গৌতম রায়: অনেক দেরি হয়ে গেছে। চুলের মুঠি ধরে, চোখ গেলে দিয়ে, মুখে ঘুষো মেরে আর সে সবেও না হলে খুন করে ফেলে মৃতদেহকে বলা হচ্ছে— ‘‌বল জয় শ্রীরাম’‌! জীবনে অনেক কথা বুঝতে, বলতে দেরি হয়ে যায়। তা দোষের কিছু নয়। তাই, এখনই আর দেরি না করে জোর দিয়ে বলা দরকার— এ রাম সে রাম নয়। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে বলুন, ‘‌জয় শ্রীরাম’— এমনতর কোনও উদ্ধত, ঘৃণাময় শব্দবন্ধ ‌রামের নামে আমরা পূর্বে শুনি নাই। রামনামের ধর্মীয় রাজনীতি মূলক স্লোগানে শত্রুদলন রামের শুধুই যে বিদ্বেষ ধরা পড়ে, তার জন্ম তো ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ করার ঠিক পরমুহূর্তে।  উমা ভারতী ও স্বাধ্বী ঋতম্ভরার কুৎসিত উল্লাস নৃত্যের মাঝে করসেবকদের ‘‌জয় শ্রীরাম হো গয়া কাম’‌ ইত্যাদি অশোভন, মিচকে  জয়ধ্বনির মধ্যে দিয়ে। কিন্তু বিভিন্ন সংস্করণের রামায়ণে, ভূভারতের গেঁয়ো রামলীলায়, বৃহৎ ও সম্পূর্ণ হনুমান চালিশায়, রামের ভজন গানে, তুলসীদাসের রাম চরিত মানসে, স্বাধীনতার বহু পূর্বে ও পরে রাম এবং তাঁর রামরাজ্য নামে দক্ষিণ ও উত্তর ভারতীয় ভক্তিমূলক অগুনতি সিনেমায় এবং ১৯৮৭, ৮৮ সালের দূরদর্শন সম্প্রচারিত টিভি সিরিয়ালটিতেও এমনতর ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ ‌ধ্বনি কোথাও কখনও নেই। না থাকাই স্বাভাবিক। রাম চরিত্রের টিকাকার ও ভাষ্যকার পণ্ডিতদের রাম গবেষণায় কিন্তু রাম চরিত ব্যাখ্যায় এরই সমর্থন মেলে।  ইউ টিউবে রামের সিনেমা প্রায় সবগুলিই দেখা যায়, গান–‌‌গজল শোনা যায়— দেখে, শুনে আপনি বিচার করুন। এমন উদ্ধত বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কেউ ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ ধ্বনি তোলেননি— কথাটি কিন্তু  তা মাত্র নয়।  দেশের আপামর সাধারণ রাম ভক্তেরা, এমন হিংস্র চরিত্রের, প্রতিশোধকামী, ত্রাসের মধ্যে দিয়ে তোলা তোলার মতো জয়ধ্বনি আদায়কারী রামে অভিরুচি হয় না বলেই পুরনো ও সাম্প্রতিক রাম কথকরা ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ শব্দটি ব্যবহার করেননি। —রাম একজন রাজা। রাজার নামের সঙ্গে সবেগে জয়ধ্বনির মধ্যে যেহেতু অন্যেকে হিংস্র যুদ্ধের মাধ্যমে আক্রমণ অভিযানের বা আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করে ফেলার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়ে যায় তাই রাম কথকেরা ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ ধ্বনি ‌ব্যবহার করেননি। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে যে প্রতিশোধকামী এবং জয়ী রামের মন্দির তৈরির দাবি উঠেছে, রাম কথকেরা কখনই তাঁদের অন্তরের ‘‌রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’‌কে তার সঙ্গে সমার্থ করে দেখেননি। —গড়পড়তা ভারতীয়ের রাম নামে ভীতি নয় সম্ভ্রম জাগে।  মূল হনুমান চালিশা যাঁরা শোনেন বা পড়েন তাঁরা বুঝবেন রামের নামে জয়ধ্বনি নেই।  বজরঙ্গবলী শ্রী হনুমানের নামে কিন্তু জয়ধ্বনি আছে। থাকার কারণ তিনি বীর। রামায়ণের রামের ভাবমূর্তি কখনই দিগ্বিজয়ী বীরের মতো  বীররস রঞ্জিত নয়। নিজ ধর্মপত্নীকে উদ্ধারের জন্য শ্রী রাম,  শক্তিমত্ততায় কু প্রবৃত্তির বশ— পরস্ত্রী অপহরণকারী লঙ্কেশ রাবণের বিরুদ্ধে ‘‌ধর্মযুদ্ধ’‌ করেন। যুদ্ধে রাবণের পরাজয় ও বিনাশের পরে তাঁর ভাই বিভীষণের রাজ্য অভিষেকে সবার সঙ্গে একযোগে রাবণ শোকে বিলাপে আকুল হন। একজন ক্ষত্রিয় হিসাবে তাঁর বীরত্বের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন (রামায়ণ, যুদ্ধ কাণ্ড, স্বর্গ ১১৩— কোরা ডাইজেস্ট)‌। পণ্ডিতরা লক্ষ্য করেছেন, ভূভারতে আদি অনন্তকাল থেকে প্রচারিত মহাকাব্যে— রামায়ণে,  মহাভারতে, ভগবতগীতায়, প্রবল পরাক্রান্ত সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ জয়ের বিষাদ ইতিহাসে শত্রু নিধনে উল্লাসের বদলে এক শোকাবহ মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। পণ্ডিতরা তাই এগুলিকে জাতের বিচারে ইউরোপের হিরো হিস্ট্রির বদলে ভারতীয় ধরনের  ট্র‌্যাজেডি বলেছেন। যা, যুদ্ধ, হিংসা অনুমোদন করে না। এ জন্যই সম্রাট অশোক দিগ্বিজয়ে সেনা প্রেরণ না করে বৌদ্ধ শ্রমণ প্রেরণ করেন।  আপামর রামভক্তের রাম‌ তুলসীদাসের রাম। গান্ধীজির রাম। এতে শুধুই প্রেম আর জাতি সমন্বয়। বেনারসের ঘাটে বসে থাকা অযোধ্যার ভিক্ষুক কবি তুলসীদাস রামের অগাধ সম্পত্তি পেয়েছেন। (‘‌রাম-‌রতন ধন পায়ো—’‌)। যা, চোরে চুরি করতে পারে না, শত খরচেও ফুরায় না, শুধু বেড়েই চলে। যা হল আসলে ‌ভালবাসা। এই ঘাটেই কিন্তু আক্রমণকারী পাঠানদের সঙ্গে বিশ্বনাথ মন্দিরের পূজারিদের সঙ্ঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু তুলসীদাসের রামকে তা হিংস্র করে তুলতে পারেনি। বিজেপি, আরএসএস পেরেছে।  বিপদে বুকে সাহস জাগানো কথাটি হল, গোটা দেশের দেহাতি গেঁয়ো  রামভক্ত মানুষ নিজে জানেন, এ তাঁদের ভালবাসার রামের নামে জয়ধ্বনি নয়। তাঁদের সান্ধ্য রামলীলার আসরে, যা পুজোপাঠের কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। একটি শো, যেখানে সকল জাতের, সব ধর্মের মানুষই আনন্দ করে আসেন। অভিনয়ও করেন। হাজারো কিসিমের রামলীলায়, অযোধ্যার রাজা হিসাবে অভিষেক হওয়া সত্ত্বেত্ত রাম যখন  পিতৃসত্য— যা রিপুদোষে রাজা দশরথ করেছিলেন তা শিরোধার্য করে বনবাসী হন। দর্শকেরা রামের এ মহত্ত্বে উদ্বেল হয়ে ওঠেন। ভাবেন, তাঁরও তো জীবনে কত দোষ–‌ত্রুটি–‌বিচ্যুতি, সন্তান কী রামের মতো করে তা নেবে? ‌সন্তানও তো সে পালায় দর্শক হিসাবে হাজির। সেও রামের মতো মহান হতে চায়— জন্মদাতার সম্মান রক্ষার দায় যে তার তা সে বুঝে নেয়। রামলীলার রাজা দশরথ তো দর্শকের মধ্যে পরিবারের কর্তা নিজেই। কৈকেয়ী, মন্থরা তাঁরা তো তাঁদের পরিবারেই বাস করেন। কিন্তু সে সমাজে রামের দেখা নাইরে। অদৃশ্য মন্ত্রী এমএলএ, এমপি, বিডিও সাহেব, সরপঞ্চ (‌পঞ্চায়েত প্রধান)‌— যাঁদের রাম হওয়ার কথা ছিল তাঁরা হননি। রামলীলার সবচেয়ে পপুলার চরিত্র হলেন লেজওলা বীর হনুমান। তিনিই সেলিব্রেটি— ম্যাটিনি আইডল। গাঁয়ের হেটো-মেঠো মানুষ রামায়ণের এই বহুরঙ্গী বজরঙ্গবলীর সঙ্গে কী এক সাযুজ্য অনুভব করেন। পণ্ডিতদের বিচারে সে খুব ভুল নয় কিন্তু। বজরঙ্গবলী হনুমান যিনি ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধায়ের মতে  বঁাদর নন, সংস্কৃতে বড় হনু বা চোয়াল যুক্ত মানুষ। নেগ্রয়েড মানুষের এক অগ্রগণ্য পুরোধা পুরুষ। বাঁদর ওঁদের টোটেম দেবতা। সে নামেই ওঁরা পরিচিত হতে পছন্দ করতেন। তাঁরা আদি অস্ট্রেলয়েড জনজাতির রক্তে রক্ত মিশিয়ে বিলীন হয়ে গিয়ে গাঁয়ে বজরঙ্গবলীর ভক্ত হয়েছেন। রামলীলার আসরে সেই ভক্ত যখন দেখেন, রাম তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে স্তুতি করে বলছেন, শ্রী হনুমান একজন বীর মাত্র নন, প্রজ্ঞায় ও ন্যায়পরায়ণতায় রাজা ভরতের সমান— আমার আর এক ভাই (‌হনুমান স্তুতি, বৃহৎ হনুমান চালিশা)। হাততালি আর এনকোরে রামলীলা মাঠ ফেটে পড়ে। এই হল রাম রাজ্য যেখানে সব জাতি স্থান পেয়েছিল। তার জন্য ধর্মান্তরিত হতে হয়নি। বরং তাঁদের ঠাকুর— সাপ (‌নাগ)‌, বাঁদর, শুঁড়ওলা গণেশ বাবাজি আরও হাজার দেবতাকে বৈদিক ধর্মে চালান করে দিয়ে সেই পুরনো ধর্মেই আছেন। এঁরা আজ সব হিন্দুর দেবতা। হিন্দু ধর্মে তাই বহু জাত। বহু ঠাকুর দেবতা। অভিন্ন বাংলায়, মঙ্গল সিন্নির সত্যপিরের পায়ের আলতা ছাপ ঠাকুর ঘরে কী সুন্দর লক্ষ্মী নারায়ণের ছবির পাশে স্থান করে নিয়েছিল— একটুর জন্য বাঙালির ধর্ম সম্প্রীতির ছক্কা লোপ্পা ক্যাচ হয়ে গেল। তাই রামায়ণের নামে বা রামের নামে মুসলমানকে বা ছোট জাতকে ঘৃণা করা রাম–‌‌রাজ্য চলবে না। সে জন্যই স্বাধীন বহুজাতিক ভারতের জন্য হিন্দু মুসলমানের রামরাজ্য ছিল গান্ধীজির ফরম্যাট। এই ‘‌রামরাজ্য’‌ নামে  (‌শোভনা সমর্থ, প্রেম আবিদ)‌ ১৯৪৩ সালে একটি সিনেমা রিলিজ হয়। সেটিই গান্ধীজির দেখা একমাত্র সিনেমা। লন্ডনের ব্যারিস্টার বলে তিনি হনুমান সংস্কৃতি ঘৃণা করেননি। আর যাঁরা এক দিকে বলবেন জাতি ঘৃণা মানি না, আবার রাম ভক্ত, হনুমান ভক্তের সংস্কৃতিকে অস্পৃশ্যের মতো ঘৃণা করে অজানিত এক উচ্চমন্যতায় ‘‌বাঁদর সংস্কৃতি’‌ বলে ইতিহাস লিখবেন, নিবন্ধ ফাঁদবেন, আবার বিজেপি–‌কে সাম্প্রদায়িক বলে নিন্দা করে তিনিই সার্টিফিকেট লিখে দেবেন ‘‌হিন্দুত্ববাদী’‌! যেন, হিন্দু ধর্মটিই সাম্প্রদায়িক— তবে তো এই ‘‌জয় ‌শ্রীরাম কবুল’‌ করানো বিজেপি–‌র পোয়া বারো হবেই। নির্বাচনে তাই তো হয়েছে। এঁরা আবার হিজাব পরে নমাজ পড়ার জন্য মমতার সমালোচনায় মুখর। মমতার নমাজ পড়া, অঞ্জলি না দিয়েও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পুজো কমিটি পরিচালনা— এমনতর বেশ কিছু আমাদের চোখের সামনে সর্বধর্ম সমন্বয়ের গান্ধী পথের ‌ফলিত প্রয়োগ হয়ে চলেছে। লক্ষ্য করছি কি?‌

জনপ্রিয়

Back To Top