নুরুল ইসলাম খান: দেশে গুন্ডারাজ চলছে!‌ একের পর এক শিক্ষালয়ে সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হচ্ছে। যে বিশ্বভারতী আমাদের গর্ব এবং ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত, সেখানেও গৈরিকবাহিনীর আক্রমণ!‌ আর দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় তো বার বার হামলার লক্ষ্য হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, বা সরকারের মুরুব্বিরা নির্বিকার। প্রশাসন কোনও সঠিক পদক্ষেপই নেয়নি। বরং আক্রান্ত ছাত্র–‌ছাত্রীদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলে তাদের কাঠগড়ায় দঁাড় করাতে চাইছে। বুঝিয়ে দিচ্ছে, সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ করা যাবে না। করলেই হয় তারা দেশদ্রোহী, নয় আরবান নকশাল, কিংবা সরাসরি পাকিস্তান পাঠিয়ে দেওয়ার ফতোয়া। ধর্মীয় মেরুকরণের পাশাপাশি মানুষের বাক স্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে। অন্যান্য মৌলিক অধিকারের কথাও আর বলা যাচ্ছে না। 
সবথেকে বেশি আক্রান্ত দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা। ড.‌ অমর্ত্য সেন–এর মতো নোবেলজয়ী বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদও নাকি বিদেশের মাটিতে দঁাড়িয়ে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে আসলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন!‌ রামচন্দ্র গুহ, রোমিলা থাপার— বিশিষ্ট ইতিহাসবিদরা সবাই নাকি রাষ্ট্রবিরোধী!‌ একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের সব চরিত্র লক্ষণ প্রকট হয়ে উঠেছে। ফ্যাসিবাদের মূল লক্ষ্যই হল মুক্তমনের কণ্ঠরোধ, প্রগতিশীল চিন্তাকে বাধা দেওয়া, সামাজিক স্থিতি নষ্ট করা। এবং সেই কাজটা করতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদির ভারতে পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করা হচ্ছে সমস্ত প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ এবং তার আইকনদের। সেই কারণেই লেনিন, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা। সেই কারণেই আলিগড়, জামিয়া মিলিয়া, হায়দরাবাদ থেকে শুরু করে যাদবপুর, বিশ্বভারতীতে হামলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত, আর ওদের নেতা বলছেন, বাংলা হল দুষ্কর্মের আখড়া।
স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র–‌ছাত্রীরা, এবং শিক্ষকরাও বিপর্যস্ত। আমরা, তাদের অভিভাবকরাও ভীত, সন্ত্রস্ত। যারা দেশকে পথ দেখাবে, দেশের সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্তাক্ত হচ্ছে রোজ। কিন্তু সব আতঙ্ক এবং সংশয় ঝেরে ফেলে আক্রান্ত ছাত্রসমাজের পাশে দঁাড়ানোটা আজ আমাদের সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারণ আমাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন, বর্তমান সঙ্কটে। মহা বিপদে পড়েছে আমাদের প্রিয় দেশ। বাংলা তথা বাঙালির অস্তিত্বও বিপদগ্রস্ত। শুধু বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙচুর, বা বিবেকানন্দের মূর্তিই কলঙ্কিত করা নয়, যিনি বিশ্বকবি, যিনি আমাদের গর্ব, আমাদের দেশের জাতীয় সঙ্গীত যঁার লেখা, সেই সঙ্গীতে যিনি ‘‌হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিক, মুসলমান, খ্রিস্টানি’‌র সমন্বয়ের জয়গান গেয়ে গেছেন— সেই রবীন্দ্রনাথের আদর্শই আসলে আক্রান্ত হয়েছে বিশ্বভারতীতে। ভারতের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের ধারণাকে বিনষ্ট করতে চাইছে এই কট্টর হিন্দুত্ববাদী শক্তি। 
দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আরএসএস নেতাদের ন্যক্কারজনক ভূমিকা ঐতিহাসিক সত্য। আজ সেই আরএসএস এবং তাদের অনুসারী বিজেপি ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘‌জাতীয়তাবাদী’‌ সেজে অন্যদের দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিতে বলছে!‌ দেশ স্বাধীন করার লড়াইয়ে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ শামিল হয়েছিল। মুসলিমরাও। এই দেশকে তারা কারও থেকে কম ভালবাসে না। অথচ আজ তাদেরকে নাগরিকত্বের কঠিন পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। নিজদেশে পরবাসী হতে হচ্ছে। আর যারা এই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নানাভাবে বাধা দিয়ে ইংরেজ শাসককে সাহায্য করেছিল, গদ্দারি করেছিল মাতৃভূমির সঙ্গে, আজ তারাই স্বঘোষিত পরীক্ষকের ভূমিকায়। ভারত নামক এই দেশের ইজারা নিয়েছে যেন তারা, হয়তো বা মালিকই ভেবে বসেছে নিজেদের।
কাজেই সময় এসেছে নতুন এক স্বাধীনতা আন্দোলনের। দেশপ্রেমের এই ঠিকাদারদের হাত থেকে প্রিয় স্বদেশকে মুক্ত করার ডাক দিতে হবে। প্রতিবাদে–প্রতিরোধে গর্জে উঠতে হবে। সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করতে ফের একবার লড়তে হবে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এবার সময় ঘুরে দঁাড়ানোর। পথে নেমে, পায়ে পা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটে যাওয়ার। এই দুষ্কৃতীদের উচিত শিক্ষা দিতেই হবে। না হলে, আগামীতে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। 
সম্মিলিত শক্তিতে অপপ্রচার প্রতিহত করাও এখন এক বড় কাজ। মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদী শক্তির লক্ষ্যই হল, দেশের প্রকৃত ইতিহাস বদলে, বিকৃত ইতিহাস মানুষের কাছে উপস্থাপন করা। শিক্ষালয়ে দাঙ্গা–হাঙ্গামা করে, গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই বদলে দেওয়া। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের ওপর আঘাত নেমে আসবে। ধর্মীয় মেরুকরণ চলবে। মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে। কিন্তু রাজধর্ম পালন করবে না সরকার। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। জিডিপি তলানিতে। কর্মসংস্থান হচ্ছে না। শিল্প উৎপাদন বন্ধ। অনাদায়ী ঋণের ভারে ব্যাঙ্কগুলো ধুঁকছে। এই মহাসঙ্কট থেকে নজর ফেরাতে, দেশের মানুষকে হিন্দু–মুসলিম বিরোধ, অথবা ভারত–পাকিস্তান বৈরিতা নিয়ে ক্রমাগত খুঁচিয়ে ব্যতিব্যস্ত রাখাই এই সরকারের কৌশল। কিন্তু ক্রমশ মানুষ সেটা ধরে ফেলছে। তারা ক্ষিপ্ত। তাদের রোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। সরকারও এটা বুঝছে। তাই তারা সন্ত্রস্ত। তাই দিল্লির শাহিনবাগ, বা কলকাতার পার্ক সার্কাসের শান্তিপূর্ণ, স্বতঃস্ফূর্ত গণ–আন্দোলন নিয়েও তাদের এখন কুৎসা ছড়াতে হচ্ছে। কিন্তু মানুষ আর ভুল বুঝবে না। সংহত হচ্ছে জনমত, সংগঠিত হচ্ছে প্রতিবাদ। যত হামলা হবে জেএনইউ, যাদবপুর, বা বিশ্বভারতীতে, ততই জোরদার হবে জনশক্তি। দেশের মানুষ নিজের দেশের অধিকার বুঝে নেবে, নেবেই।‌

জনপ্রিয়

Back To Top