অর্যমা ঘোষ, শুভদীপ মণ্ডল

মহামারির মারণক্ষমতার মুখোমুখি দঁাড়িয়ে মানুষের অসহায়তা এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রতিষেধক আবিষ্কার ও টীকাকরণ সব সময়ই যুগান্তকারী ঘটনা। যদিও তার বণ্টনের ইতিহাস ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। পেরুভিয়ান বার্চ বা সিঙ্কোনা গাছের ছাল থেকে ১৭ শতকে ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক আবিষ্কারের থেকেও রোমাঞ্চকর তার বণ্টনের রাজনীতি। রবার্ট ট্যালবর নামে এক হাতুড়ে ডাক্তার ১৬৭৯ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে বঁাচিয়ে তোলেন ও বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ইওরোপের সর্বত্র ঘুরতে থাকে তঁার মিরাক্‌ল ড্রাগের কথা। সেই আশ্চর্য ওষুধেই সেরে ওঠেন ফরাসি রাজপুরুষ চতুর্দশ লুই, স্পেনের রানি মারিয়া লুইজার মতো হাইপ্রোফাইল ম্যালেরিয়া রোগী। কিন্তু সাধারণ প্রজারা কি সেই সুবিধা পেয়েছিলেন? না। কারণ, প্রতিষেধক নেওয়া বা টীকাকরণের সুবিধা তখনও নাগরিক অধিকারের আওতায় আসেনি।
ভারতে টীকাকরণের ইতিহাসে প্রাচীনতম উল্লেখটি পাই মারাঠা সাম্রাজ্যে। কিন্তু সর্বত্রইএই সুযোগটি ছিল সমাজপতিদের জন্য। তা হলে ঠিক কখন এল গণস্বাস্থ্য সুরক্ষার ধারণা? যখন ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় ‘‌জনগণ’ এবং তার ‘স্বাস্থ্য’, দুটি বিষয়ই রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগের পাশাপাশি নিজেকে জনদরদি প্রমাণ করারও সুযোগ এল। যদিও জনকল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাটির প্রকৃত প্রসার ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। কিন্তু বৃদ্ধি ও উন্নয়নের পরস্পরবিরোধী দোলাচলে ১৯৭০–‌এর দশকে জনকল্যাণ–‌রাষ্ট্র ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করে। রাষ্ট্রের বদলে সমাজ ও অর্থনীতির চালিকাশক্তির জায়গা নেয় বাজার। এবং কল্যাণকর রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে জুড়ে–‌থাকা গণস্বাস্থ্য সুরক্ষার আবশ্যিকতার বিষয়টিও একই ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কোনও বিশ্বব্যাপী রোগ–সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা দেখা না দেওয়ায় জনকল্যাণ রাষ্ট্র এবং তার স্বাস্থ্য–‌ব্যবস্থাকে কোনও বড় সঙ্কটে পড়তে হয়নি। এইড্‌স রোগের প্রকোপও এত সর্বব্যাপী ছিল না, যতখানি এই করোনাভাইরাস। এক দিকে ভাইরাসের তীব্র ভয়াবহতা, অন্য দিকে দুর্বল গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, এই সাঁড়াশি সঙ্কটে যুক্তিবাদী মানুষও তাই দলে দলে ঝুঁকে পড়লেন ‘হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন’ নামক একটি ‘বিশ্বাসের’ দিকে।
ইতিহাসে এমন উদাহরণ আছে ভূরি–‌ভূরি। ব্রিটেনে প্লেগের সময় যখন রোগ সারানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্র ছিল অক্ষম, তখন আসর জমিয়ে বসেছিল হাতুড়ে ডাক্তারেরা। ১৬০২ সালে ইংল্যান্ডের রাজার আদেশ আনুযায়ী লন্ডন কলেজ থেকে লাইসেন্স না পেলে কাউকে ডাক্তার বলে ধরাই হত না। ফলে হাতুড়ে ডাক্তারের সংখ্যা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছিল। সেটাও ছিল মূলত প্লেগের সময়। করোনার ক্ষেত্রেও দেখেছি উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব মানুষকে অসহিষ্ণু করে তুলছে। প্রতিষেধকহীন পরিস্থিতির তাড়নায় মানুষ বিকল্পের সন্ধান করেছে, তা সে যতই অবিশ্বাস্য হোক না কেন।
তবে এখন সমস্যা হল, রাষ্ট্রও এই ‘অর্ধ বিশ্বাস’–‌এর ঘূর্ণনচক্রে আটকা পড়েছে, যা আগে কখনও হয়নি। একুশ শতকের জনতোষামোদী রাজনীতি ও ফেসবুক–টুইটারের মতো নতুন সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, করোনা প্রতিরোধে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ভূমিকার পিছনে বিজ্ঞাননির্ভর সত্যের থেকে বেশি রয়েছে ভুয়ো তথ্য। ধাপ্পাবাজি!‌ এক দিকে দেখছি জনতোষামোদী রাজনীতির কারণে সুদূরপ্রসারী ফলের থেকে তাৎক্ষণিক ফলের আশায় তাড়িত সমাজ ও তারই বশবর্তী রাষ্ট্রযন্ত্র। অন্য দিকে এই প্রবণতাকে উৎসাহ দিচ্ছে নব্য সামাজিক মাধ্যম, যেখানে ‘তথ্য’ প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং পণ্য। তথ্যের এই বাণিজ্যিক চরিত্রই সামাজিক সঙ্কটের ভয়াবহতা বাড়িয়ে তোলে। হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ঘটনা–‌পরম্পরা সেই কথাই বলে।
হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন হল চিকিৎসা–‌বিজ্ঞানের পরিভাষায় একটি ‘ইমিউনিটি মডুলেটর’, যা রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর কাজ করে। এই ওষুধ ম্যালেরিয়া, আর্থরাইটিসের ক্ষেত্রেও কার্যকর। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। তা হলে প্রশ্ন হল, এই রকম একটা ওষুধ কীভাবে দুনিয়া জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল?
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ একটি টুইট‌ থেকে পুরো ঘটনার সূত্রপাত। ‘চায়না সায়েন্স’ নামের একটি টুইটার হ্যান্ডল থেকে বলা হয়, চীনে করোনা মোকাবিলায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন সফল হয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি নাইজেরিয়া থেকে একই বক্তব্য নিয়ে একটি ফেসবুক ভিডিও ভাইরাল হয়। মার্চ মাসের মাঝামাঝি এই দুটি ভাইরাল পোস্টকে হাতিয়ার করে ফরাসি সংবাদমাধ্যম খবর করতে শুরু করে। দিদিয়ের রাউল্ট নামে এক ফরাসি ডাক্তার তঁার গবেষণাপত্রে এই দাবির সত্যতার প্রমাণ দেন। কিন্তু মজার বিষয় হল, তিনি যে–‌পত্রিকায় সেটি প্রকাশ করেন, সেখানকার সম্পাদকমণ্ডলী নিজেরাই বিবৃতি জারি করে বলেন, দিদিয়েরের গবেষণা বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট প্রামাণ্য নয়। এর পরেও একই রকম ভাবে ১৩ মার্চ জেমস তোডারোর একটি টুইট ভাইরাল হয়, যেখানে ১০০% নিশ্চয়তার সঙ্গে বলা হয়, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন করোনা সারাতে সক্ষম।
এর পরই মাঠে নামেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তঁার ভাষণে বার বার হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের উল্লেখ সামাজিক মাধ্যমের একটি নিছক দাবিকে প্রাতিষ্ঠানিক মান্যতা দেয়। গুগ্‌ল সার্চে এক নম্বরে উঠে আসে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। সমাজমাধ্যমে আরও জোরালো ভাবে শুরু হয়ে যায় আলোচনা। বাকি ওষুধের ক্ষেত্রে মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং সাফল্যের পরেই তা চিকিৎসায় প্রয়োগ করা হয়। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ‘সেল লাইন স্টাডি ’ এবং কিছু মৌখিক ব্যক্তিগত বয়ানের ওপর ভরসা করে মানবদেহে এই ওষুধ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় অনেক দেশ। সমাজমাধ্যমের ‘‌ট্রেন্ড’‌ অনুসরণ করতে গিয়ে বঁাচার তাগিদে মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই ওষুধ খেতে ও মজুত করতে শুরু করে। একই ভাবে বহু সরকারও একই রাস্তায় হেঁটে নাগরিক স্বার্থে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন মজুতের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। ভারতে ২২ মার্চ আইসিএমআর–এর পক্ষ থেকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনকে ‘প্রোফাইল্যাক্টিক’ হিসেবে প্রয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। পাশাপাশি, দেশের ভেতরে এই ওষুধের উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হয় এবং রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। যদিও পরে আন্তর্জাতিক চাপের সামনে সেই নির্দেশিকা তুলেও নিতে হয়। সরকারের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত আমেরিকা, ব্রাজিল–‌সহ মোট ৫৫টি দেশে ভারত এই ওষুধ পাঠিয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক চাপের সামনে নতিস্বীকার করেছে— বিরোধীদের এই সমালোচনাকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে শাসক দলের দাবি, এই পদক্ষেপ মোদির ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার লক্ষ্যে এক ধাপ এগিয়ে রাখল।
হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন তার গুরুত্ব ধরে রাখতে পারেনি। অনেকেই তার ব্যর্থতার খবর দিয়ে চলেছেন। কিন্তু ভয় হচ্ছে যে, এখানেই শেষ নয়, বরং আরও অনেক এমন আশ্চর্য ওষুধের খবর পাওয়া যাচ্ছে নানা জায়গা থেকে। করোনা মোকাবিলায় ‘র‌্যামডেসিভির’ নামের একটি ওষুধের সঙ্গে আর্সেনিকাম অ্যালবাম–৩০ নামে একটা ঘুম–‌পাড়ানো ও অবসাদ কমানোর ওষুধের কথা যেমন পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি সোডিয়াম ক্লোরাইটের মিরাক্‌ল মিনারেল সলিউশন–‌এর তত্ত্বও শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু আশার আলো কি একেবারেই নেই? আমাদের মনে রাখা দরকার যে, রবার্ট ট্যালবর–এর হাতুড়ে ওষুধই দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী পর বিজ্ঞানসম্মত কুইনাইন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। হয়তো অর্ধপ্রমাণিত প্রচেষ্টাগুলিই তার সোপান, কিন্তু তার আগে পর্যন্ত প্রয়োজন অপেক্ষা করা। রাষ্ট্র ও জনতা উভয়েরই।
(‌ছাত্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল 
নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়)‌

জনপ্রিয়

Back To Top