শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আছে আছে, আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে!‌ অবশেষে পাওয়া গেল এমন কিছু লোক, যারা সুকুমার রায়কে ভয় পায়!‌ তাও আবার ‘‌হযবরল’‌!‌ পড়লেই তাদের গলা কুটকুট করে!‌ 
ব্যাপারটা হল কী, লেখক দেবতোষ দাশ তঁার নিজের ফেসবুকের দেওয়ালে একখান লেখা সেঁটেছিলেন। তাতে প্রাতঃস্মরণীয় মেজো রায়মশাই সুকুমারবাবুর ‘‌হযবরল’র নকল করে তিনি কয়েক লাইন সরস গদ্য লিখেছিলেন। কারও নাম না করে দণ্ডবায়সটায়স লিখে একটু মশকরা করেছিলেন। সেও ঠিক ছিল, অতটা তলিয়ে ওরা ভাবতে পারে না। কিন্তু গোল করলেন ৫৬ সংখ্যাটি লিখে। হযবরল মনে আছে তো?‌ সেই গাছের কোটর থেকে এক দেড়েল বুড়ো বেরিয়ে এসে একটা দর্জির ফিতে দিয়ে খাড়াই, হাতা, আস্তিন, ছাতি— যা–ই মাপে, সবের হিসেব হয় ২৬ ইঞ্চি!‌ তাতে ভয়ানক আপত্তি জানাতে হয়েছিল, যে বুকের মাপও ২৬ ইঞ্চি, গলাও ২৬ ইঞ্চি, তা হলে কি শুয়োর!‌ এর পর যদি একটু বাড়তি আমোদ পেতে চান, তা হলে সোনার কেল্লার শুরুতে রেলের কামরার দৃশ্যে লালমোহনবাবুর সেই হাততালি দিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ার অপরূপ ভঙ্গিটি মনে করুন— মশাই, আপনি কি শুয়োর?‌
এত কথা কেন বলতে হল?‌ কারণ, এগুলো নিখাদ বাঙালিয়ানার অংশ। বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতি, রুচি, রসবোধের প্রতিনিধিত্ব করে এই সব লেখা, দৃশ্য, সংলাপ। দেবতোষ একজন বাঙালি লেখক হিসেবে তার থেকেই সামান্য ধার নিয়েছিলেন মাত্র। এবং যেহেতু তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কটাক্ষ করা, তিনি তুখোড় মুনশিয়ানায় ২৬–কে বদলে ৫৬ করে দিয়েছিলেন। কেন করেছিলেন?‌ না ৫৬ ইঞ্চির ছাতি নিয়ে বড়াই করা দেশের নেতাটি ভোটের মুখে বাজার গরম করতে একটা সাজানো সার্জিকাল স্ট্রাইকের গপ্পো ফেঁদে বসলেন, যে সামরিক সাফল্যের কোনও প্রমাণই তিনি দিতে পারছেন না। উল্টে নিরপেক্ষ বিদেশি সংবাদমাধ্যম গভীর সন্দেহ প্রকাশ করছে। তার পাল্টা গল্পের পর গল্প বানাতে হচ্ছে। নেহাত কোণঠাসা হয়ে গেলে ‘‌তবে রে দেশদ্রোহী!‌’‌ বলে তেড়ে যেতে হচ্ছে। এটা নিয়ে রঙ্গ–রসিকতা করাই চলে। গণতন্ত্রে তো অবশ্যই করা যায়। যে–ব্যবস্থায় সরকারের শীর্ষতম কর্তাটি পর্যন্ত দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে দায়বদ্ধ। না, প্রশ্ন করা মানেই সেনাবাহিনীর দক্ষতা কিংবা কৃতিত্বে সন্দেহ প্রকাশ করা নয়। সন্দেহ করা মানেই নিজের দেশাত্মবোধকে অস্বীকার করা নয়। যারা দেশকে ভালবাসে, সত্যিই ভালবাসে, তারা এ প্রশ্ন তুলতেই পারে। তুলবেও।
দেবতোষ তার বেশি কিছুই করেননি। পাশেই তঁার ফেসবুকের লেখাটি আবার আমরা ছাপছি। পড়ে নিতে পারেন। ফেসবুক একটি স্বাধীন সামাজিক মাধ্যম, যেখানে দিনভর অজস্র ভাল, খারাপ, হতকুচ্ছিত লেখা ছাপা হয়। এমনকী নোংরা রসিকতার শাক দিয়ে ঢাকা আঁশটে পর্নোগ্রাফিও। রাজনৈতিক মত, বিরুদ্ধমত নিয়ে আখছার ফাটাফাটি হয়। সামাজিক অবস্থান নিয়ে কোমর বেঁধে ঝগড়া। তার মধ্যে কারও বক্তব্য যদি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের অনুপযুক্ত মনে হয়, তা হলে সেটি ‘‌রিপোর্টেড’‌ হয়। ব্যাপারটা সংখ্যার গুরুত্বে বিবেচিত হয়। মানে, ‘‌মাস্টারমশাই, গোপাল আমাকে দেখে ভেংচি কাটছে!‌’‌— কোনও একজনের এমন অভিযোগ সচরাচর পাত্তা পায় না। কিন্তু কোনও দশজন যদি দাবি করে ভুবন অতি ব্যাদড়া বালক, তা হলে ভুবনকে এক পিরিয়ড ক্লাসের বাইরে কান ধরে দঁাড় করিয়ে দেওয়া হয়। দেবতোষের লেখাটির ক্ষেত্রেও তাই–ই হল। রিপোর্ট হল এবং দেবতোষের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটিই ব্লক করে দেওয়া হল কিছু সময়ের জন্য। এবার ভেবে দেখুন, সুকমার রায় পড়ে বুঝতে পারে, এমন কিছু বাঙালি দল পাকিয়ে স্বাধীন মতামতে বাগড়া দিচ্ছে— এটা খুব আগ্রহজনক ব্যাপার নয়?‌
এবং সেইখানেই টেলিপ্যাথির জোরের কথাটা উঠছে। ইদানীং ফেসবুক এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে মতপ্রকাশের অধিকার যেভাবে ক্রমশ খণ্ডিত হচ্ছে, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে যেভাবে দলবদ্ধ মতামতের চাপে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে, তার একটা নির্দিষ্ট নকশা গত দু–তিন বছরে নজরে পড়ছিল। জটিল নয়, খুব সাদামাঠা নকশা। বাঙালি যা করে, যা ভাবে, সেটা খারাপ। এমনিতেই বাঙালিরা যথেষ্ট ‘‌হিন্দু’‌ নয়। তারা মাছ–মাংস, পেঁয়াজ–রসুন খায়। তারা বাড়িতে হয়ত লক্ষ্মীর পঁাচালি পড়ে, আর রোজ সকালে ঠাকুর নমো না করে বাড়ি থেকে বেরোয় না, কিন্তু বাঙালি আদতে ধার্মিক নয়। ধর্মরক্ষার কোনও দায় তার নেই। ফলে শিখ, খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি— সবার সঙ্গেই সে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে আড্ডা দেয়। এবং মুসলমান। নামে নিজেকে সেকুলার (‌‌অথবা ওদের দেওয়া নাম ‘‌সিকুলার’, যেটা ভাল লাগে‌)‌ বলে জাহির করলেও আসলে হিন্দু–বাঙালি ভয়ঙ্কর রকমের মুসলমানপ্রেমী। তা যদি না–ও হয়, ওরা অন্তত এরকম ভাবে না যে মুসলমান মাত্রেই দেশের এবং দশের শত্রু। বরং এক ধরনের সামাজিক ন্যায়ে বিশ্বাস করে, যা জাতপাত বা ধর্মবোধ দ্বারা চালিত নয়। ফলে এই বাঙালি জাতটি এখনও বিপজ্জনক। কাজেই তাদের বিরোধিতা করতে হবে। অফিস ক্যান্টিন থেকে পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডা, ফেসবুকের পোস্ট থেকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের তর্ক, সবেতে বাঙালির এই ক্যালানেমার্কা ‘‌সবাই সমান’‌ ভাবুকপনার থেঁাতা মুখ ভেঁাতা করে দিতে হবে। বাঙালি যা ভালবাসে, যার আদর করে, সবকিছুকে টেনে নামাতে হবে আঁস্তাকুড়ে।
একটা উদাহরণ দিই। সে–ও ফেসবুক পোস্ট। একজন লিখলেন, বাংলা গানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ‘‌হারামজাদা’‌ বলা হয়েছে কেন!‌ ‘‌কদমতলায় বইস্যা আছে কানু হারামজাদা’‌। একজন যুগাবতার, ভারতীয় সংস্কৃতির পুরুষোত্তম যিনি, তঁার এ কী অসম্মান!‌ না, এতটা শিক্ষিত ভাষায় তিনি লেখেননি, কিন্তু মোদ্দা কথাটা একই। পড়ে মনে হয়েছিল, এর পর হয়ত প্রশ্ন উঠবে, রামকৃষ্ণ কেন দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর সঙ্গে তুই–তোকারি করতেন?‌ বামাখ্যাপা কেন তারাপীঠের বিগ্রহের মুখে নিজের এঁটো খাবার গুঁজে দিতেন?‌ শ্রীচৈতন্য কেন যবনদের নিয়ে নাচ–গান করতেন?‌ অথবা, সুকুমার রায় কেন ‘‌লক্ষ্মণের শক্তিশেল’‌ লিখেছিলেন?‌ প্রশ্ন উঠবে না, উঠতে শুরু করে দিয়েছে। এতদিন যারা ছিল ‘‌ক্লোজেট হিন্দুত্ববাদী’‌, যাদের অন্তরের দড়কচা মারা হেঁদুয়ানি মানেই অন্য ধর্মের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ, তারা এবার মুখোশ এবং মুখ খুলতে শুরু করেছে। দল বেঁধে নালিশ করছে, যদি পরিহাসের ছলেও ৫৬ ইঞ্চি নিয়ে কেউ কোনও কটাক্ষ করে। কারণ, তাদের কাছে দেশ মানে তো সাকুল্যে ওই ৫৬ ইঞ্চি!‌ এতদিন এই লোকগুলোরই খেঁাজ ছিল। পাওয়া গেল অবশেষে। সুকুমার রায়ও যাদের গাত্রদাহের কারণ। ওই জন্যেই শুরুতে বললাম— আছে আছে, আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে!‌
এবার কী করণীয়, সেটা আপনারাই ঠিক করুন। পাল্টা তর্ক তুলবেন, নাকি চুপ করে মেনে নেবেন। এতদিন যে চিন্তা–ভাবনা, যে ধ্যান–ধারণা নিয়ে বাঙালি আজকে বাঙালি হয়ে উঠেছে, তাকে বলি দেবেন ওই নব্য হিন্দুত্ববাদের হাড়িকাঠে, নাকি আগলে রাখবেন,‌ রুখে দঁাড়াবেন?‌ বাঙালির অস্তিত্বের প্রশ্ন। ভেবে দেখুন!‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top