মিরাজুল হক: এটা কুইজ প্রতিযোগিতার প্রশ্ন নয়। তবে প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক। ক্লাস টিচারের রোল কলের মতো দেশের রাজা তাঁর পারিষদদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন বোধহয়। কিংবা ‘‌রাজার–ওপরওয়ালার’‌ নির্দেশ জারি করা হয়েছে দেশ শাসনের নানান বিধি–নিয়ম, অনেকটা সিনেমার পরিচালকের নির্দেশে নিপুণ অভিনয় করার ফরমান। পড়াশোনা করা, না–‌পড়াশোনা করা, ‘আমরা– তোমরা– সবাই’‌ এক ধরনের নেশার ঝোঁকে সজ্ঞানে বা না–বুঝে, না–জেনে এই ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে, নিজেদেরকে দেশপ্রেমের প্রমাণ দেওয়ার পরীক্ষা। এ রকম একটা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, হাজারো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো থেকে মানুষজনের ভাবনা চিন্তাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। পরীক্ষার উত্তরপত্রে রাজার পছন্দের পয়েন্টের সঙ্গে না মিললে, তোমাকে– তোমাদেরকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যা দেওয়া হবে।
‘দেশ’‌ এবং ‘প্রেম’‌—  এই শব্দ দুটোর ভিতরের ভাবগুলোকে আগে সম্প্রসারণ করা দরকার। দেশ বলতে কি... ? রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‌দেশ মানুষের সৃষ্টি। দেশ মৃন্ময় নয়, সে চিন্ময়। মানুষ যদি প্রকাশমান হয়, তবেই দেশ প্রকাশিত। দেশ মাটিতে তৈরি নয়, দেশ মানুষের তৈরি। ‘‌তাই দেশের প্রতি প্রেম হল মানুষের বিকাশ, পড়াশোনার মধ্য দিয়ে ভাবনাচিন্তার উত্তরণ, শিক্ষা– গবেষণা–‌ স্বাস্থ্য– কর্মসংস্থান– খাওয়া পরা– পরিবহণ–‌ যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামগ্রিক সমাজ অর্থনীতির আগা–‌পাছ–‌তলা। এই সব ইনডেক্সে উন্নয়ন হলে, দেশের প্রতি ভালবাসার সঠিক নিদর্শন হবে।
দেশের প্রতি এই প্রেম–ভালবাসার অর্থনীতি– সমাজনীতি– রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইনডেক্সের বাইরে, ‘‌প্রেম’‌–‌এর একটা আলাদা অবয়ব আছে, রাজ্য রাজনীতির নিরিখে। বিশ্বব্যাপী ‘কনজিউমারিজম’‌, বৃত্তের চাওয়া পাওয়ার বাইরে হৃদয়ের মানবিক গুণগুলোর– মানুষজনের প্রতি ভালবাসা–‌ ঘৃণা, পারস্পরিক বেঁচে থাকার জন্য সহযোগিতা ‘করা–না–করা’ সহিষ্ণুতা–অসহিষ্ণুতা, এই সব নিয়ে চারিত্রিক গুণের বৈশিষ্ট্য হল দেশের প্রতি প্রেম। এই ধারণাগুলো ধীরে ধীরে মানব সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসে বর্ণনা করা আছে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাতে অসংখ্য বর্ণনার মধ্য দিয়ে হৃদয়–হৃদয়হীন, সামাজিক–অসামাজিক, সহিষ্ণুতা–অসহিষ্ণুতা, ভালবাসা–‌ঘৃণা, এই সব বিষয়গুলোর ধারণা কি হওয়া উচিত, সে–‌সব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আমরা–তোমরা–সবাই, এই সব নিয়ে পড়াশোনা করব না, না–কি, পড়েও, সজ্ঞানে ভুলে গিয়ে, নেশার ঝোঁকে রাজার অমানবিক কার্যকলাপগুলো মেনে নেব।
প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তরটাও সরল। হাজার কোটি টাকা খরচ করে অস্ত্রশস্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করে, বিদেশি পুঁজিপতিদের মুনাফা ফাঁপানো, না কোটি কোটি বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান করা... ? ধর্মীয় জিগির তুলে, ডিজিটাল মার্কেটিং–‌এ, কোটি কোটি টাকা খরচ করে মানুষজনকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়া, না কি দেশের শিক্ষা–স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নতি করা... ? বন্যা প্রতিরোধের জন্য, পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর দ্রুত শিল্পায়নের জন্য, কোটি কোটি বেকারদের জন্য আলাদা আলাদা করে কাজ করা কি দেশপ্রেমের নিদর্শন হতে পারে না.‌.‌.‌ কি জানি, হয়তো রাজার ওপর নির্দেশ আছে, সারা দেশব্যাপী ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি করা; যারা এই কার্যকলাপে বাধা দেবে, অন্ধকারে মুখোশধারী লোক দিয়ে তাদের ‘শুট–আউট’‌ করে দেওয়া। ‘বেটি–বাঁচানো’‌র থেকেও, যারা বেটিদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করে, তাদেরকে প্রশাসনিক নানান নিয়ম ও বে–‌নিয়মের কৌশলে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া। অর্থবলে, বাহুবলে দাগি– ফৌজদারি মামলা চলা অবস্থাতেও বিধায়ক–সংসদ নির্বাচিত হয়ে দেশের রাজ্য রাজনীতির সিস্টেমে থাকছেন!‌ না কি এটা দেশপ্রেম! এ পাড়া, ও পাড়া, এ–রাজ্যে ও–‌রাজ্যে, দেশের শাসনব্যবস্থাতে ধর্মীয় উন্মাদনা, অসহিষ্ণুতার বীজ বপন করে, এই ভাবনাগুলোর প্রচার করা হবে, এটা দেশপ্রেমের নিদর্শন।
‘দেশপ্রম ও দেশদ্রোহী’‌র কাজকর্ম কোনগুলো হবে, কোনটা ঠিক বা ঠিক–না, নির্ভর করে, নিজেদের পড়াশোনা, স্কুল–কলেজ, বাড়ি–পাড়া–সমাজের ভাবনাচিন্তার পরিমণ্ডলের ওপর।
আমাকে আপনাকে সবাইকে ঠিক করতে হবে, কোন কোন বিষয়গুলো, সজ্ঞানে প্রচার করব; স্কুল–কলেজে, পাড়ার ক্লাবে, লাইব্রেরিতে, ব্লক–‌জেলা–‌ রাজ্য স্তরে, বিতর্ক আলোচনা সভার মাধ্যমে, সেই সব ভাবনাচিন্তাগুলোর প্রচার করতে হবে, যেখানে আলোচনা হবে সমাজের পুরনো বিধিনিষেধের লিখিত অলিখিত বাধা অতিক্রম করে শ্রীচৈতন্য ‘‌যবন হরিদাস’‌কে কোল দিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের মতো মহামতি, এক মুসলমান ভক্তকে মুহম্মদ নাম দিয়েছিলেন, অকুণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর স্বপ্নের ভারতবর্ষ গড়ে উঠবে ‘Vedanta brain and Islamic body’‌র শুভ সমন্বয়ে। অজস্র কথা এ প্রসঙ্গে বলার আছে। আমরা কী করে ভুলে যাব যে, হুসেন শাহ, পরাগল খানের মতো মুসলমান শাসক মহাভারত রামায়ণ অনুবাদে সহায় হয়েছিলেন? সে যুগে পণ্ডিতেরা যখন সংস্কৃত চর্চা ছেড়ে বাংলার মতো নিকৃষ্ট ভাষার দিকে মন দেওয়াকে ‘‌রৌরব নরক’‌–এ নিক্ষিপ্ত হবার মতো পাপ বলে ঘোষণা করেছিলেন, তখন এই ধরনের উৎসাহ বিনা বাংলা ভাষার প্রবাহ শুকিয়ে যেতে পারত। বাহমনি রাজ্য সুদূর দক্ষিণে। জনসংখ্যার বেশিরভাগ হিন্দু এবং এই হিন্দুরা ‘‌উসুফ আদিল শাহ’‌–‌এর মতো রাজাকে ‘‌জগদ্‌গুরু’‌ আখ্যা দিয়েছে, তেলুগু ভাষার এক জনক বলে তিনি আজও মান্য। সম্রাট আকবরের আদেশে দেশ বিদেশের বিখ্যাত সব চিত্রকর মিলে মহাভারতের বিভিন্ন দৃশ্যের ছবি এঁকে গিয়েছেন, যা হয়তো দেখতে হলে আজ বিদেশ যেতে হবে। শাজাহানের ছেলে দারা শিকোহ, উপনিষদের আরবি ও ফারসি তর্জমার ব্যবস্থা করেন– ‘‌A moment in universal history’‌ বলে যে ঘটনাকে বর্ণনা করেছেন ইতিহাসবিদ্বান কে এম পানিকর।
আমাদের চুপ করে থেকে, সময়ের হাতে সবকিছু ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে কি? ওদের আপাত সহজ এই প্রশ্নের উত্তরগুলো আমাদেরকে তৈরি করে দিতে হবে। পার্থক্য করে দিতে হবে— দেশপ্রেমিক ও দেশদ্রোহী!‌‌ পাড়া প্রতিবেশী থেকে শুরু করে স্কুল কলেজ জেলা রাজ্য, ক্লাবে লাইব্রেরিতে, অফিসে,‌ সর্বস্তরে এই প্রচারের কাজটা শুরু করতে হবে।

স্বাধীনতার গাছটি। বয়স হল ৭৩। দিল্লিতে। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top