রাজীব ঘোষ: এখন ঘড়ি পরছি না। কারণ ঘড়ি সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। নামজাদা এক হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজিস্ট বললেন, তিনিও ঘড়ি পরছেন না। তবে সম্পূর্ণ অন্য কারণে। তিনি পরীক্ষাগারে যে লড়াইটা লড়ছেন, ঘড়ি–বাঁধা সময় সেখানে অর্থহীন। তাই কোভিড–১৯ ভাইরাসটির প্রতিষেধক কবে বেরোবে, তারও কোনও ঘড়ি–বাঁধা নির্ঘণ্ট দেওয়া যাবে না এখনও। বরং যথাসম্ভব সরলভাবে বিজ্ঞানের দিকে তাকানো যাক। ডাঃ সিদ্ধার্থ মুখার্জি ভাইরাল ইমিউনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, চমৎকার লেখেন, পুলিৎজার পুরস্কারও পেয়েছেন। ক্যান্সার নিয়ে লিখেছেন ‘দি এম্পেরর অফ অল ম্যালাডিজ’। লিখেছেন ‘‌দ্য জিন: অ্যান ইন্টিমেট হিস্ট্রি’‌। ‘নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকায় করোনাভাইরাস নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। কলকাতার একটা শীতলা মন্দিরে তাঁর মুখবন্ধটি বাঁধা। সেই দেবী শীতলা, যিনি শরীর শীতল রাখেন, যিনি নাকি রক্ষা করেন গুটিবসন্ত থেকে, যে মহামারীর কোনও প্রতিষেধক ছিল না একটা সময়ে। প্রতিষেধক বা টিকা নিয়েই সিদ্ধার্থর আলোচনা। চীনারা দেখেছিল, একবার যার বসন্ত হয়েছে তার আর রোগটা হচ্ছে না। অর্থাৎ শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গিয়েছে। গুটিবসন্তের রোগীর পুঁজরক্ত সুস্থ মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ভাবনা তখনই এসেছিল।
অর্থাৎ মূল শব্দটি হল প্রতিরোধ ক্ষমতা। প্রতিটি মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য আলাদা, আলাদা তার প্রতিরোধ ক্ষমতা। আর শরীরে অন্য রোগ–বালাই থাকলে তো কথাই নেই। মারাত্মক। এখানেই ডাক্তারি বিদ্যার কো–মরবিডিটি শব্দটির প্রয়োগ। এতদিনে সকলেই জেনে গিয়েছেন ডায়াবেটিস, কিডনি কিংবা ফুসফুসের রোগ থাকলে করোনাভাইরাস কালান্তক। করোনা হানা দেওয়ার পর ভারতে প্রথম ৫০টি মৃত্যুর হিসেবে চোখ রাখা যাক। এঁদের মধ্যে অন্তত আটজনের মৃত্যুর পর জানা গিয়েছিল এঁরা কোভিড–১৯ সংক্রামিত। আমাদের রাজ্যেও এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। মৃতদের গড় বয়স কত?‌ ৬১। তবে এর মধ্যে ২৫ ও ৩৮ বছরের দু’‌জন থাকায় গড় একটু কম দেখাচ্ছে, আসলে বেশির ভাগ সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধরাই মারা গিয়েছেন এবং তাঁদের সকলেরই ওই কো–মরবিডিটি ছিল। কমবয়সি দু’‌জনেরই কিন্তু মারাত্মক রোগ ছিল। একজনের লিভার খারাপ ছিল, অন্যজনের কিডনি। এখানে সেই ডিম আগে না মুরগি আগে গোছের প্রশ্নটা উঠছে। অত্যন্ত অসুস্থ মানুষের মৃত্যু ত্বরান্বিত করছে কোভিড ১৯, বাকিরা কিন্তু সেরে উঠছেন। ভারতে প্রথম মৃত ৪৬ জনের মধ্যে ৩৬ জনের মারাত্মক কো–মরবিডিটি ছিল। আবার মৃতদের মধ্যে ৩৬ জনই পুরুষ। ইতালি, স্পেনের কাহিনিটাও কিন্তু একইরকম। ধূমপান?‌ মদ্যপান?‌ বেশি ঝুঁকি?‌ হতে পারে। ওই মৃত ৩৬ জনের মধ্যে ৮ জনের ভেন্টিলেটর প্রয়োজন হয়েছিল। অর্থাৎ তীব্র শ্বাসকষ্টের ঘটনাটা ভারতে সেভাবে দেখা যাচ্ছে না।
এবার আসুন অ্যান্টিবডি পরীক্ষার বিষয়ে। অনেক দ্রুত হবে বলেই আইসিএমআর সংক্রমণের ভরকেন্দ্রগুলিতে অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় যেতে চাইছে। দক্ষিণ কোরিয়াতেও হয়েছে। এখন আমরা করছি আরটিপিসিআর পরীক্ষা। রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ পলিমারেজ চেন রিঅ্যাকশন। এর মধ্যে ট্রান্সক্রিপটেজ এবং পলিমারেজ হল এনজাইম। পলিমারেজ ডিএনএ–র একটা জায়গায় হানা দেয়। গোঁত্তা মারতেই সেই জায়গার বহুগুণ বৃদ্ধি হয়। যেমন শরীরে কোথাও ঘুসি খেলে ফুলে ওঠে। অর্থাৎ সামান্য ডিএনএ ফুলে–ফেঁপে ওঠে, তখন বলা যায় করোনাভাইরাসের আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু করোনা তো আরএনএ ভাইরাস। তাহলে?‌ ডিএনএ পরীক্ষায় হবে কীভাবে?‌ তখন আরএনএ–কে ডিএনএ–তে বদলে দিতে লাগবে ট্রান্সক্রিপটেজ এনজাইম। অ্যান্টিবডি কিন্তু অন্যরকম পরীক্ষা। আমাদের শরীরে কোনও ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়ার আক্রমণ হলেই অ্যান্টিবডি ঝাঁপিয়ে লড়াই করতে আসে। শরীর অ্যান্টিবডি ছাড়ছে কি না, সেটা যাচাই করার পরীক্ষা আছে। তবে শরীরে সংক্রমণ হলেই অ্যান্টিবডি দেখা যাবে, এমন নয়। বস্তুত অনেক দিন না–ও দেখা যেতে পারে। শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় লাগে। তাই এই পরীক্ষায় পাশ করে গেলেই সংক্রমণ নেই, এমন নয়। আমাদের দেশটাই অন্যরকম। সেই কবে থেকেই তো আমরা ‘‌মারী নিয়ে ঘর করি’‌। দূষিত বাতাস, দূষিত জল নিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠা। ঠিক সেই কারণেই আমাদের অ্যান্টিবডি বোধহয় অনেক তৈরি। ভারতীয় জিনে ‘‌হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন’‌ সিস্টেম রয়েছে। একজন বিজ্ঞানী একটু সরল করে দিয়েছেন— যেমন ধরুন জঙ্গি বিমান বোমা ফেলার আগে জায়গাটা লেজার আলো দিয়ে চিহ্নিত করে যায় আরেকটা বিমান। ঠিক সেভাবেই দুষ্ট ভাইরাসকে চিনিয়ে দেয় ‘‌এইচএলএ’‌। অর্থাৎ অ্যান্টিবডিকে চিনিয়ে দিতে হবে তার শত্রুকে। ভারতীয়দের ‘‌এইচএলএ’‌ অনেক বেশি বৈচিত্রে ভরা। শত্রুকে চিনে রাখার ক্ষমতাও বেশি। এই বিষয়ে অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে বইকি।
গুটিবসন্তের টিকা নেওয়া বেশ যন্ত্রণাদায়ক ছিল। দগদগে ঘায়ের ওপর চন্দনের প্রলেপ লাগিয়ে ঘুরতে হত। গায়ে জ্বরও এসে যেত। ঘা শুকিয়ে গেলেও হাতে একটা চিরস্থায়ী দাগ রয়েছে অনেকেরই। তার আগে ছিল বিসিজি। ১৯৪৮ সালে এ দেশে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছিল যক্ষ্মার দাপট কমাতে। এখন অনেকেরই প্রশ্ন, সেই মান্ধাতা আমলের বিসিজি কি আমাদের করোনা রুখতে সাহায্য করবে? নিউ ইয়র্ক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষণা বলছে, ব্যাপক হারে বিসিজি দেওয়া হয়েছিল, এমন দেশগুলিতে করোনা কমই থাবা মারতে পেরেছে। যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব কমে যাওয়ায় আমেরিকা আর ইতালি কিন্তু বিসিজি নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। ইতালি সেভাবে এই টিকা নেয়নি, জাপান নিয়েছে। ইরান বিসিজি নেওয়া শুরু করেছে সবে ১৯৮৪ সালে। অর্থাৎ সেদেশে ৩৬–এর বেশি বয়স যাঁদের, তাঁরা সকলেই কোভিড সংক্রমণের সম্ভাব্য শিকার। আরেক দল গবেষকের হিসেব বলছে, বিসিজি–‌র টিকা নেওয়া দেশগুলিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ অন্য দেশগুলির তুলনায় দশ বাগের এক ভাগ। মৃতের সংখ্যার তুলনামূলক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বিসিজি নেওয়া দেশগুলিতে সংখ্যাটা ১০ লাখ জনসংখ্যা পিছু ৪.‌২৮ জন, না–‌নেওয়া দেশগুলিতে ক্ষেত্রে ১০ লাখ পিছু ৪০ জন। হিউস্টনের দুটি এবং আয়ারল্যান্ডের একটি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তিন বিজ্ঞানীর এই দলটি ৯ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে পাওয়া ১৭৮টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। 
এই মতের বিরুদ্ধ মতও আছে। তবে ওই যে বললাম, পরিবেশগত সহ্যশক্তি আর নেহরুর আমলে নেওয়া বিজ্ঞান–সচেতন একটি সিদ্ধান্ত হয়তো আমাদের রক্ষা করতে পারে। মোদির কথায় থালা বাজান, প্রদীপ জ্বালান— মোদ্দা কথা জেনে রাখুন, নতুন টিকা এখনও দূর অস্ত।‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top