নবকুমার বসু

ঠিক এক সপ্তাহ আগে দেশ থেকে ফিরেছি। করোনা–‌ভাইরাস এর গুঞ্জন তখনই শোরগোলে পরিবর্তিত হতে শুরু করেছিল। কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। ভারতীয় আবহাওয়ার অশান্ত বসন্তের নিবিড় বাতাসে করোনা এমনকিছু দোলা দেয়নি, কিংবা ঝঁাকানি সৃষ্টি করেনি, যা গুঞ্জন থেকে উৎসারিত শোরগোলকে উপযুক্ত মান্যতা দেয়। এবং  এক ধরনের উপেক্ষা–‌মিশ্রিত আত্মতুষ্টির গা–‌ভাসানো ব্যাপার ছিল তখনও। আমরা ধরেই নিচ্ছিলাম, আমাদের গরমের দেশ এমনিতেই, তার ওপর শীত বিদায় নিয়েছে এবং গরম পড়তে শুরু করেছে‌.‌.‌.‌ এমন তাপমাত্রায় নাকি করোনা ভাইরাস বাঁচে না। এই ধরনের কোনও নিশ্চিত প্রমাণ বা তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও আমরা বেশ ঢিলেঢালা ফুরফুরে মেজাজে, ‘‌ফুল ফুটুক না–‌ফুটুক, আজ বসন্ত’‌ ভাবতে–‌ভাবতে, জপতে–‌জপতে দোল–‌হোলি–‌ক্লাব–‌পার্টি–‌‌বসন্তোৎসব জমিয়ে, রাঙিয়ে চলেছিলাম। একমাত্র একটু বেশি করে হাত–‌টাত ধুয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনও কড়াকড়ি করতেই তো কেউ বলেনি!‌ 
জানুয়ারির শেষদিকে যখন গিয়েছিলাম, তখন কে জানত করোনা–‌ভাইরাসের নাম!‌ উদ্বেগ বাড়ছিল, যত ফেরার দিন ঘনিয়ে আসছিল। অনেক পরিযায়ীদেরই তো ফেরার সময়। নিত্য কথাবার্তা আর যোগাযোগ চলছিল। বিমানে উঠতে দেবে তো?‌ মাঝপথে আটকে রাখবে না তো?‌ কিংবা শেষপর্যন্ত উড়ে গেলেও লন্ডন–‌বার্মিংহাম–‌ম্যাঞ্চেস্টার কিংবা এডিনবরা‌য় কোয়ারেন্টিন করে রাখবে না তো!‌ কারুর কাছেই তখনও সঠিক খবর ছিল না যে ইংল্যান্ডে পৌঁছেই কী অবস্থা, কিংবা কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হব। 
সম্প্রতি ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে যেসব রিপোর্ট এসেই চলেছে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা কতখানি, আমরা সবাই জানি। কিন্তু একথা তো মানতেই হবে, সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মহামারীর প্রাবল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন না, আকাশপথে দ্রুতগতির যাতায়াত বেড়েছে অনেক এবং আমরা বলতে অভ্যস্ত হয়েছি, পৃথিবী ছোট হয়ে গেছে। আমরা সবাই এখন গ্লোবাল সিটিজেন.‌.‌.‌ বিশ্বনাগরিক। তাহলে সেই নাগরিকত্বের কিছু নেতিবাচক দায়ভার তো মানুষকে নিতেই হবে!‌ যাক্‌ সে কথা।
লন্ডনে ফিরে আসতে আসতেই জেনে গেছি আমাদের প্রতিবেশী দেশ বা রাজ্যসমূহ এবার রীতিমতো বিধ্বস্ত এবং আক্রান্ত ও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। ইতালি–‌জার্মানি–‌নেদারল্যান্ড–‌স্পেন তো বটেই, একেবারে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলার মতো ইংলিশ চ্যানেলের ওপারেই ফ্রান্স‌ও করোনা–‌কবলিত। চীনের পরে একমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ব্যতীত ইউরোপের দেশগুলো যে কোনও কারণেই হোক সাঙ্ঘাতিকভাবে আক্রান্ত। বলা হচ্ছে, কোভিড–‌১৯ ভাইরাস পজিটিভ কেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
অবশ্য পজিটিভ কেস হওয়া মানেই যে সব মরে যাচ্ছে তা নয়। মৃত্যুর হারের শতকরা হিসাব হচ্ছে ০.‌৮ থেকে ৩.‌৪%‌, বয়স এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা অনুযায়ী। খুব বেশি বয়স্ক, ডায়াবেটিক, হাইপারটেনসিভ, সিওপিডি অর্থাৎ যাঁরা হাঁপানি জাতীয়, লাংসের অসুখে ভোগেন.‌.‌.‌ এ ধরনের করোনা–‌পজিটিভ রোগীদের মধ্যে মৃতের হার বেশি। আমাদের অর্থাৎ প্রবাসীদের দেশ বিলেতে কী অবস্থা কিছুই টের পাইনি তখন।
কিন্তু না, বিমানবন্দরে নেমে, ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরার মধ্যে কোনওই দুর্ভাগ পোয়াতে হয়নি। যেমন নিশ্চিন্তে প্রতিবার প্লেন থেকে নেমে, ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পাশপোর্ট দেখিয়ে বেরিয়ে আসি.‌.‌.‌ গুড মর্নিং বলে.‌.‌.‌ তেমনই বেরিয়ে চলে এসেছি। মিনিট দশের মধ্যে লাগেজ কালেক্ট করে গ্রিন চ্যানেল দিয়ে বাইরে। বসন্তকালের সূচনায় কপালগুণে নিবিড় সূর্যালোকে ভাসছে পুরো দেশ। ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে ট্রেন ছেড়েছে। সঠিক সময়ে হোম.‌.‌.‌ স্যুইট হোম। কোনও অশান্তি, টানাপোড়েন নেই। প্রতিবেশীরা হাত নেড়ে স্বাগত জানালেন। আর.‌..‌‌ আজ একসপ্তাহ পরে সেই দেশটা হয়ে গেছে স্তব্ধ–‌শান্ত–‌শূন্য–‌নির্জনপুরী। বাচ্চারা এ সময় পাড়ার রাস্তায় খেলাধুলো হইচই করে। তাদের কলকাকলিতে আমি এমনিতে নির্জন, শান্ত এই দেশে প্রাণস্পন্দন টের পাই। নাহ, তারা কেউ নেই। খেলছে না, হাসছে না। সাইকেল নিয়ে ছুটছে না। এমনকী আমার এই খোলা জানালা দিয়ে প্রকৃতির বাসন্তী দিনের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে বুঝি সময়ও থেমে গেছে। দেশ আর নাগরিকের সুস্থতা কামনা করে, সরকার বাধ্য হয়েছে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতে!‌ আরও আগেই নাকি করা উচিত ছিল ইতালি আর স্পেনের অবস্থা দেখে!‌ জানি না। কিন্তু গতস্য শোচনা নাস্তি। শুধু জানি, ভীষণ নিয়মতান্ত্রিক দেশ এটা। আবালবৃদ্ধবনিতা, সাধারণ মানুষ সরকারি নির্দেশ মেনে চলবেই।
সুতরাং, এখন আমরা প্রায় গৃহবন্দি। বাইরে বসন্তের আহ্বানে ফুলেরা এসে গেছে। ড্যাফোডিল–‌হায়াসিন্থ–‌চেরিব্লসম আর ম্যাগনেশিয়া ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু জনমানবশূন্য রাস্তাঘাট। দোকানে আর সুপার মার্কেটে ভিড় নেই, কিন্তু ফাঁকায় ফাঁকায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিয়ে আসছে মানুষ। মজুত করার মানসিকতা কিছু মানুষের থাকবেই। কিন্তু সেদিকে নজর রাখা এবং আশ্বস্ত করার ব্যবস্থা আছে। অবস্থা খুব ভাল ঠেকছে না এখনও। যদিও শতকরা একানব্বই জন সেরে উঠছে নিজে থেকে, শুধু বিশ্রাম, প্যারাসিটামল, জল আর স্বাভাবিক খাদ্য খেয়ে। আইবুপ্রোফেন অর্থাৎ ব্রুফেনজাতীয় ওষুধ খুব খারাপ এই অসুখের ক্ষেত্রে। ইটালি আর স্পেনের অবস্থা খুব খারাপ, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে, বিলেতের অবস্থাও ভাল না। কয়েক দিনের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা একশো চার। আমরা বাড়ি থেকে না–‌বেরিয়ে, জানালা থেকে প্রতিবেশীদের শুভকামনা জানাচ্ছি হাত নেড়ে নেড়ে। আশার কথা, এপ্রিলে‌র মাঝামাঝি কোভিড–‌১৯–‌এর টিকা/‌ভ্যাকসিন এসে যাবে বলে বিবিসি জানিয়েছে। সবাই সাবধানে থাকুন।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top