স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী: এই মুহূর্তে কোভিড সংক্রমণ থেকে সারা বিশ্ব সম্পূর্ণ পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে। এখনও উপায় পাওয়া যায়নি, যা নিশ্চিত করে ফিরিয়ে দিতে পারে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশ্বের সেরা গবেষণাগারগুলিতে তুমুল ব্যস্ততা করোনার জীবনচক্রকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য। তাৎক্ষণিক কিছু পথ্য বাজারে জনপ্রিয়তা পেলেও বিজ্ঞানসম্মত কোনও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণালব্ধ ফল এখনও অধরা। তবে করোনায় একবার আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থতার লড়াইয়ের যে পদ্ধতিগত দিক, তা আমরা এতদিনে মোটামুটি আওতায় এনে ফেলছি, রোজকার জীবন সংগ্ৰামে। বহু আলোচনা বিতর্কের মধ্যে দিয়ে জনগণমন এখন অপেক্ষায় শুধু জীবনদায়ী ভ‍্যাকসিনের।
কিন্তু কিছু ভাইরাসের সংক্রমণ, যেমন হাম, গুটি বসন্ত, ভ‍্যাকসিন নেওয়ার পর আর ফিরে না এলেও, ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরনের ভাইরাস বারবার ফিরে আসে। যত দিন যাচ্ছে সার্স–কোভ ২ (‌কোভিড–১৯) ভাইরাস সম্বন্ধে এক এক রকম নতুন নতুন তথ্য বিজ্ঞানীরা খুঁজে পাচ্ছেন। প্রাথমিক স্তরে সবাই আশ্বস্ত হচ্ছিল এটা ভেবে যে, একবার নোভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে আর দ্বিতীয়বার সংক্রমণের আশঙ্কা থাকবে না। কিন্তু তাতে বেশিদিন নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না। ব্রিটেনের এক গবেষণায় জানা গেছে, কোভিড–‌১৯ আক্রান্ত হওয়ার পর যে–‌সব রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন তাঁদের শরীরে ইমিউনিটি গড়ে তোলার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে ঠিকই তবে তা শুধু কয়েক মাসের জন্যই স্থায়ী হচ্ছে। অর্থাৎ ওই ব্যক্তি নতুন করে আক্রান্ত হতে পারেন।
লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষকরা ৯০ জনের বেশি রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর গবেষণা করে, তঁাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। ডা.‌ কেটি ডোরসের নেতৃত্বে হওয়া এই গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার লক্ষণগুলি প্রকাশের তিন সপ্তাহ পরে চূড়ান্ত সময়ে এমন কিছু অ্যান্টিবডির খোঁজ পাওয়া গেছে যা ভাইরাসটিকে ধ্বংস করছে। আশ্চর্যজনকভাবে এরপর থেকেই অ্যান্টিবডির কাজ কমতে শুরু করছে। ডা.‌ ডোরসের বক্তব্য, অ্যান্টিবডি কত সময় সক্রিয় থাকবে, এটা নির্ভর করছে সংক্রমণের তীব্রতা এবং আক্রান্তের শারীরিক সক্ষমতার ওপর। পুনের ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি–র গবেষণায় একই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দেখা গেছে, সাধারণ সর্দি–কাশি বা অন্য ধরনের ফ্লু–‌এর মতোই ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লোকে সংক্রমিত হতে পারে।
ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতে স্বাভাবিকভাবে সময় লাগে এক থেকে দুই সপ্তাহ। আবার কোনও ভাইরাসের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ইনেট ইমিউনিটি, তা ভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই বাধা দেয়। বিভিন্ন ধরনের নিউট্রোফিল, ম্যাক্রোফেজ, ডেনড্রাইটিক জাতীয় প্রতিরোধক কোষের দ্বারা ভাইরাসের উপসর্গগুলো আমাদের দেহের মধ্যে প্রশমিত হয়। এর ঠিক পরবর্তী পর্যায়ে হল অভিযোজিত প্রতিক্রিয়া বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যাডাপ্টিভ ইমিউনিটি, যেটি কিছুটা অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষমতা ও ভাইরাসের সঙ্গে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় ভাইরাসটিকে প্রতিহত করে। এটাই হল নির্দিষ্ট ইমিউনোগ্লোবিউলিন, যা আমাদের শরীরে কোভিডের প্রবেশ মাত্রই তৈরি হয় যা হল ভাইরাসকে রুখতে আমাদের প্রধান অস্ত্র। এরপর আমাদের কোষের মধ্যে তৈরি হয় ‘‌টি সেল’‌, সেটিও বিভিন্ন ভাবে ভাইরাসকে প্রতিহত করে। এই দুইয়ের মেলবন্ধনই নির্দিষ্ট করে দেয় কিছুটা দ্বিতীয় বারের এই একই কোভিড ভাইরাসের সংক্রমণের হাত থেকে বেঁচে ওঠার প্রণালী। এছাড়াও থাকে জিনতত্ত্বের জটিল অঙ্ক ও তথ্য।
কোভিড পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ বা নেগেটিভ যাই আসুক না কেন, দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেন্টার অফ ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে, সারা বিশ্বে বিভিন্ন জায়গায়ই দ্বিতীয় বার কোভিড সংক্রমণ ঘটছে। অনেকেই  আবার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠবার নির্দিষ্ট সময়সীমা না মেনেই মৃদু উপসর্গ নিয়ে রুটি–রুজির খাতিরে বাইরে বেরোচ্ছেন। মৃদু সংক্রমণ কড়া সংক্রমণে পরিণত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কিন্তু এটা দ্বিতীয়বার সংক্রমণ বললে ভুল হবে। এটি হল প্রথমবারের সংক্রমণই আরও প্রকটভাবে জানান দেওয়া। যঁারা কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠছেন, তঁারা দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবেন কি না, তা নির্ভর করছে তঁাদের রক্তে অ্যান্টিবডির মাত্রার ওপর। যদি মাত্রা খুব কম থাকে, তা হলে দ্বিতীয়বার সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
তবে এই অতিমারীর সময় এটাই যে আমাদের ‘‌ইমিউনিটি পাসপোর্ট’‌ হিসাবে কাজে আসবে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। হু বারবার এবিষয়ে সাবধান করেছে। দ্বিতীয় বার সংক্রমণ হওয়াটা হার্ড ইমিউনিটি, বা যূথবদ্ধ রোগ প্রতিরোধের সম্ভাবনাকে অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের সামনে ফেলে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা এপিডেমোলজি গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিতে বলছেন।
যঁারা রোগমুক্ত হচ্ছেন, তঁারা অনেক দিনই আমাদের দেশে রেকর্ড সংখ্যক। তঁাদের মধ্যে থেকে নমুনা সংগ্রহ করে, পরীক্ষা করে একটি প্রাথমিক তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করার জন্য একটি দল তৈরি করা দরকার এখন। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া করোনার আবহে সর্বত্র সম্ভব না হলেও একটু স্থিতিশীল জায়গায় একই পরিকাঠামো ব্যবহার করে জোনভিত্তিক তথ্য ভাণ্ডারগুলি কোভিড গবেষণায় উল্লেখযোগ্য কাজ হয়ে থাকবে। কোভিড ভাইরাসটির প্যাথলজি সম্পর্কে এখনও অনেক কিছুই অজানা। অনেক গবেষণা প্রয়োজন একটি কার্যকর এবং নিরাপদ ভ্যাকসিন তৈরির জন্য। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, হোস্ট শনাক্তকরণ, অনাক্রম্যতা ও ড্রাগ এবং ভ্যাকসিন স্ক্রিনিং–‌এর সংযোগসাধনের জন্য বড় এবং ছোট প্রাণী মডেলে আরও বেশি গবেষণা চালু করা। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রতিটি ধাপের গবেষণালব্ধ ফলাফল এই অতিমারীর বিরুদ্ধে আমাদের আরও প্রস্তুত করবে আগামী দিনে। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top