প্রচেত গুপ্ত: ভয়াবহ করোনার সময় কিছু ‘‌ভাল ঘটনা’‌ও যে ঘটছে, সেকথা আমি এই কলামে গোড়া থেকেই বলে আসছি। সারাক্ষণ মুখ বেজার করে না থেকে আর আতঙ্কে না মরে ‘‌ভাল ঘটনা’‌র দিকেও যাতে মানুষ একটু তাকায় তার চেষ্টা করছি। অতি সামান্য চেষ্টা। সেতুবন্ধনে কাঠবিড়ালির মতো। হতাশার দৈত্য হওয়ার থেকে ‘‌আমিও কিছু পারি’ ধরনের ছোট্ট কাঠবিড়ালি হওয়া খারাপ নয়। তাই না?‌
এবার করোনা–‌ভারাক্রান্ত পুজোর ছুটি শুরু করলাম সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। এক ঝটকায় মন ভাল হয়ে গেল।
এই কথা শুনে কেউ ভাবতে পারেন, আমি বোধহয় সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা আবার দেখা বা তঁার লেখা আবার পড়বার কথা বলছি। না, এই সত্যজিৎ একেবারে নতুন সত্যজিৎ। অজানা সত্যজিৎ। অন্য সত্যজিৎ। মুগ্ধ করা সত্যজিৎ।
এ বছর সন্দেশ পত্রিকার পুজো সংখ্যার বিষয় ‘‌সত্যজিৎ ১০০’‌। সেখানে সত্যজিতের অপ্রকাশিত স্ক্রিপ্ট, সোনার কেল্লা ছবির এডিট হওয়া অংশ, না হওয়া বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট ছাপা হয়েছে। সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে সত্যজিৎ রায়ের লেখা অপ্রকাশিত ১২টি চিঠি। মাকে লেখা চিঠি। সন্দীপ রায় এই চিঠি সাজিয়ে পাঠকদের উপহার দিয়েছেন। লেখার নাম ‘‌ইতি মানিক’‌। সত্যজিৎ ১৯৪০ সালের জুলাই মাসে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হন। ১৯৪২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ছিলেন। সেই সময়ে তিনি মাকে যেসব চিঠি লিখেছিলেন, সেখান থেকে কিছু মণিমুক্তো প্রকাশ করা হয়েছে। সন্দীপ রায় ‘‌ঠাকুমাকে লেখা বাবার চিঠি’ শিরোনামের ভূমিকায় লিখছেন—‘‌শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন ঠাকুমাকে লেখা বাবার অনেক চিঠি পাওয়া গেছে। তার থেকে বাছাই করা কিছু চিঠি এ–‌সংখ্যায় গেল। এই পত্রাবলী চলবে আগামী কয়েক সংখ্যা ধরে।’‌
চিঠিগুলো যে কত ভাল আর কত গুরুত্বপূর্ণ আমি বলে বোঝাতে পারব না। তেমন পড়ায় আনন্দ। সত্যজিৎ যেন গল্প লিখছেন। কী নেই, কে নেই চিঠিতে?‌ আছে শান্তিনিকেতনের দিকপাল সব মানুষের কথা, আছে হস্টেলজীবনের থাকা–‌খাওয়া, পোশাকের কথা। তবে সবথেকে বেশি রয়েছে আঁকার কথা। প্রায় প্রতিটা চিঠিতেই  নানা ভাবে আঁকা শেখবার কথা বলেছেন সত্যজিৎ। কলাভবনে সেই সময় কীভাবে ছাত্রদের কাজ শেখানো হত রয়েছে  সেই গল্প। মাকে আঁকা শেখার একবারে খুঁটিনাটি জানিয়েছেন সত্যজিৎ। ছবি, রং, তুলি, একজিবিশন কিছু বাদ নেই। আছে ওরিজিনাল, লিনোকাট, টেম্পেরার কথা। আছে প্রচুর প্রচুর ঘটনা।
এবং আছেন রবীন্দ্রনাথ।
আমি বিস্তারিত যাচ্ছি না। পড়বার মজা নষ্ট হয়ে না যায়। শুধু উৎসাহটা বাড়িয়ে দিলাম। এই চিঠিগুলো মানুষ সত্যজিৎকে আরেক ভাবে চেনাল, আমাদের শিল্পকলাকে আরেকভাবে শেখালো, জানাল প্রতিভাধর পুত্রের সঙ্গে মাতার সম্পর্ক কেমন হতে পারে। এই চিঠি বিরাট সম্পদ। সন্দীপ রায় খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেন। তাঁকে এবং সন্দেশ পত্রিকাকে ধন্যবাদ। করোনার মন খারাপের সময়ে এই চিঠিগুলো মনের ভ্যাকসিনের মতো কাজ করবে। কথাটা হালকা ভাবে বললাম। সিরিয়াস কথা হল, চিঠিগুলো পড়তে হবে। পড়তেই হবে।
এবার একটা রাগের কথা বলি।
পুজোর উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছে। নানা রকম বিধি নিষেধের মধ্যে দিয়ে এবারের পুজো কাটাতে হবে। কিছু করার নেই। নিশ্চয় আগামী বছর আমরা আবার আগের মতো উৎসবে অংশ নিতে পারব। অনেকেই সতর্ক হয়েছেন। নিজে থেকেই হয়েছেন। খুব ভাল। তবে এর মধ্যে একটা বিশ্রী ঘটনা কানে এল। রুবি হাসপাতালের কাছে বাইপাসের ওপর পর পর অনেকগুলো আবাসন র‌য়েছে। ‘‌ভদ্রলোক’‌, এবং ‘‌শিক্ষিত’‌দের আবাসন। সেখানে রয়েছে আবাসিকদের কমিটি। শুনেছি, এর মধ্যে কোনও কোনও কমিটি খুব ভাল, কোনও কমিটি অতি ফোপর–দালাল। এরকম একটা আবাসনে এক পরিবারে করোনা হয়েছে।  কিছু আবাসিক একেবারে ‘‌রে রে’‌ করে উঠেছে। তুলকালাম কাণ্ড পাকিয়েছে। কীভাবে এই পরিবারকে সাহায্য করবে তাই না ভেবে, এদের কীভাবে শাসন করবে তাই নিয়ে সকাল থেকে চেঁচামেচি শুরু হয়েছে, বিচার শুরু হয়েছে। যাদের করোনা হয়েছে, তাদের এই মারে তো সেই মারে। আমি খোঁজ করলাম, এখানে কমিটি নেই? তাদের ভূমিকা কী?‌ জানলাম, কমিটি আছে, তবে এই অত্যাচারের সময় তারা ছিল চুপ। ‘‌দেখতে পাইনি, শুনতে পাইনি’‌ ভাব। আমি মনে করি, যারা করোনা আক্রান্তদের ওপর কোনোরকম চোটপাট করে তাদের কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় নিয়ে যাওয়া উচিত। চেপে ধরা উচিত কমিটিকেও। তারা কেন চুপ ছিল?‌ আরও শুনলাম। শুলনাম এখানে নাকি পুজো উপলক্ষে দু’‌হাজার না আড়াই হাজার টাকা করে চঁাদা নেওয়া হয়েছে। ছি ছি। আবাসিকদের কতজনের এবার টাকাপয়সার সমস্যা র‌য়েছে এদের জানা নেই? দু–‌আড়াইহাজার টাকা কেন?‌‌ এটা কিন্তু একধরনের গুন্ডামি। জিগ্যেস করলে বলবে, ‘‌আমরা তো জোর করিনি। কই একজন সামনে দঁাড়িয়ে বলুক দেখি।’‌ এটাও গুন্ডাদের মতো কথা। অথচ এই এলাকারই এক আবাসনের আবাসিক এবং কমিটি সম্পর্কে কিছুদিন আগে বিরাট প্রশংসা শুনেছি। আমার এক বন্ধু পরিবারে করোনা হয়েছিল। কমিটির সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্ট অভয় বার্তা নিয়ে ঝঁাপিয়ে পড়েছিলেন। আবাসিকরাও হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার বন্ধু ফ্ল্যাটে থেকেই সু্স্থ হয়ে যান।
আশার কথা বলে শেষ করি।
আমার অতি পরিচিত, অতি পছন্দের কয়েকজনকে ‘‌কোভিড ১৯’‌ আক্রমণ করেছিল। তাঁরা প্রত্যেকেই জিতেছেন। সুস্থ হয়ে নিজেদের কাজে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের কুর্নিশ। তাঁদের চিকিৎসক, সেবাকর্মী, বাড়ির লোক, পাড়া প্রতিবেশী, সহকর্মী সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে, আমাদের আরও সহমর্মী হতে হবে, আমাদের আরও আতঙ্ক দূর করতে হবে।
আমি কয়েক বছর দুর্গাপুজোর বিচারক হয়েছিলাম। বারোয়ারি পুজোতে ঘুরেছি, আবার আবাসনেও ঘুরেছি। শীর্ষেন্দুদা, পি সি সরকার, চিন্ময় রায়, ডলি বসুর মতো অনেক গুণিজনকে সঙ্গে পেয়েছি। বছর তিন হল, আর যাই না। কারণ এক সময়ে আমার মনে হল, উৎসবের কোনো প্রতিযোগিতা হয় না। সবার পুজো, সবার উৎসবই সেরা। এবার কিন্তু একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে। আমার মতে, এবার যাদের উৎসব মানুষকে সতর্ক করবে, যাদের উৎসব করোনা বিপন্ন মানুষের দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে, এবার তারাই সেরা। তাদের কেউ ট্রফি না দিলেও কিছু এসে যাবে না। সত্যিকারের সেরাদের ট্রফি লাগে না।

জনপ্রিয়

Back To Top