প্রায় দু’‌মাস আগে, এই কলমে আমি প্রথম চিৎকার শুরু করি, এই দু্ঃসময়ে শুধু কঁাদলে চলবে না, ‘‌ইতিবাচক’‌ কথা বলতে হবে। শুভবুদ্ধির ওপর আলো ফেলতে হবে। শুভচিন্তার ওপর আলো ফেলতে হবে। বলতে হবে, সবাই শুধু মৃত্যুচিন্তা করছে না। বেঁচে থাকাকে তঁারা অন্যভাবেও দেখছেন। লকডাউনের দুঃখকষ্ট, দুশ্চিন্তা আমাদের সবার। কম বেশি সবাই তার মধ্যে আছি। বারবার সেকথা মনে করিয়ে মানুষের মন আরও ভেঙে দিয়ে কী লাভ?‌ আশার কথা বলতে হবে, আলোর কথা বলতে হবে, মন ভাল করবার কথা বলতে হবে। তবেই তো লড়াইয়ের শক্তি মিলবে। গোড়াতে নিন্দা করলেও এখন অনেকেই আমার সেই পথ অনুসরণ করেছেন। তঁারাও ‘পজিটিভ’‌ ভাবছেন। আমি কৃতজ্ঞ।
তবে শুধু নামকরাদের ইন্টারভিউ, নাচ, গান, আবৃত্তি, লেখা, রান্নার কথা শুনলে হবে না, ‘‌পজিটিভ’ হতে গেলে‌ সাধারণ মানুষের কথাও বলতে হবে। যঁারা প্রচার চান না, নাম, ছবি ছাপতে দেন না, তঁাদের ইতিবাচক মনের কথাও শুনতে হবে। তবেই না সাধারণ মানুষ নিজেকে মেলাতে পারবে। ভাববে ও যদি পারে, আমিও পারব। তাই না?‌
আমি আজ এমন একজন মানুষের কথা বলব, যিনি খুব নামকরা, কিন্তু এই ভয়ঙ্কর সময়ে শুধু নিজের প্রচারের কথা ভাবছেন না। নাম, ছবি ছাপতে দেওয়া তো দূরের কথা, কোথাও ইন্টারভিউ দিয়েছেন বলে আমি জানি না। কোনও ভিডিও ক্লিপিং, ফেসবুকে তঁাকে ধরা গিয়েছে বলে দেখিনি, শুনিনি। না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। নামকরা মানু্ষ, অথচ এগুলোর একটাতেও এখন নেই, সহজ কথা নয়। এই মানুষের কথা না বলে পারা যাবে না।
তিনি সমরেশ মজুমদার।
ক’দিন আগে আমি ফোন করেছিলাম, কোনও ইন্টারভিউয়ের জন্য নয়, একেবারে নিখাদ কুশল জানতে। সেদিন সমরেশদার সঙ্গে কথা বলে এমন অভিজ্ঞতা হল, যা কোনওদিন ভুলব না। নানা কারণে ভুলব না। ভবিষ্যতে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, লকডাউনের সময় আপনার জীবনে এমন কী ঘটেছিল, যা আপনি ভুলতে পারেন ‌না?‌ তিনটে কান্না, তিনটে হাসি আর একটি মুগ্ধতার কথা বলব। এটি সেই মুগ্ধ হওয়ার ঘটনা।
বয়স কত সমরেশ মজুমদারের?‌ উইকিপিডিয়া বলছে, জন্মসাল ১৯৪৪। যতই হোক, দৌড়, কালবেলার লেখকের মন সব সময়েই তরুণ, সব সময়েই ছুটছে। বাইরেটা কিন্তু রাশভারি। গম্ভীর। আগে কথা বলতে ভয় করত। দূর থেকে দেখতাম। সকলের সঙ্গে খুব একটা কথা বলেনও না। দেখেছি, কাউকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে দেন না। আমি আলাপ করতে যেতামও না। কী জানি বাবা, যদি বকুনি দেন! বছর দশ আগে যেতে বাধ্য হলাম। দেখি, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় উনি আমার লেখার কথা উল্লেখ করছেন। সটান এমন প্রশংসা করে বসছেন যে, শত্রু তো বাড়ছেই, যঁারা শত্রু ছিলেন, তঁারা ডবল শত্রু হয়ে যাচ্ছেন। কী সর্বনাশ!‌ এর পরে একদিন দেখা হতে কথাটা অতি ভয়ে ভয়ে বলে ফেললাম। উনি সামান্য হাসলেন মাত্র। তার পর আমাকে পাশে বসিয়ে অন্য কথায় চলে গেলেন।
আলাপের পর দেখলাম সমরেশদা একজন দারুণ মানুষ। কত যে গল্প জানেন!‌ সে সব গল্প তো উনি নানা ধরনের কলমে লিখেওছেন। একবার হেদুয়া পার্কে এক অনুষ্ঠানে আমরা দু’জনেই গিয়েছি। সম্ভবত কোনও পাঠ্যপুস্তক  বিতরণের অনুষ্ঠান ছিল সেটা। খুব ঠান্ডা পড়েছিল। তখনও অনুষ্ঠান শুরু হয়নি। সবার পিছনে দু’জনে বসে চা খাচ্ছি। সমরেশদা আমাকে হুমায়ূন আহমেদের গল্প বলতে শুরু করলেন। দু’জনে খুব বন্ধু ছিলেন। সমরেশদা সেদিন আমাকে বলেছিলেন, এই বাংলার একজন খুব বড় সম্পাদক তঁার কাছে হুমায়ূন আহমেদের ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, পোস্টকার্ডে শুধু নাম লিখে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিলেই হবে। ওঁর বাড়িতে পৌছে যাবে। উনি এতটাই জনপ্রিয়। এত ভাল লেগেছিল!‌ বাংলা ভাষার একজন লেখক এত জনপ্রিয়!‌ সেদিন সমরেশদাকে ছেলেমানুষের মতো মনের দুঃখের কথা বলে ফেলেছিলাম।
‘‌আমার লেখা নিয়ে খুব গালমন্দ হয়।’‌
সমরেশদা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘‌কে করে?‌’‌
আমি বললাম, ‘‌কিছু বড় লেখকও করেন, আবার তথাকথিত কিছু ইনটেলেকচুয়ালও করেন, বলেন, ও তো পাঠকদের মনোরঞ্জনের জন্য লেখে।’‌
সমরেশদা একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘ওরা কি‌ বই কিনে পড়ে বলছেন?‌’‌
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘তা তো ঠি‌ক জানি না। মনে হয় না।’‌
সমরেশদা বললেন, ‘‌যঁারা বই কিনে পড়েন না, তঁারা বই নিয়ে কী বলছেন, তাতে কান দেওয়ার দরকার নেই। কান দেবে না। যঁারা বই কিনে পড়েন, তঁাদের সমালোচনাও মন দিয়ে শুনবে।’‌
এরকমই সরাসরি কথা বলবার মানুষ সমরেশ মজুমদার। নিজের মত বলতে দ্বিধা করেন না। কাউকে তোয়াক্কাও করেন না।
লকডাউনের মধ্যে খানিকটা ভয়ে ভয়ে ফোন করেছিলাম। কী জানি কী বলবেন! নিশ্চয় মনমেজাজ খারাপ। উৎকন্ঠা।‌
কোথায় উৎকন্ঠা!‌ কী সুন্দর করে যে কথা বললেন! সেই কথায় কোনও ব্যক্তিগত দু্শ্চিন্তার প্রকাশ নেই, কিন্তু এই দুঃসময়কে নিজের মতো করে দেখা র‌য়েছে। বললেন, লিখতে বসলেও সব‌সময় লেখা হচ্ছে না। পাতা হিসেব করে লিখব ভাবছি বলেই হয়তো হয়ে উঠছে না। বললেন, করোনার সময় পৃথিবীর চেহারা যেমন বদলে যাচ্ছে, মানুষে মানুষে সম্পর্কও বদলে যাচ্ছে। করোনার আগে যেমন ভাবনা ছিল, এখন কি আর তেমন আছে?‌ একথা বলতে বলতে সমরেশদা একটা গল্প বলতে শুরু করলেন। গল্পটি দুই নারী–‌পুরুষের। তারা লকডাউনের কারণে একসঙ্গে রয়েছেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি। এত বড় একজন সাহিত্যিক এই সময়ে টেলিফোনে গল্প শোনাচ্ছেন, এ তো সহজ কথা নয়!‌
একটা জায়গা পর্যন্ত গল্পটা বলে সমরেশদা থামলেন।
আমি বললাম, ‘‌তার পর?‌’‌
সমরেশদা বললেন, ‘‌এটাই গল্প।’‌
আমি উৎসাহ নিয়ে বললাম, ‘‌আপনি লিখেছেন সমরেশদা?‌’
সমরেশদা বললেন, ‘‌না, তুমি লিখবে। তোমার জন্য বললাম।’‌
কী‌ বলব আমি! যে মানুষের বয়েসের কারণে করোনা চিন্তায় উৎকন্ঠিত হয়ে থাকবার কথা অথবা নিজের প্রচারে অনলাইন–‌অফলাইন নিয়ে ব্যস্ত থাকবার কথা, সে–সব না করে তিনি নিজে তো লিখছেনই, পরের প্রজন্মের এক অতি নগণ্য লেখককে গল্পের প্লট বলছেন!‌ বলছেন কত আন্তরিকতায়!‌ জীবনবোধের গভীর জিজ্ঞাসায় প্রবেশ করে।‌ পরিস্থিতি কি সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে?‌ নাকি পারে না?‌
আমি জানি না এই গল্প আমি লিখতে পারব কিনা। মনে হয় না পারব। সমরেশদার ভাবনা আমার ফুটিয়ে তোলবার ক্ষমতা নেই। তাও হয়তো কোনওদিন চেষ্টা করব। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা এই ভয়ঙ্কর সময়ে এ আমার কাছে এক বিরাট প্রাপ্তি। শুধু গল্পের প্লট পাওয়াটা প্রাপ্তি নয়, এক গভীর সঙ্কটকালে একজন মানুষকে এভাবে চেনাটাও কি প্রাপ্তি নয়?‌
এ তো গেল নামকরা মানুষের কথা। যারা নামকরা নয়, তাদের কথাও তো বলতে হবে। তাই না?‌ তা হলে একটা মন খুশি হওয়ার ঘটনা বলে লেখা শেষ। কিন্তু তার আগে একটা কষ্টের কথা যে বলতেই হবে। তাকে যে এড়াতে পারছি না।
পরিযায়ী শ্রমিকদের যে কষ্টের মধ্যে পড়তে হল, তা ভয়াবহ, মর্মান্তিক। মানব সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হল। পথে হঁাটতে হঁাটতে কেউ মারা যাচ্ছেন, রেল লাইনে ঘুমোতে গিয়ে কেউ মারা যাচ্ছেন, ট্রাক দুর্ঘটনায় কেউ মারা যাচ্ছেন। এর জন্য কে দায়ী?‌ শুধুই কোভিড নাইনটি?‌ না। দায়ী অনেকে। দায়ী আমরাও। দায়ী আমিও। কেউ কেউ এই ভয়ংকর প্রসঙ্গ নিয়ে সিরিয়াস লেখা লিখছেন, আরও লিখবেন। লেখা উচিত। কিন্ত অনেকে আবার মেকি কান্নাও কঁাদছেন। অভুক্ত, ক্লান্ত, অসু্স্থ শ্রমিকরা যখন নিজের শহরে, পাড়ায়, মহল্লায়, গ্রামে ফিরলেন, তঁাদের কেমন ভাবে ‘‌স্বাগত’‌ জানানো হচ্ছে মেকি কাঁদুনেরা কোনও খবর রাখছেন?‌‌ আমি অন্তত তিন জায়গায় ‘‌রে রে’‌ করে লাঠিসোঁটা হাতে তেড়ে যাওয়ার খবর শুনেছি। এমনকী, তঁাদের জন্য কেন লোকালয়ে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার বানানো হয়েছে, তাই নিয়ে বিক্ষোভও হয়েছে। ছি ছি। এরা অ–‌মানুষেরও অধম। ‌যঁারা অতিথি শ্রমিকদের জন্য কেঁদে কেটে চোখ ফুলিয়েছেন, এই সময় তঁারা কী করলেন?‌ একজনেরও দেখা গেল না। মনে হয়, তঁারা ফেসবুকে আরও ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এও আমাদের কলঙ্ক। ‘‌অ–‌মানুষ’‌দের চেনা যায়, ‘‌মিথ্যে–‌মানুষ’‌দের চেনা যায় না।  
যাক, খুশির কথা দিয়ে শেষ করি। ফুটফুটে এক মেয়ের গল্প শুনুন।
এই মেয়ের ভাল নাম শিঞ্জিনী চৌধুরী। বয়স তিন বছরের একটু বেশি। থাকে বালুরঘাট শহরে। বাবা শুভ্রদীপ চৌধুরী, মা মিতা চৌধুরী। শুভ্রদীপ প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। লকডাউনের মাঝেও গ্রামের স্কুলে গিয়ে ছেলেমেয়েদের চাল, ডাল, আলু দিয়ে আসে। ডিউটি। শুধু শুভ্রদীপ নয়, যঁারাই এই ডিউটি করেন, তঁারা আমার কাছে করোনা যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনার। কুর্নিশ জানাই। শুভ্রদীপ অঁাকে, গল্প, উপন্যাসও লেখে। ফেসবুকে ঢাক পেটায় না বলে প্রচার নেই। হাসিমুখের এই ছেলের তাতে কিছু আসে যায় না। ফেসবুক ছাড়াই একদিন অনেক বড় হবে। লকডাউনে বাড়িতে দিনের পর দিন আটকে থাকা ছোটো মেয়ের মন ভালো রাখবার জন্য ভারি চমৎকার একটা কাজ করেছে শুভ্রদীপ। এক ফালি বারান্দায় মেয়ের অঁাকা ছবির প্রদর্শনী করেছে। নাম দিয়েছে ‘‌শিঞ্জিনীর একক প্রদর্শনী’‌। ছোট্টো ‌শিঞ্জিনী বেজায় খুশি। প্রদর্শনীর দর্শক শুধু সে আর তার বাবা–‌মা। তাতে কী? নিজের প্রদর্শনী তো‌।
শুভ্রদীপ চাইছে, সব বাড়িতে এমন হোক। আটকে থাকা ছোটোদের মন ভাল করা হোক। আমিও চাই। আপনি?‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top