয়ে হিন্দির পক্ষে সওয়াল করেছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সে নিয়ে বিতর্ক দেশজুড়ে। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতবাসীর মাতৃভাষা হিন্দি নয়। তঁাদের ওপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার উগ্র মনোভাব ভারতীয় সংহতির বিপদ ডেকে আনবে। দেশের বহুত্ববাদী চরিত্র ধ্বংস করার এ এক আত্মনিধনকারী হুঙ্কার ভারতীয় জনতা পার্টির। 
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দর্পে কোনও ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ফল কী হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত একাধিক। কিন্তু সেই ইতিহাস থেকে শাসকের শিক্ষা নেওয়ার কোনও ইচ্ছা নেই। জোর করে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনের পরিণতিতে পাকিস্তানের বিভাজন, স্বাধীন বাংলাদেশের আবির্ভাব। ইয়োরোপের দেশ বেলজিয়াম গঠিত হয় ১৮৩০ সালে। তার রাষ্ট্রভাষা ঘোষিত হয় ফরাসি। তখন ফ্লেমিশভাষীরা তাঁদের ভাষাকেও সমমর্যাদা দেওয়ার দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। বেলজিয়ামকে অটুট রাখতে ১৮৯৮ সালে ফরাসি ও ফ্লেমিশ, দুই ভাষাকেই জাতীয় ভাষা রূপে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই পরিস্থিতিতে ১৮৭৪ সালে সুইৎজারল্যান্ড ঘোষণা করে, তাদের জাতীয় ভাষা হবে কোনও একটি নয়, তিনটি— জার্মান, ফরাসি এবং ইতালীয়।
ভারতীয় সংবিধানে কোথাও হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বলা হয়নি (‌৩৪৩ থেকে ৩৫১ অনুচ্ছেদ)‌। ‘‌হিন্দি রাষ্ট্রভাষা’‌— এ হল উগ্র হিন্দিপ্রেমীদের রটনা। আমাদের সংবিধানে কোনও ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা বা রাজভাষা বা জাতীয় ভাষা বলা হয়নি। হিন্দিকে বলা হয়েছে সরকারি ভাষা। ইংরেজির মতো যোগাযোগের ভাষা (Lingua franca)‌। হিন্দিপ্রেমীরা ধরে নিয়েছে ভাষার ব্যাপারে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই চূড়ান্ত। এদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ধর্ম যেমন গায়ের জোরে বা ভোটের জোরে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, ভাষার ক্ষেত্রেও তাই। 
লড়াইটা কিন্তু হিন্দি বা হিন্দিভাষীদের বিরুদ্ধে নয়। বহুভাষী এক দেশে অন্যান্য ভাষার সমান অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন এটা। তামিলরা জানেন, তঁাদের ভাষা শুধু প্রাচীনই নয়, অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী। তঁারা কেন হিন্দিকে মানবেন!‌ স্বাধীনতার ১৫ বছরের মধ্যেই সেখানে হিন্দির কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র তামিল রাষ্ট্রের দাবি উঠে এসেছিল। অথবা উত্তর–পূর্ব ভারতে নাগারা হিন্দিকে মানবে না। মানবে না কাশ্মীরি, অসমিয়ারাও। বাঙালি ইদানীং যতই মেরুদণ্ডহীন হোক, হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তারা রাস্তায় নেমে পড়বে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার দম্ভ অন্যরা মেনে নিতে পারে না। তা ছাড়া পশ্চিমবাংলায় বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেই গর্বে যদি রাজবংশী বা কামতাপুরি ভাষাকে বাংলার উপভাষা বলে দাবি করে তারা, তা যে রাজবংশী জাতিসত্তাকে আঘাত করবে তা ভুলে গেলে ডেকে আনবে বিচ্ছিন্নতার ভাবনা। ভাষা জাতি বা সম্প্রদায়ের আবেগের জায়গা। ভাষা সৃষ্টি করে আন্দোলন, তেমনি আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করতে পারে ভাষার। বাংলা ভাষা যে আন্দোলন তৈরি করেছিল, তা জন্ম দিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের মধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অলচিকি লিপি।
১৯৬১ সালের আদমশুমারিতে বলা হয়, ভারতে ভাষার সংখ্যা ১৬৫২। এর মধ্যে অন্ততপক্ষে ২০০টি ভাষা ছিল, যে ভাষায় ২০,০০০ বা তার বেশি সংখ্যক মানুষ কথা বলেন। ১৯৭১ এবং ১৯৮১ সালের জনগণনা দপ্তর জানায়, যে সমস্ত ভাষার সংখ্যা ১০ হাজারের কম, তাদের কোনও পৃথক পরিচয় থাকবে না। মাতৃভাষার ভিত্তিতে নয়, বাইরে তারা যে ভাষায় কথা বলে তাদের ভাষাকে সেই প্রধান ভাষার পরিচয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে। অর্থাৎ সরকারিভাবে তাদের ভাষার কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। সেই নিয়মে ভারতের ৪৮টি ভাষা রাতারাতি হিন্দি ভাষায় মিশে গেল। ফলে ১৯৭১ সালের আদমশুমারিতে যে হিন্দিভাষীর সংখ্যা ছিল ২৯.‌৬৭%, তা পরের ১০ বছরে অর্থাৎ ১৯৮১ সালে দঁাড়ায় ৩৯.‌৯৪ শতাংশে।
সরকারিভাবে এই শতাংশের হারে যে কারচুপি আছে, তা ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তঁার হিন্দুস্থানী (‌হিন্দি–‌উর্দু)‌ ভাষা প্রসঙ্গে যে কথা বলেছেন তাতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ভাষাচার্য বলেছেন, ‘‌.‌.‌.‌হিন্দুস্থানী উত্তর ভারতের অর্থাৎ আর্যভাষা ভারতের চোদ্দো কোটি লোকের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও ইহা (‌অর্থাৎ হিন্দি–‌উর্দু উপভাষাগুলি)‌ মাত্র সাড়ে চার কোটি লোকের মাতৃভাষা। বাকি সাড়ে নয় বা দশ কোটি লোক ঘরে হিন্দি, পাঞ্জাবি (‌গুরমুখী)‌, রাজস্থানী, মালবী, গড়বলী, কুমুউনা, অবধি, ছত্রিশগড়, ভোজপুরিয়া, মগহী, মৈথেলি প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। এইসব ভাষার হিন্দুস্থানী (‌হিন্দি বা উর্দু)‌ শিখিতে হইলে দস্যুর মতো চেষ্টা করিয়া অনেকটা বিদেশি ভাষা শিক্ষার মতো করিয়াই শিখিতে হয়।’‌
প্রতিটি জাতিই চায় তার মাতৃভাষা যেন আর সবার সঙ্গে সমান মর্যাদা পায়। ভারতের ১৪টি প্রধান ভাষা রূপে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানের ৮ম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যারা যখন রাজনৈতিক পেশিশক্তি দেখাতে পেরেছে, তারাই পৃথক রাজ্য ও ৮ম তফসিলে নিজেদের ভাষার অন্তর্ভুক্তি করতে পেরেছে। সেই ১৪টি ভাষা বৃদ্ধি পেয়ে এখন হয়েছে ২২টি। দাবি উঠছে নতুন অন্তর্ভুক্তির। হিন্দি ভাষার পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসে পৃথক নানা স্বাধীন ভাষার জোরালো দাবি উঠেছে। মৈথিলি ইতিমধ্যেই (‌২০১৩)‌ হিন্দিভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক স্বাধীন ভাষা রূপে ৮ম তফসিলিতে জায়গা করে নিয়েছে। একই দাবি বেশ জোরালোভাবেই তুলেছে ভোজপুরি, বুন্দেলখণ্ডীভাষীরা।
হিন্দি সাম্রাজ্যবাদীদের উগ্রতার পরিচয় ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাসে আর বি ধুলেকার গণপরিষদের বিতর্কে জানিয়েছিলেন, যঁারা হিন্দি জানেন না, তঁারা ভারতে থাকার অধিকারী হতে পারেন না। এই পরিষদে যঁারা হিন্দি জানেন না, তঁাদের পরিষদের সদস্য হওয়ার অধিকার নেই। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের একই মানসিকতা এখনও চলছে। দেবগৌড়া যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন সংসদে তঁার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ওঠে, তিনি হিন্দি জানেন না। অর্থাৎ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে তঁাকে হিন্দি জানতেই হবে। এমন দাবি কিন্তু হিন্দিভাষী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ওঠে না যে তঁাকে দক্ষিণ ভারতীয়, বা বাংলা, বা গুজরাটি–‌মারাঠি ভাষা জানতেই হবে। হিন্দিওয়ালাদের চাপে স্বাধীনতার ১৫ বছর পর ইংরেজির পরিবর্তে আর্য দেবনাগরির হিন্দিভাষাকে ভারতের একমাত্র সরকারি ভাষা রূপে গণ্য করায়, সংবিধান–‌প্রণেতাদের মতকে হাতিয়ার করে হিন্দি প্রেমিকদের সারা ভারতে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে সমগ্র দক্ষিণ ভারতে বিদ্রোহের আগুন জ্বলেছিল। তাতে ৬৬ জনের গুলিতে মৃত্যু এবং ২ জনের আত্মাহুতির ঘটনার জেরে দিল্লির শাসকেরা থমকে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
সংহতির অপর নাম সমমর্যাদা ও সমঅধিকার। ভাষা প্রতিটি জনজাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। তাই ‘‌ভারত মাতা কি জয়’‌–‌এর পরিবর্তে হিন্দির জয়ে রূপান্তরিত করতে চাইলে আগামী দিনের জন্য দেশে ভাঙনের বীজ রোপণ করা হবে। হিন্দিপ্রেমীদের বুঝতে হবে, ভারতবর্ষ বলতে শুধু হিন্দি–‌বলয় বোঝায় না। তাই হিন্দিকে বলপূর্বক ‘‌রাষ্ট্রভাষা’‌ বা ‘‌রাজভাষা’‌ করতে গেলে যদি দেশে আগুন জ্বলে, বিভাজনের আওয়াজ ওঠে, তা হলে, তার দায় নিতে হবে অমিতজি আপনাকেই। সাবধান!‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top