অভিযোগ, শনিবার বারুইপুরে ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ ধ্বনি‌ তুলে প্রহৃত হয়েছেন একজন বিজেপি কর্মী। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন জনৈক, মমতার সঙ্গে রথের রশিতে টান কেন অভিনেত্রী নুসরত জাহানের?‌ তাহলে আমিও ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখে হজে যেতে ইচ্ছুক। মুখ্যমন্ত্রীকে আমার হজযাত্রার ব্যবস্থা করতে হবে। ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ বলতে রাজি হয়নি, দীঘার গ্রামে মারধর করা হয়েছে এক ছাত্রকে। সে গুরুতর আহত। ভাতারে বিজেপি–‌র গ্রাম দখলকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘর্ষের ঝাপটায় শক্তিগড়ে ভারসাম্য হারিয়ে একসঙ্গে প্রচুর সুগারের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা এক মহিলার। আরামবাগে আবার তৃণমূল কর্মীদের ওপর বিজেপি–‌র হামলা। শুক্রবারের আরেক ঘটনা, ন্যাজটি রাইস মিলের মাঠে বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু হুমকি দিয়েছেন, রাজ্য সরকারের নির্দেশিকা মানব না, বিজেপি রাস্তায় দুর্গাপুজো করবে। হিম্মত থাকলে আমাদের পুজো বন্ধ করুক প্রশাসন।
বাংলার নানা প্রান্তে ইদানীং প্রায় ধর্ম আর হিংসার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে অসহিষ্ণুতার উদ্গীরণ ঘটছে। হুমকি আর হুঙ্কার ছুঁড়ছে ক্ষমতামত্তরা। এ সব ঘটনায় সমাজের আতঙ্ক ক্রমশ বাড়ছে। উদ্বিগ্ন সম্মিলিত বিবেক। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, কবি শঙ্খ ঘোষ, অমর্ত্য সেনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতির বহু দূরদর্শী গত কয়েক বছর জুড়ে ধর্ম আর হিংসার রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে, বহুমুখী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, গঠনহীন রাজনীতির বিভাজনপ্রীতির বিরুদ্ধে লাগাতার বলে যাচ্ছেন, এই পথ ভারতের নয়। বাংলার তো নয়ই। বিভ্রান্তি আমাদের সামাজিকতাকে ঘেরাও করছে। অবিলম্বে ঘৃণাকে প্রতিহত করা জরুরি। স্বাস্থ্যময় মতভেদ আর বহুত্বের সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যার সুরাহা খুঁজতে হবে।
বিশেষ আর নির্বিশেষের ‘‌আমরা–‌ওরা’‌ তাঁদের এ সব সতর্ক উচ্চারণকে, উদ্বেগের কারণকে বিলকুল আমল দিইনি। বরং ‘‌সায়লেন্ট মেজরিটি’‌–‌র চেহারাকে, তাদের উদাসীনতাকে, নিষ্ক্রিয় স্বভাবকে প্রশ্নহীন চিত্তে প্রশ্রয় দিয়েছি। আমাদের নীরব, আমাদেরই প্রতিবাদহীন, প্রতিরোধহীন মানসিকতার জন্য আজ অবরুদ্ধ বিকার‌ বাইরে বেরিয়ে এসে হুমকি ছড়িয়ে পুজো দাবি করছে। এখানে–‌ওখানে মেতে উঠেছে তাণ্ডবনৃত্যে। শুক্রবার কলকাতার শিশির মঞ্চে, পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরপর দুটি সভায় অমর্ত্য সেন তাঁর ঘোষিত, সংযত অথচ তীক্ষ্ণ অবস্থান স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, জাতপাত আর ধর্মের বাছবিচার প্রকট হয়ে উঠছে। এ সব ঠেকাতে হলে অঙ্ক ও ইংরেজি–‌সহ বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি ছাত্রদের মানবাধিকার ও সমানাধিকার শেখানো প্রয়োজন। সামাজিক ন্যায়ের অন্যতম সেরা প্রবক্তাকে কেন আবার সম অধিকারবিদ্যাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলতে হল?‌ নিশ্চয় আমাদের পাঠ্যক্রম আর পাঠাভ্যাসের ফাঁক তাঁর নজরে এসেছে। নিঃসন্দেহে পারিপার্শ্বিকে ধর্ম আর বেহায়া রাজনীতির নৈরাজ্য তাঁকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও দল বা সংগঠনের নাম না করেই বলেছেন, ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ স্লোগান ইদানীং মানুষ–‌প্রহারের মন্ত্র। জোর করে রাম নাম বলানো হচ্ছে। কেউ বলতে না চাইলে তিনি নিগ্রহের শিকার হয়ে উঠছেন। বাংলায় ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ স্লোগানের সাম্প্রতিক আমদানিতে শঙ্কিত অমর্ত্য সেন তাঁর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ইতিহাসকে সামনে এনে জানিয়েছেন, বঙ্গ সংস্কৃতিতে এই ধরনের স্লোগানের কোনও জায়গা ছিল না। রামনবমীরও প্রচলন ছিল না। এ সব স্লোগান বা নবমী পালনের সঙ্গে বাঙালির কোনও যোগ নেই। আজ যখন শুনি বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে ভীত, শঙ্কিত হয়ে রাস্তায় বের হতে হচ্ছে, তখন আমার গর্বের শহরকে চিনতে পারি না। অতএব এ সবের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা দরকার। এক সময় বাংলায় হিন্দু মহাসভা এরকমের সংস্কৃতি নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল বিভেদের বাতাবরণ তৈরি করতে। আবার একই উদ্দেশ্যে ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ সংস্কৃতি আমদানির প্রয়াস চলছে। যা এক বিপজ্জনক প্রবণতা।‌ 
‌অমর্ত্য সেনের দাদু ক্ষিতিমোহন সেনের ‘‌হিন্দু ধর্ম’‌ বইটি ভারতীয় ধর্মচিন্তার অন্যতম আকর গ্রন্থ। ক্ষিতিমোহনের ভাবনায় ভারত আত্মার যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল, তারই প্রতিধ্বনি বেজে উঠল অমর্ত্যের কণ্ঠস্বরে।
সাম্প্রতিক ভারতে সহনশীল ধর্ম আর ভারতীয় সংস্কৃতিকে বিকৃত করার যে ঝোঁক প্রবল হয়ে উঠছে, যেভাবে রামের নামে হিংসার রাজনীতি, দুরাচারকে আমল দেওয়া হচ্ছে, তাতে অমর্ত্য সেনের মতো বহুমাত্রিক সমাজদ্রষ্টার উদ্বেগ ও আশঙ্কা কি অস্বাভাবিক?‌ একপাশের অসভ্যতা, অন্য পাশের স্তিমিত, সঙ্কোচিত অসভ্যতাকে জ্বালানি জোগায়। আজ যাঁরা ‌জয় শ্রীরাম নিয়ে হুজুগ জাগাতে ব্যস্ত, কাল তাঁদের দিকেই বুমেরাং হয়ে ছুটতে পারে রক্তখেকো অস্ত্রের আরেক পিঠ। হাওয়া লেগেছে সন্ত্রাসের আগাছায়। তাদের নির্বীজ আর নির্বিষ করতে ব্যর্থ হলে, ভয়ঙ্কর বিপদ গ্রাস করবে মহাভারতের নির্বিশেষের সত্যকে। স্ফুলিঙ্গ থেকে, বিচ্ছিন্ন অগ্নিকাণ্ড থেকে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে। এক্ষুণি আগুন নেভানোর জবরদস্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। না হলে গ্রাম পুড়বে। শহর পুড়বে। পুড়ে ভস্ম হয়ে যেতে পারে গণতন্ত্রের মন্ত্রায়িত অভিমুখ।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top