‘‌না মেরি বাপ প্রধানমন্ত্রী থি, না মেরি মা।’‌

১৯৭৭ সাল। সদ্য জরুরি অবস্থার অবসান হয়েছে। সামনেই লোকসভা ভোট। সেই ভোটের প্রচারে কলকাতার শহিদ মিনারের সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। সেদিনের সভায় মাত্র আট শব্দের এক বাক্যেই কংগ্রেসের পারিবারিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছিলেন তিনি। এত কম শব্দ খরচ করে, কংগ্রেসের পারিবারিক শাসনের বিরুদ্ধে এমন চোখা আক্রমণ বাজপেয়ী ছাড়া এ দেশের অন্য কোনও রাজনীতিকের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
তঁার বাগ্মিতায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এক দিন অটলজিই হবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। নেহরুর ভবিষ্যদ্বাণী সফল করে ১৯৯৬ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীই হয়েছিলেন দেশের প্রথম অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে মোট তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। এবং ভারতের প্রথম অকংগ্রসি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, দেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে যথার্থ অর্থেই তিনি এক ব্যতিক্রমী রাজনীতিক।
অটলবিহারী বাজপেয়ীর জন্ম গোয়ালিয়রে, ১৯২৪–এর ২৫ ডিসেম্বর। বাবা কৃষ্ণবিহারী বাজপেয়ী স্কুলশিক্ষক ও কবি। মা কৃষ্ণাদেবী। স্কুলের পড়া শেষ করে গোয়ালিয়রের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্লাতক। পরে কানপুরের ডিএভি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণির এমএ। এর পর আইন পড়া শুরু করেছিলেন। তবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় তা আর শেষ করে উঠতে পারেননি।
বাজপেয়ীর রাজনৈতিক জীবন বহুমুখী ও ঘটনাবহুল। ১৯৪৪ সালে ২০ বছর বয়সে আর্য সমাজের যুব শাখা আর্য কুমার–এর সাধারণ সম্পাদক। ১৯৩৯–এ আরএসএস–এর স্বয়ংসেবক। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেপ্তার হন অটল ও তঁার দাদা প্রেম। সে–‌সময় ২৩ দিন গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছিল দু’‌জনকে। শেষ পর্যন্ত ছাড়া পান মুচলেকা দিয়ে। ১৯৪৭–এ আরএসএস–এর সর্বক্ষণের প্রচারক। এই সময়েই দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন। যুক্ত হন সংবাদপত্র ‘পাঞ্চজন্য’‌ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম’র সঙ্গে। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার পর নিষিদ্ধ হয় আরএসএস। ১৯৫১ সালে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের সঙ্গী হয়ে গঠন করেন ভারতীয় জনসঙ্ঘ। এই পর্বেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাজপেয়ীর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
অটলবিহারী বাজপেয়ী ১৯৫৭ সালে প্রথম লোকসভা ভোটে প্রার্থী হন মথুরা কেন্দ্র থেকে। হেরে যান রাজা মহেন্দ্র প্রতাপের কাছে। তবে বলরামপুর কেন্দ্র থেকে জিতে সেবারই সংসদে যান। বাগ্মিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার জেরে এই পর্বে বাজপেয়ী হয়ে ওঠেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের মুখ। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর ১৯৬৮ সালে হন দলের জাতীয় সভাপতি। নানাজি দেশমুখ, বলরাজ মোদক, লালকৃষ্ণ আদবানিকে সঙ্গী করে ক্রমশ ভারতীয় জনসঙ্ঘকে শক্তিশালী করে তোলেন তিনি।
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়ে গ্রেপ্তার হন বাজপেয়ী। ১৯৭৭ সালে ছাড়া পাওয়ার পরে জয়প্রকাশ নারায়ণের আহ্বানে কংগ্রেস–‌বিরোধী জোটে যোগ দেন জনসঙ্ঘকে নিয়ে। সেই জোটই পরিচিত হয় জনতা পার্টি হিসেবে।  ১৯৭৭–‌এ দিল্লিতে জনতা পার্টির সরকার গঠিত হয় প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে। সেই সরকারের বিদেশমন্ত্রী ছিলেন অটলবিহারী। প্রথম বিদেশমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে হিন্দিতে ভাষণ দেন তিনি। ১৯৭৯ সালে জনতা পার্টির সরকারের পতন হলেও, তত দিনে বাজপেয়ী নিজেকে জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন।
১৯৮০ সালে ফের পালাবদল। আরএসএস–‌এর প্রচারক বাজপেয়ী দীর্ঘ দিনের বন্ধু লালকৃষ্ণ আদবানি, ভৈরেঁা সিং শেখাওয়াতকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেন ভারতীয় জনতা পার্টি। তিনিই ছিলেন বিজেপি–‌র প্রথম সর্বভারতীয় সভাপতি।
তবে জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি–‌র সাফল্য এত সহজে আসেনি। ১৯৮৪ সালে লোকসভা ভোটে বিজেপি জিতেছিল মাত্র দুটি আসনে। তবে কংগ্রেস–‌বিরোধী নেতা হিসেবে প্রথম সারিতেই ছিল বাজপেয়ীর নাম।
সর্বভারতীয় স্তরে মণ্ডলায়নের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে যখন উত্তর ভারতে লালু, মুলায়ম, মায়াবতীদের উত্থান, তখন বিজেপি–‌র রাজনীতিকে দঁাড় করাতে দলীয় নেতৃত্ব সামনে আনেন কমণ্ডলুর রাজনীতি। ধীরে ধীরে অযোধ্যা ও রাম জন্মভূমি ইস্যুকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক ভাবে সারা দেশে শক্তি সঞ্চয় করে বিজেপি। ১৯৯৬ সালের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে উঠে আসে বিজেপি। দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন বাজপেয়ী। তবে অন্য দলগুলি সমর্থন না করায় সেবার মাত্র ১৩ দিনেই বাজপেয়ী সরকারের পতন হয়।
১৯৯৮ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপি–‌র নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এনডিএ জোট। বলা যায়, সমমনোভাবাপন্ন দলগুলিকে নিয়ে বৃহৎ এক দলের নেতৃত্বে জোট গড়ে দিল্লির ক্ষমতা দখল করা, এটা ছিল ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে বাজপেয়ীর মার্গদর্শন। তবে সেবারও এআইএডিএমকে নেত্রী জয়ললিতা সমর্থন প্রত্যাহার করায় ১৩ মাস পর সংসদে আস্থাভোটে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে বাজপেয়ী সরকারের পতন হয়।
১৩ দিন এবং ১৩ মাসের সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন বাজপেয়ী–‌সহ দলের অন্য নেতারা। ইতিমধ্যে কার্গিল যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাফল্য বিজেপি–‌র জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করে। বাজপেয়ীর জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয় পোখরানে ভারতের দ্বিতীয় পরমাণু বিস্ফোরণও। এ–‌সবের জেরে ১৯৯৯–এর লোকসভা ভোটে আসে ব্যতিক্রমী সাফল্য। সংসদে ৫৪৩ আসনের মধ্যে এনডিএ প্রার্থীরা জয়ী হন ৩০৩ আসনে। ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে ভারতীয় জনতা পার্টি একটি স্থায়ী শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে বাজপেয়ী তৃতীয় বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সময়ের সরকার চালান। ২০০৪–‌এর লোকসভা ভোটে পরাজিত হয় এনডিএ। ১৯৫১ সালের জনসঙ্ঘকে তিন দশকের ব্যবধানে ভারতীয় জনতা পার্টিতে রূপান্তর এবং দীর্ঘকালীন প্রয়াসে সেই দলকে কেন্দ্রে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা, এই বিপুল রাজনৈতিক সাফল্যের কারিগর ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী।
২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে পরাজিত হয় এনডিএ। কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ। এই সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেয় বামেরা। এই পর্যায়ে বাজপেয়ী বিরোধী নেতৃত্বের ভার দেন আদবানির ওপর। ২০০৫ সালের পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন বাজপেয়ী। জানিয়ে দেন, আর কোনও দিন সাধারণ নির্বাচনে লড়বেন না। আগামী দিনে আদবানি ও প্রমোদ মহাজনের হাতে বিজেপি–‌র উত্তরাধিকার সঁপে দেন তিনি।
২০১৫ সালে ভারত সরকার অটলবিহারী বাজপেয়ীকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্ন উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৯২ সালে তিনি পদ্মবিভূষণ পান। এ ছাড়া ১৯৯৪ সালে লোকমান্য তিলক পুরস্কার, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পুরস্কারের মতো দেশের ও বিদেশের বহু সম্মান পেয়েছেন বাজপেয়ী।
আর্য সমাজে যুক্ত ছিলেন। যুক্ত ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘে। ছিলেন জনসঙ্ঘের শীর্ষনেতা। সেখান থেকে বিজেপি। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও ভারতীয় সংবিধান ও রাষ্ট্রনীতির অন্তর্ভুক্তির দর্শনকে অগ্রাহ্য করেননি তিনি। তিনিই সেই ব্যতিক্রমী রাজনীতিক, যিনি গুজরাটে নিজের দলের সরকারকে রাজধর্ম পালনের কর্তব্য মনে করিয়ে দিতে দ্বিধান্বিত হননি। ব্যক্তিজীবনে মধুর স্বভাবের বাজপেয়ী সব ধরনের মানুষকে সমান ভাবে আকর্ষণ করতেন। তিনি ছিলেন কবি। ভালবাসতেন ভারতীয় মার্গসঙ্গীত ও ভারতীয় নৃত্যকলা। বলেছিলেন, ‘‌আমার কবিতায় পরাজিতের হতাশা নয়, পাওয়া যাবে যোদ্ধার দৃপ্ত কণ্ঠ।’‌ সেই কণ্ঠস্বরই অটলবিহারী বাজপেয়ীর জীবনদর্শন। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top