সুচিক্কণ দাস: কোনও উন্নয়নশীল দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার যতই নজরকাড়া হোক, তার সঙ্গে যে দারিদ্র‌্য দূরীকরণের সম্পর্ক নেই, ইদানীং তা মেনে নিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। এর ওপর বিজেপি আমলে সরকার সংগৃহীত তথ্যের ওপর যে কারিকুরি করা হয়েছে, তাতে এদেশে জিডিপি সংক্রান্ত সরকারি সংখ্যাতত্ত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গেছে। 
বিজেপি–‌র গত পাঁচ বছরের শাসনে এদেশে কৃষিসঙ্কটের তীব্রতা বেড়েছে। বেকারি বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। নোটবন্দির জেরে বিপুল ক্ষতি হয়েছে অর্থনীতির। এবং জিডিপি–‌র ঊর্ধ্বমুখী গতি সত্ত্বেও দরিদ্রের সংখ্যা কমেছে কিনা তার হিসেব পাওয়া যায় না। এদেশে জনসংখ্যার কত শতাংশ এখনও দরিদ্র তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০০৯ সালে অর্থনীতিবিদ সুরেশ তেন্ডুলকার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে দরিদ্রেরা হলেন জনসংখ্যার ২১.৯ শতাংশ। আবার ২০১১–১২ সালে আরবিআইয়ের প্রাক্তন গভর্নর সি রঙ্গরাজন কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী এদেশে দরিদ্রেরা হলেন জনসংখ্যার ২৯.৫ শতাংশ। দারিদ্র‌্যের মাপকাঠি নির্ণয়ে ভিন্নতার জেরেই হিসেবের এই ফারাক। মোদির আমলে ভারতে দরিদ্রের সংখ্যা কি বেড়েছে? তার কোনও হিসেব এখনও পাওয়া যায়নি। কারণ ২০১১–১২ সালের পর এনিয়ে নতুন কোনও কাজ হয়নি।
এবারের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি–‌র অর্থনীতি ভাবনার পাল্টা দারিদ্র‌্য দূরীকরণের বিকল্প কর্মসূচি হাজির করেছেন রাহুল গান্ধী। এটা হল কংগ্রেসের ইস্তাহারে ঘোষিত ন্যায় প্রকল্প। ন্যূনতম এই আয় যোজনা প্রকল্পে দেশের সবচেয়ে গরিব পরিবারগুলিকে বছরে ৭২ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের দাবি, এই টাকা হতদরিদ্র পরিবারগুলির কাছে পৌঁছলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। প্রাথমিকভাবে খাদ্যশস্য ক্রয়ে খরচ করা হলে এই সব পরিবারকে আর অভুক্ত থাকতে হবে না। এদের হাতে যে নগদ টাকা যাবে, তা খরচ করলে অর্থনীতিতে নতুন চাহিদা তৈরি হবে। ফলে ফের চাঙ্গা হবে অর্থনীতি। শুকোবে নোটবন্দির ক্ষত। 
কংগ্রেসের এই নতুন প্রকল্পকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে দুদিক থেকে। এক, এই প্রকল্প চালাতে হলে যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে, তার জোগান আসবে কোথা থেকে। এর জন্য নতুন কর বসানো হবে কিনা, পুরনো কোনও প্রকল্পের বরাদ্দ কাটছাঁট করা হবে কিনা, সে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও রাহুল নিজে এই আশ্বাস দিয়েছেন যে, বাড়তি করের বোঝা না চাপিয়ে এবং অন্য প্রকল্পের বরাদ্দ না কমিয়েই ন্যায় প্রকল্পের টাকা জোগানো সম্ভব হবে। কীভাবে এই অর্থ আসবে, আশা করা যায় সময়ে তা স্পষ্ট করবেন কংগ্রেসের অর্থনীতিবিদেরা। 
এই কর্মসূচিকে ঘিরে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি উঠছে তা হল, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলির হাতে নগদ যে টাকা দেওয়া হবে, তা কি দেওয়া হবে কোনও শর্ত ছাড়াই?
শর্তের প্রসঙ্গ উঠছে অন্য একটা পরিপ্রেক্ষিত থেকে। ১৯৯৭ সাল থেকে বিশ্ব জুড়ে দারিদ্র‌্য ও অসাম্য দূরীকরণে নতুন কিছু কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে কর্মসূচিগুলির সাফল্যের জেরে বিশ্ব ব্যাঙ্ক বিভিন্ন দেশে এ ধরনের দারিদ্র‌্য দূরীকরণ কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহ দেয়। এ ধরনের প্রকল্পগুলি কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার (সিসিটি) বা শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর হিসেবে পরিচিতি। ১৯৯৭ সালে প্রথম এই কর্মসূচি চালু করা হয় মেক্সিকো ও ব্রাজিলে। দুটি দেশেই প্রকল্পগুলিতে দারুণ সাড়া পাওয়া যায়। এখন দেখা যাচ্ছে, লাতিন আমেরিকার মোট ১৭টি দেশে এবং এশিয়া ও আফ্রিকার মোট ১০টি দেশে এ ধরনের প্রকল্প চালু রয়েছে। মেক্সিকোয় ২০০২ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পের নাম অপরচুনিডাডেস। এখন নাম বদলে রাখা হয়েছে প্রসপেরা। সে দেশের প্রায় ৬০ লক্ষ পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। একইভাবে ব্রাজিলের বোলসা ফ্যামিলিয়া প্রকল্পে লাভবান হয়েছেন সে দেশের ১ কোটি ৪০ লক্ষ গরিব মানুষ। চিলি, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক এবং বাংলাদেশে চালু রয়েছে শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর প্রকল্প। পাইলট প্রজেক্ট চালু রয়েছে কম্বোডিয়া, মালাউই, মরক্কো ও পাকিস্তানে। 
নগদ হস্তান্তর ও শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর প্রকল্পের মধ্যে একটা ফারাক রয়েছে। শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর প্রকল্পে নগদে সহায়তার শর্ত হিসাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য–‌সহ একাধিক বিষয়কে। যেমন ব্রাজিলে বোলসা ফ্যামিলিয়া প্রকল্পে সব গরিবকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ টাকা দেওয়া হয় না। বরং, কোনও পরিবার দারিদ্র‌্যরেখায় থাকলে তার ওপরে উঠতে হলে ওই পরিবারের কত টাকা দরকার এবং ওই পরিবারের আয় কত, এ দুয়ের ফারাকের অঙ্কটা নগদ হিসেবে দেওয়া হয়। এখানে শর্ত হল গরিব হলেও ওই পরিবার যা আয় করে, সেটাকেও হিসেবে ধরা হয়। প্রায় একই পদ্ধতি কাজে লাগানো হয় চিলিতে। এভাবে নির্দিষ্ট হিসেবের ভিত্তিতে নগদ হস্তান্তরের ফলে খরচের ওপর একটা লাগাম টানা সম্ভব হয়। এবং রাজকোষের ওপর চাপ কম পড়ে।
সাহায্যপ্রাপ্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা নিয়মিত স্কুেল যাচ্ছে কিনা, তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিয়মিত হেলথ ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে কিনা, ওইসব পরিবারে প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হচ্ছে কিনা, এ ধরনের বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে ব্রাজিল বা মেক্সিকোর মতো দেশে। এগুলি হল নগদ হস্তান্তরের শর্ত। শর্তগুলো মানা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য যদি সঠিক নজরদারির ব্যবস্থা থাকে, তাহলে এভাবে সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমেই সমাজের নীচুতলায় শিক্ষার বিকাশ হতে পারে, গড়ে উঠতে পারে শিক্ষিত ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন কিশোর–কিশোরী বা তরুণ–তরুণী। যা আসলে ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে। এভাবে নগদ হস্তান্তর স্রেফ টাকা বিলিয়ে ভোট কেনার কর্মসূচি না হয়ে, শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর কর্মসূচি হয়ে উঠতে পারে একটা বিনিয়োগমূলক প্রকল্প যেখানে খরচ করা অর্থ থেকে সমাজের জন্য স্থায়ী সম্পদ তৈরি হতে পারে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ায় শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর কর্মসূচিকে কাজে লাগানো হয়েছে শিক্ষায় লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার কাজে। এক্ষেত্রে সহায়তার শর্ত হল একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে সাহায্যপ্রাপ্ত মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যাবে না। আবার নগদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সব দেশেই এটা মেনে চলা হয় যে, টাকা দেওয়া হবে পরিবারের মহিলা সদস্যের নামে। এর লক্ষ্য হল সমাজে ও পরিবারে নারীদের ক্ষমতায়ন। ঠিক এই কারণেই ন্যায় প্রকল্পের টাকা পরিবারের মহিলাদের নামে হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, শর্তাধীন নগদ হস্তান্তরের ফলে বিভিন্ন দেশে সবচেয়ে গরিব শিশুদের স্কুলে যাওয়া বেড়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবিরে যাওয়ায় শিশুদের ওজন বাড়ছে এবং তারা নানা ধরনের টিকা কর্মসূচির সুযোগ পাচ্ছে। চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন প্রসূতিরাও। 
দারিদ্র‌্য দূরীকরণে ইদানীংকালে সবচেয়ে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছে চীন। চীনের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে ৮–৭ নীতি। চীনের দারিদ্র‌্য দূরীকরণ কর্মসূচির মূল বিষয় তিনটি:‌ ভর্তুকি দিয়ে ঋণ, কাজের বদলে খাদ্য কর্মসূচি এবং বাজেটে সরকারি সাহায্য। এই কর্মসূচির অঙ্গ ছিল, জমির উন্নতিতে গরিব পরিবারগুলিকে সাহায্য করা, অর্থকরী ফসল চাষে উৎসাহ, পশুপালন, কৃষির বাইরে অন্যান্য কাজের সুযোগ, পিছিয়ে থাকা এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ, গরিব গ্রামগুলিতে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা এবং সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি পুরোপুরি সফল করা। বিকল্পে আয়ের উৎস হিসেবে পর্যটনে উৎসাহ দেওয়া। চীনের দারিদ্র‌্য দূরীকরণ কর্মসূচিকে সামগ্রিকভাবে বিচার করলে আমরা শুধুমাত্র সরকারি সহায়তাই দেখব না। দেখতে পাব, গরিবদের স্বাবলম্বী করার একটা দীর্ঘস্থায়ী কর্মসূচি। শিক্ষা এবং আর্থিক সচ্ছলতা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে চাহিদা তৈরি করে তার প্রভাব থাকে দীর্ঘস্থায়ী। দারিদ্র‌্য দূরীকরণে চীন সেই ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। 
এর মানে এটা নয় যে, এই ধরনের প্রকল্পগুলি দেশে দেশে দারিদ্র‌্যকে পুরোপুরি মুছে দিয়েছে। কতদিন ধরে, কত সময় জুড়ে এ ধরনের প্রকল্প চালানো হচ্ছে, সেই বিষয়টি খুবই জরুরি। ওপর দিকে অর্থনীতির উন্নতি হলে তার সুফল চুঁইয়ে সমাজের নীচের তলায় নামবে, এ ধরনের নীতি গৃহীত হলে দারিদ্র‌্য দূরীকরণ কর্মসূচিই বিপন্ন হয়ে পড়বে। আবার মাঝপথে যদি নগদ জোগান প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তাতেও সমস্যা বাড়বে। আবার এটাও ঠিক যে, মেক্সিকো বা ব্রাজিলের মতো অত্যন্ত যত্নসহকারে এ ধরনের প্রকল্প কার্যকর করা হলে দেশে দারিদ্র‌্য কমবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে গরিবদের উন্নতি হবে। এবং তা কর্মক্ষম মানবসম্পদ সৃষ্টি করবে যার বিনিয়োগে সমাজে উৎপাদনের গুণমান বাড়বে।
আশা করা যায়, এদেশে ‘‌ন্যায়’‌ ধরনের প্রকল্প কার্যকর করার সুযোগ পেলে, স্থায়ীভাবে দারিদ্র‌্য দূরীকরণের লক্ষ্যে, অর্থনীতিবিদরা শর্তাধীন নগদ হস্তান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করবেন।

জনপ্রিয়

Back To Top