তাপসকুমার দাস: পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ জেলা পুরুলিয়া। ভাষা আন্দোলন থেকে যে জেলার জন্ম। আজ অনেকেই বিস্মৃত হয়েছেন 
বাংলা ভাষার পক্ষে সেই ব্যাপক গণ আন্দোলনের ইতিহাস।
দ্বিতীয় শাহ আলম নামে পরিচিত আলি গওহর এবং দ্বিতীয় আলমগিরের পুত্র ছিলেন ১৮তম মুঘল সম্রাট। বক্সার যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর এই শাহ আলম ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে ১৬ আগস্ট, ১৭৬৫ এলাহাবাদ সন্ধি চুক্তিতে সই করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিকে বাংলার দেওয়ানির অধিকার দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ ব্রিটিশ কোম্পানি জঙ্গলমহলে খাজনা আদায় শুরু করে। ১৭৬৭ সালে বরাভূম, মানবাজার, বলরামপুর ও কুইলাপালে শুরু হয় চুয়ার বিদ্রোহ, যা ১৮৩২ পর্যন্ত চলে। খাজনা না দেওয়ার জন্য ১৭৯৮–৯৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পঞ্চকোট রাজ্য নিলাম করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পঞ্চকোটের প্রজারা তাদের রাজা ছাড়া অন্য কাউকে খাজনা দিতে অস্বীকার করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ফলে, নিলাম স্থগিত হয়ে যায়।
সিপাহি বিদ্রোহ (‌১৮৫৭)‌ শুরুর আগেই ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ। পরবর্তীকালে মানভূম জেলাকে ভাগ করে দেওয়ায় জেলাটি আয়তনে ছোট হয়ে যায়। 
১৯০৫–এ হয় বঙ্গভঙ্গ। ১৯১২ সালে বিহার, ওডিশা রাজ্য দুটি গঠিত হয়। বিহার–ওডিশার অন্তর্ভুক্ত হয় মানভূম। এই সংযুক্তির বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রতিবাদ আন্দোলন। মানভূম জেলা মূলত বাঙালি অধ্যুষিত হওয়ার কারণে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার সঙ্গে ওই জেলার সংযুক্তির দাবিতে তুমুল ঝড় ওঠে। এ সময় দেশজুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের ফলে ভাষা আন্দোলন কিছুটা প্রশমিত হয়ে পড়ে। ১৯২১ সালে মানভূমে কংগ্রেস দলের প্রতিষ্ঠা হয় যেখানে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন যথাক্রমে নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্ত এবং অতুলচন্দ্র ঘোষ। ১৯৩৫ সালে নিবারণবাবুর মৃত্যুর পর সভাপতি হন অতুলচন্দ্র। নতুন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলে মানভূমকে বিহারের অংশ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই কারণে ১৯৪৮ সালে সমস্ত বাঙালি অফিসারকে মানভূম থেকে বিহারের বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়। প্রাথমিক স্তর থেকে সকল ছাত্রছাত্রীকে হিন্দি শেখানোর নির্দেশ জারি হয়। জেলা স্কুলে বাংলা বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সব স্কুল ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হিন্দি সাইনবোর্ড বাধ্যতামূলক করা হয়। মানভূমে বসবাসকারী সমস্ত বাঙালিকে বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণপত্র দেখাতে বলা হয়। হিন্দিকে মানভূম জেলায় রাজভাষা ঘোষণা করা হয়। কংগ্রেসের শিক্ষানীতি এবং ভাষা–নীতিকে মানভূম জেলায় অবজ্ঞা করা হয়। মানভূম জেলায় বাংলাকেও ‘‌রাজভাষা’‌ হিসাবে মান্যতা দেওয়ার প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে খারিজ হয়ে যায় ১৯৪৮ সালে। এই কারণে মানভূম জেলার কংগ্রেস সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক আরও ৩৫ জনকে নিয়ে দল থেকে পদত্যাগ করেন।
পাকবিড়রা গ্রামে বাঙালিদের ওপর জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই গড়তে ১৪ জুন, ১৯৪৮ লোকসেবক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা হয়। ভারতে সেই প্রথম ভাষা আন্দোলন। মানভূমের বাঙালিদের বাংলা মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও এর প্রয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আদেশ দেয় বিহার সরকার। বাঙালিদের ভাষা আন্দোলনের দাবিকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে চায়। ফলস্বরূপ সমগ্র মানভূম জেলায় আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। লোকসেবক সঙ্ঘ বিভিন্ন রকমের আন্দোলন শুরু করে, যেমন, সত্যাগ্রহ আন্দোলন, হালজোল আন্দোলন, টুসু সত্যাগ্রহ আন্দোলন ইত্যাদি। গানের মাধ্যমেও আন্দোলন চলে— ‘‌শুন বিহারি ভাই/‌তোরা রাখতে লারবি, ডান্ডা দেখাই।’‌ হাজার হাজার মানভূমের বাংলাভাষী কারাগারে যান। বার অ্যাসোসিয়েশন, কমিউনিস্ট পার্টি, পুরুলিয়া পুরসভাও ঐক্যবদ্ধভাবে মানভূমকে বাংলার সঙ্গে সংযোজিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়। এই কারণে ২৩ ডিসেম্বর ১৯৫৩ কেন্দ্র সরকার ‘‌State Re-organisation commission’‌ ‌গঠন করে। ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ কমিশনের শুনানি হয় এবং ১০ অক্টোবর ১৯৫৫ কমিশন রিপোর্ট পেশ করে। বিহারের মানভূমকে ‘‌পুরুলিয়া’‌ নামে একটি নতুন জেলা গঠনের সুপারিশ করা হয়। 
মানভূমের ১৯টি থানা নিয়ে জন্ম নেয় পুরুলিয়া। বিহার তাদের অংশ হিসাবে ধানবাদ মহকুমার ১০টি থানা এবং পুরুলিয়া মহকুমার ২টি থানা পায়। পরবর্তীকালে জামশেদপুরের টিসকোর অনুরোধে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় পটমদা, ইছাগড় এবং চান্ডিল থানা তিনটি বিহারকে দিতে সম্মত হন। যদিও এই সিদ্ধান্তের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ১৭–২০ জুন, ১৯৫৬ বিহারের সমর্থকরা মানভূমে হরতালের ডাক দেয়। বাংলা সমর্থকরাও ধানবাদ বিহারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় খুশি হয়নি। এই সময় বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী কৃষ্ণ সিং এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় বিহার ও বাংলার সংযুক্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে লোকসেবক সঙ্ঘ জোরদার প্রতিবাদ আন্দোলন 
শুরু করে। ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল তাদের ১০০৫ সমর্থক পাকবিড়রা গ্রাম থেকে কলকাতা পদযাত্রা করেন। ৭ মে সেই মিছিল কলকাতা পৌঁছনোর পর সবাই গ্রেপ্তার হন। এর পরই ‘‌Unification of West Bengal with Bihar ‌প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করা হয় এবং ‘‌The Bengal with Bihar Border Demarcation Bill’‌ ‌পাশ হয়। শেষ পর্যন্ত ১৬টি থানা নিয়ে নতুন পুরুলিয়া জেলার জন্ম হয় এবং ১ নভেম্বর, ১৯৫৬ সালে এই নতুন জেলাকে পশ্চিমবঙ্গের অংশ বলে মেনে নেওয়া হয়।

জনপ্রিয়

Back To Top