রোশেনারা খান: ‌‘লকডাউনের জেরে রমজান এবার হাজারো মুসিবতকে সামনে এনে দিয়েছে। এ তো দেখছি সারাবছরই রোজা রাখতে হবে!’
‘তা যা বলেছ মুর্শিদভাই। ঘরে দানাপানি নেই। একশো দিনের কাজ, তা–‌ও রোজ মিলছে না। সাতদিন কাজ দেওয়ার কথা চারদিন পরেই বাদ দিয়ে নতুন লোককে কাজে লিচ্চে। কাকে বলব?’
কথ কটা বলে সাজিদ থামতেই, —আমার দুঃখের কথা শুনবি? বউয়ের কানের মাকড়ি বন্ধক দিয়ে কটা ফল আর সবজি কিনে ঘরের সামনে বসেছিলুম, পুলিশ এসে লাঠি মেরে ছেঁচে ছড়িয়ে দিল। জানিনি কী হবে। কথা শেষ করেই মুর্শিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
এই অবস্থা এখন সমস্ত খেটেখাওয়া মানুষের। এদের অভিযোগেরও শেষ নেই। রেশনে পরিমাণে কম মাল দেওয়া হচ্ছে, ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে, কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে। মহিলা শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে যে–‌টাকা ঢুকছে, তা–‌ও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এ কথা প্রকাশ করা চলবে নে। এর কোনও প্রমাণও নেই।
শেষপর্যন্ত ভিনরাজ্যে আটকে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকরা বহুদিন পরে ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের একটা শর্ত ছিল। সরকার ট্রেন দেবে, শ্রমিকদের থেকে ভাড়া আদায় করে কেন্দ্রের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য সরকারকে নিতে হবে। এখন নেতার পরিবর্তে অভিনেতারা এদের বাড়ি ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
এখানে একটা খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠে আসছে। শ্রমিকদের যখন বাড়ি ফেরার জন্য সমস্ত রকম রাহাখরচ দিতে হবে, তখন আগেই কেন ওদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করা হল না? তখন ওদের হাতে টাকাও ছিল, এবং ওদের তা হলে এত কষ্ট পেতেও হত না। মানুষ এভাবে পথের মধ্যে প্রাণ হারাত না। শ্রমিকরা টিকিট করেই ট্রেনে চড়েছে। তবে এটা তারা বুঝে গেছে, সরকার ধনীদের জন্য, তাদের সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে, ঋণ মকুব করছে। অথচ তাদের থেকে শুধু টিকিটের দাম নয়, জল ও খাবারের দামও নিচ্ছে।
এতদিন একটাই চিন্তা ছিল, কী করে ঘরে ফিরবে? স্টেশন থেকে ছাড়া পেয়ে যে যার বাড়ির পথ ধরতেই আসলাম, ফকিরা, ইউসুফদের অন্য চিন্তা পেয়ে বসল। এবার কী করবে? সামনে ইদ, রমজান চলছে। শূন্য হাতে মায়ের সামনে, বউ–ছেলেমেয়ের সামনে কী করে দাঁড়াবে!‌ এই একই চিন্তা নিমাই, মদনাদেরও। কাজ তো চাই। খেত–খামারের কাজ তো তারা ভুলেই গেছে। এতগুলো বছর কারখানায় বসে কাজ করেছে, এখন কি রোদ–পানিতে মাথায় বোঝা বইতে পারবে?‌ করোনা আর তাদের ভিনরাজ্যে ফিরতে দেবে বলে মনে হয় না। এই মুহূর্তে ওরা কাজে ফেরার কথা ভাবছেও না। মরলে সবাই একসঙ্গে এখানেই মরবে। সমস্যাটা শুধু পরিযায়ী শ্রমিক ও তাদের পরিবারেরই নয়। যঁারা বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানিতে, শপিং মলে, ছোট–‌বড় কারখানায় বিভিন্ন পদে কাজ করতেন, কাজ হারিয়ে তঁারা আরও বেশি সমস্যায় পড়েছেন। প্রাইভেট কোম্পানির পদস্থ কর্মচারীরা সঞ্চয় তেমন না থাক, তবুও ভদ্রস্থ জীবনযাপন করতেন। কিন্তু অনেকেই লকডাউনের প্রথম মাসের পর আর মাইনে পাচ্ছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিত যুবক মুম্বইয়ে একটি মোটামুটি নামী কোম্পানিতে কাজ করতেন। কাজের সঙ্গে মাইনেও বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়ি করে টাকা প্রায় শেষ। কী খাবে? কী করেই বা হাউস বিল্ডিং লোনের কিস্তি দেবে? তখন তো জানত না এরকম কিছু ঘটতে পারে।
এই সমস্যা বহু জনের। বিগ বাজারের এক কর্মী সোশ্যাল মিডিয়াতে সরাসরি জানিয়েছেন, এ মাসে তারা কেউই এখন পর্যন্ত মাইনে পাননি। তাঁর বাচ্চার দুধ কিনবে কী করে? নিজেদেরই বা চলবে কিসে? এইরকমই সমস্যায় পড়েছেন গৃহশিক্ষক, অটো ও টোটোচালকেরা, গাড়ির চালকেরা, বিশেষ করে যাদের স্থায়ী কাজ ছিল না। এ ছাড়াও কুলি, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, ধোপা, নাপিতের মতো দিন আনা–খাওয়া মানুষেরা। সরকার রেশনে খাদ্যসামগ্রী দিচ্ছে, কিন্তু তাতে তো অন্যান্য প্রয়োজন মিটবে না। বেসরকারি বহু সংস্থা বা কেউ এককভাবে দুর্দশাগ্রস্তদের সাহায্য করলেও সেখানেও দেখা যাচ্ছে ‘খাজনার থেকে বাজনা বেশি’। সেইসব মুহূর্তের ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করে কেউ কেউ মহানুভবতার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, একবারও সেই অসহায় পরিবারটির আত্মসম্মানের কথা ভাবা হচ্ছে না। চাল ডালে সংসারের সব সমস্যা মেটে না। এই জন্যই পলিটেকনিকের প্রথম বর্ষের জনৈক ছাত্রী সরকারের ১০০ দিনের কাজের জব–কার্ড চেয়েছে। কতটা অসহায় হয়ে মেয়েটি একাজের সিদ্ধান্ত নিয়েছে!‌
এই মুহূর্তে কাজেরও খুব অভাব। সেল্ফ হেলফ গ্রুপের সদস্যা মিনতি চালক, জবা মাঝি আচার, মশলা, বড়ি ইত্যাদি বানিয়ে বিক্রি করত। আজ দু’মাস সব বন্ধ, বিক্রিবাটা নেই। আসল টাকা ভাঙা হয়ে গেছে। এখন তাদের মাথায় হাত, লকডাউন উঠলে কী করে আবার ব্যবসা শুরু করবে? গ্রুপের সবারই একই অবস্থা। গ্রামের গয়লাদের অবস্থা আরও সঙ্গীন। শহরে যে সব মিষ্টি ও খাবারের দোকানে, রেস্টুরেন্টে দুধ, ছানা সাপ্লাই দিত, সে সব প্রায় সবই বন্ধ। তাছাড়া শহরে যাওয়ারও তো উপায় নেই।
লকডাউন উঠে গেলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, গ্রামের এই সমস্ত মানুষ সেই আশার আলোও দেখছে না।
গ্রামীণ অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হল কৃষি। সেটাই লকডাউনের কারণে ধসে যেতে বসেছে। এই সময়ের শাক–সবজি, ফল–মূল নিয়ে আতান্তরে পড়েছে। পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ থাকার কারণে এই সমস্ত ফসল শহরে পাঠাতে পাচ্ছে না। গাছের সবজি গাছেই থেকে যাচ্ছে। যেখানে একজন কৃষক গতবছর এক লাখ টাকার পটল বিক্রি করেছে, এবারে তার চাষের খরচটুকুও উঠবে বলে মনে হয় না। দীর্ঘদিন এইরকম চলতে থাকলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপর্যয় অনিবার্য। অতি দ্রুত এদের পুনর্বাসনের কথা না ভাবলে অচিরেই দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top