প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায়: ১৯৮২ সাল। বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্য কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অজিত পাঁজারা হাইকোর্টে মামলা ঠুকে দিলেন। অভিযোগ, ভোটার তালিকায় নানারকম ভুলত্রুটি। নির্বাচন কমিশনকে তালিকা সংশোধন করতে হবে। না–‌করা পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত থাকুক।
বিচারপতি সব্যসাচী মুখার্জি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না–‌হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দিলেন।
সেই মামলায় বামফ্রন্টের শরিক দলগুলো অংশ নিয়েছিল। সিপিএমের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন সাংসদ ও আইনজীবী সোমনাথ চ্যাটার্জি। ঠিক হল, পুনর্বিবেচনার জন্য ডিভিশন বেঞ্চে না গিয়ে সরাসরি সুপ্রিয় কোর্টে যাওয়া হবে। তাতে সময় বাঁচবে। বাম সরকারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই নির্বাচন হবে। নইলে রাষ্ট্রপতি শাসনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
আমি তখন স্যরের চেম্বার জুনিয়ার। এই মামলাতে তাঁর পাশে থাকার সুযোগ হয়েছিল। বিচারপতি ডিএ দেশাই, বিচারপতি এপি সেন, ও বিচারপতি বাহারুল ইসলামের বেঞ্চে নির্বাচন কমিশনের হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ফলি নরিম্যান। কংগ্রেসের পক্ষে অশোক সেন। সুপ্রিম কোর্ট আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে শুনানি শেষ করে হাইকোর্টকে রায় দিতে বলল। তাতে ক্ষুব্ধ বিচারপতি সব্যসাচী মুখার্জি মন্তব্য করলেন, এ ধরনের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্ট দিতে পারে কিনা ভবিষ্যতে উচ্চতম আদালতকে তা ভাবতে হবে!
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নির্দেশে পাঁচ বিচারপতিকে নিয়ে সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠিত হল। আগের তিন বিচারপতির সঙ্গে বসলেন, বিচারপতি ওয়াই বি চন্দ্রচূড় এবং বিচারপতি পিএন ভগবতী। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সময়মতো নির্বাচন হল। সোমনাথ চ্যাটার্জি রাজ্য সরকারের কাছ থেকে কোনও রকম পারিশ্রমিক নেননি। কখনও নিতেন না। কোনও বিল পাঠাতেন না। বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে কোনও মামলা নিতেন না। একবার শুধু দল এবং সরকারকে জানিয়েই পিয়ারলেসের একটি মামলা নিয়েছিলেন। শ্রমিক, কর্মচারী, কৃষকের বিরুদ্ধে কোনও মামলা নিতেন না। আবার এদের পক্ষে কোনও মামলা নিলে, পারিশ্রমিক নিতেন না। অথচ সেই সব মামলার ব্যাপারে তাঁর নিষ্ঠার কোনও অভাব থাকত না। ১৯৭৮–‌এ রেল শ্রমিকদের একটি মামলা। বিচারপতি সব্যসাচী মুখার্জির ঘরে ভ্যাকেট হয়ে যায় স্টে। আদালত ছাড়ার সময় ওঁর খুব মন খারাপ। বারবার বলছিলেন, এতগুলো মানুষ পথে বসে গেল!‌ কাল থেকে কী খাবে!‌ সেবারও সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে পরিস্থিতি সামলেছিলেন।
আমার ছাত্র–‌রাজনীতি বামবিরোধী। বীরভূম থেকে কলকাতায় এসেছিলাম ল পড়তে। ঠিক ছিল জেলায় ফিরে গিয়ে নিম্ন আদালতে ওকালতি করব!‌ রাজনীতি, সামাজিক কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখব!‌ সিপিএমের শৈলেন চ্যাটার্জি ছিলেন পারিবারিক বন্ধু। সম্পর্কে কাকা। এই  শ্রমিক নেতা ১৯৭৭–‌১৯৮৭ চাঁপদানির বিধায়ক ছিলেন। তিনিই আমাকে স্যরের কাছে নিয়ে যান। যথার্থ ওকালতি শেখার সুযোগ পাই। পরে যেসব গরিব মানুষের মামলা আমার মাধ্যমে আসত, স্যার টাকা নিচ্ছেন না দেখে আমিও নিতাম না। তখন স্যর আমাকে দুটি সলিসিটর ফার্মের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন— রাজেশ খৈতানের কোম্পানি, আর একটি এম পি মেহেরিয়া।
বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েই স্যরকে প্রণাম করতে গিয়েছিলাম। বললেন, কখনও বিচারপতির আসনে বসে নিজেকে সবজান্তা ভাববে না। আবার হীনমন্যতায়ও ভুগবে না। আইন ও বিচারের জগৎ এক বিশাল সমুদ্রের মতো। তাতে তোমার জ্ঞান এক ঘটি, আর একজনের এক বালতি। আরও একটি কথা বলেছিলেন, বিচারের সময় কারও প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হবে না। আবারও কারও প্রতি পূর্বের রাগ, তিক্ত সম্পর্কের জের যেন বিচারে প্রভাব না ফেলে!‌ যিনি সওয়াল করছেন, তার সঙ্গে হয়তো তোমার সম্পর্ক খারাপ!‌ কিন্তু তার পেছনে যে বিচারপ্রার্থী, কোন অপরাধে সে সুবিচার পাবে না!‌
সব শিক্ষিত মানুষই নারীর অধিকার মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত, পারিবারিক জীবনে ক’‌জন সেটা মেনে চলেন?‌ স্যরকে দেখে সেটা শেখা উচিত। ওইরকম পারিবারিক ঐতিহ্য, বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার, পেশাগত জীবনে চূড়ান্ত সফল, সাংসদ, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সব দলের কাছে সম্মাননীয়, আদর্শ— তাঁকে দেখেছি যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে স্ত্রীর মতামতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে।
সবাই জানে জ্যোতি বসুকে তিনি কতটা শ্রদ্ধা, সম্মানের চোখে দেখতেন। তখন স্যর ভারতবিখ্যাত অতিব্যস্ত আইনজীবী। আবার দেশের অন্যতম সেরা সাংসদ। জ্যোতিবাবু সেই সময়ে তাঁকে ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের দায়িত্ব দিলেন। বললেন, খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে এটা করতে হবে। গোটা রাজ্যের অগ্রগতি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সবকিছু শুনে বউদি স্যরকে বললেন, যে কোনও একটা দায়িত্ব ছাড়তে হবে। সেক্ষেত্রে আইনজীবীর পেশাটাই ছেড়ে দাও স্যর তাই করলেন। বউদি রাজনীতি আইনের জগতের, লোক নন। নেহাতই ঘরোয়া। তবু সব বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতেন স্যর। তাই স্যরের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ নিয়ে যে সব মন্তব্য করেছেন বউদি, তা খুবই যুক্তিযুক্ত। দিনে দিনে আমি স্যরের কাছে পুত্রের মতো হয়ে উঠেছিলাম। প্রতি সন্ধ্যায় ওঁর কাছে যেতাম। কোনও কারণে যেতে না পারলে খোঁজ নিতেন। অথচ বিচারপতি থাকাকালীন কখনও আমার ঘরে মামলা লড়েননি। একদিন শুধু এসেছিলেন। বললেন, কেমন দেখতে লাগছে দেখে গেলাম।
সবচেয়ে প্রিয় ছিল লাল পতাকা। ওটাকে ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ভাবতেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিপিএম নিশ্চয়ই গোটা ব্যাপারটা পুনর্বিবেচনা করবে!‌ দল তাঁকে আঘাত করেছে। কষ্ট দিয়েছে। তিনি পাল্টা আঘাত করে কাউকে কষ্ট দেননি। দলের প্রার্থীর হয়ে নির্বাচনী প্রচারে গেছেন। তৃণমূল সরকার ও দলের নানা কাজের কঠোর সমালোচনা করেছেন। আবার ভোটে জেতার পর মমতা ব্যানার্জিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বলেছেন, মানুষের ভোটে জিতেছে। সেটাকে মেনে নিয়ে মানুষের মতকে তো অভিনন্দন জানাতেই হবে।
গত ডিসেম্বরে স্যরের বড় মেয়ে অনুরাধা মারা যান। দিল্লিতে স্যারের বাড়িতে দলের নেতারা যখনই উঠতেন, আপ্যায়নের দায়িত্ব নিতেন অনুরাধা। তাঁর মৃত্যুর পর দলের কেউ সান্ত্বনা জানাননি। অথচ, গত ২৫ জুলাই তাঁর জন্মদিনেও দ্রুত আরোগ্য কামনা করে ফুল পাঠিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি।
স্যর বলতেন, দলেরই কেউ কেউ বলে আমি নাকি বুর্জোয়া। অথচ কত কৃষকপুত্র, শ্রমিকপুত্রকে দেখছি দলের পতাকা ছেড়ে অন্য দলে যাচ্ছে। এমনকি দলের টিকিটে ভোটে জিতেও অন্য দলে চলে যাচ্ছে। প্রকাশ কারাত তো নীতির প্রশ্নে এত হইচই করলেন। উত্তরপ্রদেশের দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে সংগঠন বাড়াতে পারলেন?‌
প্রথমবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর গল্প শুনেছি স্যরের কাছে। তাঁর বাবা নির্মলচন্দ্র চ্যাটার্জি কিছুতেই অনুমতি দিচ্ছিলেন না। জ্যোতি বসু, বিনয় চৌধুরি তাঁকে রাজি করাতে পারেননি। অথচ স্যর বাবার অনুমতি ছাড়া নির্বাচনে দাঁড়াবেন না। তখন স্নেহাংশুকান্তি আচার্য স্যরের বাবার কাছ থেকে অনুমতি আদায় করেন। পরে সেই সাংসদ পদই তাঁর জীবনে কত সুখ, কত দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তাব এসেছিল। উপরাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রদূত অন্তত রাষ্ট্রপতি মনোনীত সাংসদ। তাতে অন্তত জটিল, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর মত সংসদ এবং দেশবাসী জানতে পারত। রাজি হননি। বলেছেন, কেউ না কেউ ভাববে আমি লোভী।
সেবার স্যর দিল্লিতে। রাজ্য সরকারের অতি উচ্চপদস্থ মন্ত্রী আমায় ডেকে পাঠালেন। বিচারপতি মহীতোষ মজুমদারের এজলাসে তাঁর কথায় সরকারের পক্ষে মামলায় দাঁড়ালাম। এক সরকারি আমলার বদলির ব্যাপারে ইনজাংশন আটকাতে। প্রতিশ্রুতি দিলাম, বদলির পরও ওই আমলার কোনও সুযোগ–‌সুবিধা কমবে না। পরে সরকার সে প্রতিশ্রুতি রাখল না। বিচারপতি এজলাসে ডেকে পাঠালেন। দেখি সেখানে এক সরকারি উকিলই বলছেন, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময়ে আমার ওকালতনামাই ছিল না। সেই বিপদ থেকে জুনিয়রকে বাঁচাতে স্যর আদালতে গেলেন। আর তা দিল্লি থেকে ফিরেই।
যে কোনও সঙ্কীর্ণতা ভুলে মানুষের সঙ্গে মিশতেন, তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে স্যরকে যে শ্রদ্ধা জানালেন, তা দেশ ও কালের বিচারে বেনজির। দল তাঁকে ছোট করতে চেয়েছে। মমতা তাঁকে আরও বড় করেছেন।‌‌‌‌‌‌
প্রাক্তন বিচারপতি, রাজ্য আইন কমিশনের চেয়ারম্যান

জনপ্রিয়

Back To Top