দীপ্তেন্দ্র রায়চৌধুরী: মিন্ট স্ট্রিট আর নর্থ ব্লকের মধ্যে মধ্যে একটা সঙ্ঘাত বেধেছে। মুম্বইয়ের মিন্ট স্ট্রিটে রয়েছে দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সদর দপ্তর। দিল্লির নর্থ ব্লকে আছে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক। এই সঙ্ঘাত যত দ্রুত থামে, ততই দেশের মঙ্গল। কারণ, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে, এই সঙ্ঘাতের দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। তবে আপাতত মিটলেও ভবিষ্যতে এমন সঙ্ঘাত আবারও দেখা দেবে। কে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে, অথবা কে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর, সেই প্রশ্নগুলো এক্ষেত্রে খুব প্রাসঙ্গিক নয়। কারণ, এমন সঙ্ঘাত দেশে দেশে বারে বারে ঘটে থাকে, এবং ঘটেই চলে। এক্ষেত্রে স্বভাবতই কে ঠিক, কে ভুল সেই প্রশ্নটাও এসে যায়। তার জবাব পেতে হলে কেন সঙ্ঘাত বাধে, সেইটা বোঝা জরুরি। তার সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে এমন সঙ্ঘাত অর্থনীতির পক্ষে ক্ষতিকর। আর যা কিছু অর্থনীতির পক্ষে ক্ষতিকর, তা যাতে না–ঘটে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যে সরকারেরই, সে কথাটা তো আমাদের সকলেরই জানা। এবারের সঙ্ঘাত যদি এমন জায়গায় পৌঁছয় যার দরুন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর উর্জিত প্যাটেল পদত্যাগ করেন, তবে সেটা কিন্ত অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটা অশুভ বার্তাই বহন করবে।
এই সঙ্ঘাত, মূলগতভাবে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কতটা স্বাধীনতা ভোগ করবে, সেই সংক্রান্ত। বিষয়টা জটিল। কারণ এর মধ্যে অর্থনীতির কচকচি জড়িত। কিন্তু ঘটনা হল, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সঙ্গে সরকারের এমন সঙ্ঘাত সারা পৃথিবী জুড়েই চলে। এখন আমেরিকাতেও চলছে। বেশ কয়েক মাস ধরে চলছে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেহেতু শিষ্টাচারের ধার ধারেন না, তাই তিনি প্রকাশ্যেই বলে চলেছেন, ফেডারেল রিজার্ভ পাগল হয়ে গিয়েছে। জেরোম পাওয়েলকে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কর্তা নিয়োগ করে তিনি ভুল করেছেন, এমন কথাও বলেছেন। কয়েক মাস ধরে চলা এই সঙ্ঘাতের মূল কারণ, ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। সুদের হার বাড়লে মানুষের বিনিয়োগ করার প্রবণতা কমে। দেশে শিল্প–বিনিয়োগ যতটা বাড়াতে পারবেন বলে ট্রাম্প আশা করেছিলেন, ফেডারেল রিজার্ভ সুদ বাড়ানোয় তা ঘটছে না বলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন। তুরস্কেও একই ধরনের সঙ্ঘাত বেধেছে। মজার কথা, যেসব দেশে গণতন্ত্র নেই, সেসব দেশেও এখন এমন ঘটনা ঘটে। যেমন চীনে। সেখানে গত জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কর্তাদের সঙ্গে দেশের অর্থ মন্ত্রকের কর্তাদের ধুন্ধুমার বেধেছিল। পিপলস ব্যাঙ্ক অফ চায়নার গবেষণা–বিষয়ক প্রধান ঝু জং প্রবন্ধ লিখে বলেছিলেন, সরকারের ভুল নীতির কারণে অর্থনৈতিক উন্নতি থমকে যাচ্ছে। কারণ, যা করা হচ্ছে সবই স্বল্পমেয়াদি ভিত্তিতে। এর জবাব দিতে ছদ্মনামে পাল্টা প্রবন্ধ লেখেন সরকারের এক কর্তা। চীনে এমন সঙ্ঘাত অতি–বিরল। 
গণতান্ত্রিক দেশের সরকার চায়, তার রাজনৈতিক প্রয়োজন (‌অর্থাৎ যে কারণে মানুষ সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে এবং আবারও আনতে পারে)‌ অনুযায়ী নির্ধারিত দিশা মেনে চলুক কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো হল অর্থনীতিবিদদের নিজস্ব ক্ষেত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কর্তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। তাঁরা চান, ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্র ও দেশের অর্থনীতি পরিচালিত হোক দায়িত্বপ্রাপ্ত পেশাদার অর্থনীতিবিদদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। অর্থাৎ এ হল মানুষের ভোটে জেতা সরকার ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যেকার লড়াই। সরকার চায় বৃহত্তর স্বার্থ সুরক্ষিত করতে, যাতে মানুষের ভোট পাওয়া যায়। আর কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কর্তারা চান অর্থনীতির কাঠামো সুরক্ষিত করতে। আমাদের দেশে, স্বাধীনতার পরেই প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কর্তাদের স্পষ্ট করে বলেছিলেন, সরকারের মর্জিমতোই তাঁদের কাজ করতে হবে। কিন্তু ব্যাঙ্কের তৎকালীন গভর্নর স্যর বেঙ্গল রাম রাউ তাঁর নির্দেশ মেনে চলতে রাজি ছিলেন না। এরপর নেহরু তাঁকে লেখেন, ‘.‌.‌.‌ ‌আমি আপনাকে স্পষ্ট করে বলেছিলাম যে নীতি নির্ধারণ করা সরকারের কাজ এবং আরবিআই সরকারের নীতির পরিপন্থী কোনও নীতি নিয়ে চলতে পারে না।’‌ নিলে সেটা হবে একেবারে বেখাপ্পা একটা ব্যাপার। ‘‌আরবিআই সরকারের মূল নীতি ও লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না’,‌ লিখেছিলেন নেহরু।

এই বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৭ সালে বেঙ্গল রাম রাউ পদত্যাগ করেন। এই বিরোধের মূল কারণ ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে যে ‘‌ইনস্ট্রুমেন্ট’‌ ব্যবহৃত হত, তার ওপর সরকারের স্ট্যাম্প ডিউটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত।  
২০১৩ সালেও আরবিআই–এর তৎকালীন গভর্নর ডি সুব্বা রাওয়ের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরমের বড়সড় বিরোধ বেধেছিল। কারণ ছিল, সুদের হার। আরও অতীতে ওয়াই বি রেড্ডির সঙ্গেও সরকারের সঙ্ঘাত বেধেছিল। এখন এদেশে যে সঙ্ঘাত বেধেছে, তার মূল কারণ, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলোর ওপর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কড়াকড়ি। এর ফলে ব্যাঙ্কগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানি হয়ে পড়েছে। সরকার চাইছে, বিধিনিষেধ শিথিল হোক। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তা মানছে না। সরকারের বক্তব্য, ব্যাঙ্ক বেশি করে ঋণ না–দিলে শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে না। তাতে অর্থনীতির ক্ষতি। মানুষের কাজের সুযোগও তৈরি হবে না। অন্যদিকে ব্যাঙ্কগুলো অনাদায়ী ঋণের ধাক্কায় যেভাবে ঝুঁকছে, তার পরে আর নিয়মবিধি শিথিল করতে চাইছে না রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারকে দেওয়া বার্ষিক ডিভিডেন্ড বাড়ানো এবং আরবিআই–এর হেফাজতে থাকা ৯.‌৫৯ লক্ষ কোটি টাকার এক–তৃতীয়াংশ সরকারকে দেওয়ার দাবি। সরকারের উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। ভোটের বছরে সরকারের হাতে বিনিয়োগের জন্য আরও টাকা আনা‌। যাতে শিল্প তৈরি হয়, কাজ তৈরি হয়, মানু্ষের রোজগার বাড়ার সম্ভাবনা এবং সরকারের ভোট বাড়ে। উল্টোদিকে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মনে করছে, টাকার দাম পড়ে যাওয়া ঠেকাতে বা ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে আচমকা তৈরি হওয়া কোনও সঙ্কটের মোকাবিলায় এই টাকা তাদের হাতে থাকা জরুরি।   
একটা সঙ্কট অনেকদিন ধরেই দানা বাঁধছিল। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর ও শ্রদ্ধেয় অর্থনীতি–বিশেষজ্ঞ ওয়াই বি রেড্ডি গত জুন মাসে এই সঙ্কটের সূত্র ধরে বলেছিলেন, মনমোহন সিং সরকার ২০০৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের মোকাবিলা করতে গিয়ে ঢালাও ঋণ দিতে ব্যাঙ্কগুলোকে উৎসাহিত করেছিল। ফলে পরিকাঠামো ক্ষেত্রের মতো জায়গাতেও (‌যেখানে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতা ব্যাঙ্কের নেই)‌ ঋণ দেওয়া শুরু হয়ে যায়। তার ফলেই এখনকার অনাদায়ী ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে। আর নরেন্দ্র মোদি সরকারকে তিনি দায়ী করেছিলেন আরও আগে পিএনবি–কেলেঙ্কারির মতো বিষয়গুলি ধরতে না–পারা এবং ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার জন্য। আস্থা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন ব্যাঙ্ক বিলকে (‌যার পোশাকি নাম ছিল ফিনান্সিয়াল রেজলিউশন অ্যান্ড ডেপজিট ইনসিওরেন্স বিল)‌। শেষ অবধি বিলটা সরকার তুলে নিলেও মানুষের মনে ভীতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এখন, এই ব্যাখ্যার সূত্র ধরে বলা যায়, মনমোহন জমানায় ঢালাও ঋণদানের খেসারত দিতে মোদি জমানা রাজি হচ্ছে না। তারা এই মুহূর্তে দেশের দ্রুত বিকাশ চাইছে। তার জন্য ব্যাঙ্কের ওপর কড়াকড়ি শিথিল করতে চাইছে। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তারা ভয় পাচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও বড় কেলেঙ্কারি না–ঘটে যায়। ঘটলে তো তার জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্কই দায়ী থাকবে। অনাদায়ী ঋণের যে পাহাড় তৈরি হয়েছে, তার জন্যও তো এখনকার অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি রিজার্ভ ব্যাঙ্ককেই দায়ী করেছেন।
কে ঠিক, কে ভুল, তা নিয়ে বিতর্ক থাকবে। কিন্তু এর ফলে যাতে সঙ্কট তৈরি না–হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই। কারণ, সঙ্ঘাত গুরুতর জায়গায় পৌঁছলে, বিনিয়োগকারীরা ভয় পেয়ে যাবেন। সরকার বিশেষ ধারা ব্যবহার করে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে নির্দেশ মানতে বাধ্য করেছে। তারপর গভর্নর উর্জিত প্যাটেলের সম্মতিতে ৪৪ বছর বয়সি ডেপুটি গভর্নর বিরল আচার্য সঙ্ঘাতের বিষয়য়টাকে প্রকাশ্যে এনেছেন। কোনও ভুল করেননি। কারণ, এই সঙ্ঘাতটা যে চলছে, তা মানুষের জানা প্রয়োজন ছিল। তবেই তো ভবিষ্যতে বোঝা যাবে কে ঠিক ছিল আর কে ভুল ছিল। সেই অনুযায়ী শিক্ষা নেওয়া যাবে। কিন্তু এবার এই সঙ্ঘাত যাতে সঙ্ঘর্ষে পরিণত না হয়, সেটা সরকারকে দেখতে হবে। উর্জিত প্যাটেল ও বিরল আচার্য, উভয়কেই দায়িত্বে এনেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বিরোধ না–মেটাতে পারলে সেটা মোদি সরকারেরই বড়সড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top