তন্ময় চক্রবর্তী: আলিপুর বোমার মামলা চলছে। এজলাসে উপচে পড়েছে ভিড়। লোহার গরাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে আসামি। উল্লাসকর দত্ত। জজ সাহেব সবে বিচার শুরু করবেন, এমন সময় হঠাৎ বন্দি বিপ্লবী চিৎকার করে গেয়ে উঠলেন, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’। তখনও গীতবিতান আসেনি। কিন্তু গানগুলি প্রস্তুত হচ্ছিল। প্রকাশের আগে তেরোটি গীতি সঙ্কলনে ছড়িয়েছিল। 
১৩৩৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে প্রথম প্রকাশিত হয় গীতবিতান। পরে কবি নিজেই তাঁর গানগুলিকে পূজা–‌প্রেম–‌প্রকৃতি–‌স্বদেশ–‌বিচিত্র–‌আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে বিন্যস্ত করেন। কবির মৃত্যুর পর মাঘ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে বিষয় অনুক্রমে প্রকাশিত হয় গীতবিতান। অবশেষে আশ্বিন ১৩৫৭ বঙ্গাব্দে যাবতীয় গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য ও অসঙ্কলিত গান নিয়ে প্রকাশিত হয় তিন খণ্ডে সম্পূর্ণ রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্কলন গীতবিতান।
শীত জাঁকিয়ে বসেছে শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায়। পশ্চিমি সাজে সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল একটি সদ্য পরিচিত মেয়ে। মেলায় ঘুরতে এসেছে। মনে হল নতুন প্রজন্ম। হুজুগে এসেছে মেলায়। এ মনে হয় গীতবিতান পড়েনি। তাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম, গীতবিতানের নাম শুনেছেন? সুন্দর মুখের মেয়েটি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। বলল, অশিক্ষিত নাকি। ও মা, গীতবিতানের নাম শুনব না। বেগতিক দেখে আমিও মুচকি হেসে হাওয়া ।
আমার স্কুলের এক বন্ধু সিনেমা বানায়। একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ ওর বাড়িতে গেছি। দেখি ওর হাতে গীতবিতান। সাধারণত সেই বন্ধু হার্ডকোর কমার্শিয়াল ফিল্ম বানায়। ওর হাতে গীতবিতান দেখে আশ্চর্য হলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আমাকে অবাক করে বলল, ভাবছি একটা ছবি বানাব। নাম দেব গীতবিতান। আমি থমকালাম। বন্ধু বলে চলেছে। প্রথম সিন নিউ থিয়েটার্স প্রাইভেট লিমিটেড প্রযোজিত ‘মুক্তি’ সিনেমার রিলিজ। হলের বাইরে প্রমথেশ বড়ুয়া কথা বলছেন ছবির সঙ্গীত পরিচালক পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’। আমি তো হাঁ। গীতবিতান নিয়ে সিনেমা? আমি উত্তেজনায় প্রশ্ন করি। পাতা উল্টিয়ে বন্ধু বলল, আসলে কী জানিস, এই বইয়ের প্রতিটা গানই এক–‌একটা দৃশ্যকল্প। এক–‌একটা লাইন নতুন এক একটা ভাবনার আশ্চর্য জগৎ। যতবার পড়বি, নতুন নতুন মানে দাঁড়াবে। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন। হলের বাইরে পোস্টার। লাইট সাউন্ড অ্যাকশন। ছবির নাম। গীতবিতান।
রাত্রে ঘরে ফিরে মনে হল, গীতবিতান যদি না থাকত, কী কাণ্ডই হত বলুন তো। গীতবিতান তো আসলে যোগাযোগ। আমাদের মনে, মনের বাইরে যা যা কিছু ঘটছে সব যেন লেখা আছে ওই বইতে। অন্তত এক শ্রেণির বাঙালি তাই মনে করে নয়, বিশ্বাস করে। বৃষ্টি পড়লে গীতবিতান। কাঠফাটা রোদে গীতবিতান। প্রেমে পড়ার আগে, প্রেমে পড়লে, এমনকী প্রেম ভাঙলেও গীতবিতান। শীতের আদরে হেমন্তের চাদরে বসন্তের সুখে...‌ সঙ্গী গীতবিতান। লাইন খুঁজতে হবে আর জায়গামতো প্রয়োগ। আলো জ্বলে উঠবেই...
আর একটা ঘটনা বলি। আমার এক বন্ধু মাস্টারমশাই। একদিন ভরসন্ধ্যেবেলা। লক্ষ্য করলাম, সে দ্রুতগতিতে গীতবিতান খুলে কী সব নোট নিচ্ছে। আমি ব্যাগ্র হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার বল তো? বন্ধু জানাল, আজ রাতে ওর একটা বক্তৃতা আছে। সাধারণত এই বন্ধুকে আমরা দিনরাত কাফকা–‌কামু–‌দেরিদা আওড়াতে দেখেছি। আজ হঠাৎ গীতবিতান খুলতে দেখে প্রশ্নটা করেই ফেললাম। একটুও না ভেবে মুচকি হেসে বন্ধু উত্তর দিল, আসলে কী জানিস, জীবনের সব কথা এত সহজভাবে আর কোথাও বলা নেই। কাফকা–‌কামু–‌দেরিদার আসনও শ্রদ্ধার। আর রবিঠাকুরের গীতবিতান প্রাণের। সদাসর্বদা ইন্টেলেকচুয়াল কোটেশন আওড়ানো বন্ধুকে গীতবিতান হাতড়াতে দেখে খুশি হলাম।
এবার একটা মজার প্রসঙ্গ বলি। একবার এক আলোচনা সভায় আমি সঞ্চালক। আলোচনার বিষয়বস্তু রবীন্দ্রনাথ। হঠাৎ একটি প্রশ্নে সংশয় উঠে এল। প্রশ্নটি সাধারণ। রবি ঠাকুর মোট কটি গান লিখেছেন। সভায় উপস্থিত বক্তারা প্রত্যেকেই বিদগ্ধ। কেউ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গীতবিতান–‌এর কালানুক্রমিক সূচির সংখ্যার কথা বলছেন, কেউ বলছেন বিশ্বভারতী প্রকাশিত স্বরবিতানের সংখ্যা। কেউ বলছেন সুভাষ চৌধুরির লেখা ‘গীতবিতানের জগতে’র উল্লেখিত গানের সংখ্যা। হিসেব যখন মিলছে না, তখন সভার মাঝে কে যেন বলে উঠল, একটা গীতবিতান এনে গুনে নিলেই তো হয়। মুহূর্তে হাসির রোল সভায়। গীতবিতান শব্দটাই যেন মিটিয়ে দিল বিবাদ ।
 কবির বয়স তখন এগারো। গান লিখেছিলেন, গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে’। অনেকেই মনে করেন গুরু নানকের ‘গগন মে থাল রবি চন্দ্র দীপক বনে’ এই ভজনটির প্রথম স্তবকের প্রায় আক্ষরিক অনুবাদ এটি। কবি তাঁর জীবনের শেষ গান লিখেছিলেন ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার’। এই নিয়ে গীতবিতান। আমাদের অসময়ের সঙ্গী, দুঃসময়ের আলো, বিপদের আশ্রয়। মন খারাপ হলে হাতে তুলে নিলেই হল। এতে যেন লুকিয়ে আছে সব সমস্যার সমাধান সূত্র, সব দুঃখের কারণ ও তার প্রতিকার। এমনটাই বলেছিলেন শান্তিনিকেতনের এক মাস্টারমশাই 
  একবার রবীন্দ্রভবনে বক্তা হিসেবে আমি এক আমন্ত্রিত সৌভাগ্যবান। বলার বিষয় ছিল ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’। কথার শেষে মনে হল, যা বলেছি সব লেখা আছে গীতবিতানে। প্রবন্ধে–‌প্রেমে, গল্পে–‌কবিতায়, নাটক–‌সিনেমায় গীতবিতান কেমন যেন ঢুকে পড়ে। তাকে ছাড়া অনেক বাঙালির চলে না।
বেশ কিছুদিন আগে পঁচিশে বৈশাখের এক গানের অনুষ্ঠান। হঠাৎ দুই গায়িকার ঝগড়া।  বিষয় একটি গানের লাইন। দুজনের হাতেই গীতবিতান। একজনের হাতে বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগের গৈরিক মলাট, অন্যজনের হাতে কবির মুখ আঁকা কলেজ স্ট্রিটের চলতি বই। কথা কাটাকাটি শুরু হতেই নাক গলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। ধরুন গীতবিতান নেই, কী হত। মনে হল দুজনেরই রাগ উড়ে এল আমার দিকে। একজন বিশ্বভারতীর সঙ্গীত বিভাগের ছাত্রী, অন্যজন রবীন্দ্রভারতীর। দুজনে এক হয়ে ‘‌কোন ক্ষেপা শ্রাবণ ছুটে এল’‌, আমিও পালিয়ে বাঁচলুম।
আমার পাড়ার এক দাদার তিনতলা বাড়ি। প্রতি তলায় একটি করে গীতবিতান। জিজ্ঞেস করতে বললেন, হঠাৎ কখন কাজে লাগে। এমনকী রান্নাঘরের পাশেও একটি। হাতা–‌খুন্তির ফাঁকেও তো আমাদের গাইতে ইচ্ছে করতেই পারে। দাদা মনে করেন বিশ্বভারতীর গীতবিতান ছাড়া বাকিগুলো গীতবিতানই নয়। প্রতি বছর পৌষে কাউন্টারে লাইন দিয়ে দু–‌চার কপি কেনেন। প্রিয় বন্ধুদের উপহার দেন গীতবিতান।
আমরা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স পড়ি। রি–‌ইউনিয়ন হচ্ছে। হঠাৎ দেখি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গোমড়ামুখো এক স্যার হলে ঢুকছেন। এদিক–‌ওদিক তাকিয়ে চশমা খুললেন। হাতে একটি বই। পু্রনো মলাট। খুলে দু–‌কলি গাইলেন। ভেঙে গেল ভয়। জ্বলে উঠল আনন্দের আলো। এই হল গীতবিতান। এ না থাকলে বাঙালির চলে না কি?‌
মঞ্চে একসঙ্গে গাইছে দুটি মেয়ে। একজন দক্ষিণী অন্যজন গীতবিতান। গান শেষ হতেই ফোঁড়ন কাটলাম। গীতবিতান যদি না থাকত, কী দশা হত বল তো তোমাদের। চোখে রাগ মেখে দুজনেই বলল, তাদের ঠাকুর রবিঠাকুর, আর ধর্মগ্রন্থ মানেই গীতবিতান।
আমার এক বন্ধুর ডিভোর্স হয়। সুন্দরী বউ ছেড়ে সে যখন চলে যাচ্ছে, তখন সে শুধু গীতবিতানখানা হাতে নিয়ে গেছিল। আমি বললাম, রেখে যা না, একটা নতুন বই কিনে নিলেই তো হয়। পরিষ্কার দেখলাম তাঁর চোখে জল। বললেন এই বইটা আমার। একে ফেলে যাই কী করে।
ভাবুন তো একবার সেই সময়ের কথা, যখন গীতবিতান ছিল না। অবস্থাটা কী দাঁড়াত। খুব কষ্ট হচ্ছে তাই তো। আমারও হচ্ছে বন্ধু। গীতবিতান নেই, তা আবার হয় নাকি। যত্তসব অলুক্ষুণে কথা। 
আজ এই ভয়ঙ্কর সময়ে মনে হছে ভাগ্যিস গীতবিতান ছিল। বেঁচে থাকলে কবির বয়স হত ১৫৯। জন্মদিন। বাইরে বন্ধ। শুনশান রাস্তাঘাট। তাতে কী। ঘরে ঘরে গান। তার আবেশ ছড়িয়ে দেবে ভোরবেলায়। এই দুঃসময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রবীন্দ্রনাথ বারবার তাঁর গান নিয়ে ফিরে আসছেন। বেঁচে থাকার আনন্দ দিচ্ছেন, ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছেন আর যুগিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বাস। বেঁচে থাকার মন্ত্র।‌

জনপ্রিয়

Back To Top