দেবেশ রায়: ১৯ এপ্রিল প্রায় সব কাগজেই দুটো ছবি নানা আকারে বেরিয়েছে। একটা ছবি কেরলের ওয়ানাডে কেন্দ্রের প্রার্থী রাহুল গান্ধী তিরুনেল্লি মহা বিষ্ণু মন্দিরে পুজো দিলেন। তিরুনেল্লিকে দাক্ষিণাত্যের বারাণসী বলা হয়।
এই পুজো–‌দেওয়ার পেছনে নাকি রাজনীতি আছে। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ প্রচার করছিলেন— আমেঠিতে জিততে পারবেন কিনা সেই সংশয় থেকেই রাহুল নাকি মুসলিম অধ্যুষিত ওয়ানাডকে বিকল্প করেছেন।
এই প্রচারের যে কোনও ভিত্তি নেই, সেটা জানাতেই নাকি তিরুনেল্লির মহা বিষ্ণু মন্দিরে রাহুল পুজো দিয়ে জানালেন.‌.‌.‌  কী জানালেন.‌.‌.‌ যে তিনি হিন্দুই আছেন?‌ .‌.‌.‌ যে তিনি মুসলিম ভোটার বেশি বলে ওয়ানাডে বাছেননি.‌.‌.‌?‌
দ্বিতীয় ছবিটি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে উঁচু, প্রায় দশ হাজার ফুটই, ভোট কেন্দ্রে দুই খচ্চরের পিঠে ভোট নেওয়ার যন্ত্রপাতি চাপিয়ে নিয়ে চলেছেন দুই কিশোর পাহাড়ি ছিরিখোলার পথে— পূর্ব–‌উত্তর নেপালের সীমান্তে।
এই দুই ছবির মধ্যে কোনটা ভারতবর্ষের প্রকৃত ছবি?‌
নিশ্চয়ই রাহুল গান্ধীর ছবিটি নয়।
ভারতের যত্রতত্র অলিগলি বনবাদাড়ে, গাছের তলায়, পাহাড়ের গুহায়, গলির মোড়ে অজস্র অজস্র দেবতা ছড়িয়ে আছে। মুসলিমদের মাজারও আছে। এ–‌সব দেবদেবীর অদ্ভুত সব নামও আছে। এঁরা নিয়মিত পুজোও পান। সেই পুজো বা পয়সাগুলো কারও–‌কারও রোজগার। ন্যাশনাল হাইওয়েগুলোতে ‘‌হাইরোডেশ্বর’‌ নামে এক পথদেবতা ছড়িয়ে পড়ছেন। ‘‌অ্যাক্সিডেন্টনাশিনী চণ্ডী’‌ ও আছেন। ভারতের মানুষের সঙ্গে ধর্মনির্ভরতা এমন জড়ানো যে, ধর্মনিরপেক্ষভাবে ড্রাইভাররা এই সব পথদেবতাদের পয়সা ছুঁড়ে দেন নৈবেদ্য হিসেবে।
তেমন এক জন ভারতবাসী হিসেবে রাহুল গান্ধী পুজো দিতেই পারেন। কিন্তু সে–‌পুজো দেওয়ার আগে তাঁকে এটা নিশ্চিত করতে হবে— এ ছবি কোথাও ছড়াবে না, এ–‌ছবি কোথাও ছাপা হবে না।
তিনি কংগ্রেস সভাপ্রধান। ভারতের চলমান নির্বাচনের তিনি নেতা। কংগ্রেসের দলীয় সংবিধানে ও অত্যন্ত সুনিশ্চিত নির্বাচনী ইস্তাহারে ধর্মপালনের কথা নেই। ধর্মনিরপেক্ষ কথাটির অর্থ ধর্ম প্রত্যেকের ব্যক্তিগত। সেই ধর্মপালনের প্রক্রিয়া এতটাই ব্যক্তিগত যে, রাষ্ট্রের কোনও প্রবেশাধিকারই নেই সেখানে।
এই জনব্যবহারকে বিজেপি উল্টে দিতে চাইছে। তাদের কাছে ধর্ম একটি সামাজিক বিধিব্যবস্থা, কোনও ব্যক্তির অধিকার নেই— সেই সামাজিক বিধিব্যবস্থাকে অস্বীকার বা অতিক্রম করে। আরএসএস ও বিজেপি–‌র মতে ও আদর্শে সে ধর্ম ‘‌হিন্দু ধর্ম’‌। তারা তাই ‘‌হিন্দু ধর্ম’‌ বলে কথিত এক বা বহু ধর্মাচারকে সমস্ত ভারতীয়ের পক্ষে বাধ্যতা করে তুলতে চায়, তুলেছে অনেকখানি। সাহেবরা আসার আগে ‌‘‌হিন্দু’‌ বলে কোনও ধর্ম ছিলই না। ছিল— ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, ক্ষত্রিয়, শূদ্র— এই চার বর্ণ। কিন্তু বৈষ্ণব, শৈব, জৈন, বৌদ্ধ, শাক্ত ইত্যাদি ধর্ম। সেই সব ধর্ম বিশ্বাসীদের মধ্যে সশস্ত্র দাঙ্গাও হত। এক ধর্মের মন্দিরে অন্য ধর্মের সন্ন্যাসীদের প্রবেশাধিকারও ছিল না।
এক ব্রাহ্মণ আর শূদ্র ছিল সব ধর্মেরই বর্ণ। কারণ ব্রাহ্মণ ছাড়া নিজেদের ধর্মীয় বিধান স্থির হবে না। আর শূদ্র ছিল সামাজিক শ্রমের সঞ্চয়। মাঝখানের বর্ণগুলি এক–‌এক জায়গায় এক–‌এক রকম। এক জায়গার ব্রাহ্মণ, আর এক জায়গার ব্রাহ্মণের ছোঁয়া খেত না।
এমন এক ঐতিহাসিক, প্রমাণিত, এখনও প্রচলিত হিন্দুধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে কায়েম করতে চাইছে বিজেপি–‌আরএসএস।
রাহুল গান্ধীর এই পুজো সেই মিথ্যা ধর্মকে রাজনীতির আঙিনায় টেনে আনল। কোনও রাজনৈতিক কৌশল এমন প্রকাশ্য পূজা–‌আচ্ছাকে সমর্থন করতে পারে না।
কিন্তু ভারত তো গণতন্ত্র।
সেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করছে ওই দুটি পাহাড়ি কিশোর। ছিরিখোলা একটা পাহাড়ি ঝোরা। নেপাল–‌ভারত সীমান্তে। কঠিন রাস্তা। খচ্চর দুটোর পিঠের মালপত্র দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ওখানে যে–‌বুথের জন্য তারা মাল নিয়ে যাচ্ছে, তাতে বড় জোর দু–‌একশো ভোটার বা তারও কম। কিন্তু তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করা ভারতের গণতন্ত্রকে অক্ষুণ্ণ রাখার প্রাথমিক শর্ত। সেই শর্তই এই কিশোর দুটি পালন করছে।
এই পুজো দেখতে–‌দেখতে ক্লান্ত আমাদের চোখের সামনে ভারতকে আমাদের নিত্য দিনে দৃষ্টির সামনে সত্য করে তুলছে এই কিশোর দুটির নির্মল মুখ দুটি। 
মনে পড়ছে:‌ কার্গিল পাহাড়ে যখন পাকিস্তান ঘাঁটি গেড়ে ফেলেছে ও পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে— সে–‌খবর নিকটতম ভারতীয় জওয়ান–‌শিবিরে প্রথম পৌঁছে দিয়েছিল এমনি দুই যাযাবর গুর্জর কিশোর— গুর্জরদের পালনীয় ধর্মাচারের মধ্যে ইসলামও আছে, বৌদ্ধও আছে— আর্যাবর্তের হিন্দুত্ব বোধহয় কমই আছে। সেই জন্য কাশ্মীরে তাদের নেমে–‌আসা আটকাতে চাইছে বিজেপি— কারণ গুর্জররা তো তাদের ভোটার নয়।
রাহুল গান্ধী কোন ভোটার খুঁজতে এমন পুজো দিচ্ছেন?‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top