প্রচেত গুপ্ত: কেদারনাথের ভয়াবহ দুর্যোগের সময় এই কলমে আমি মুক্তকণ্ঠে সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেছিলাম। লিখেছিলাম, যঁারা উঠতে–‌বসতে সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেন, তঁারা দেখুন, আমাদের সেনাবাহিনী নিজেদের জীবন বিপন্ন করে কত লক্ষ মানুষের প্রাণ বঁাচাল!‌ আসুন তঁাদের জন্য মোমবাতি–‌মিছিল করি। কুর্নিশ জানাই। কিছু দিন আগে এই কলমেই আমি ওডিশা সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলাম। লিখেছিলাম, ওখানকার সরকার ফণী ঝড়ে ১০ লক্ষ মানুষের প্রাণ বঁাচিয়েছে। আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে দিয়েছে। শুধু আমি নই, গোটা বিশ্ব সেই সরকারের প্রশংসা করেছিল। আমি সেনাবাহিনীর কেউ নই, ওই বাহিনীর কেউ আমাকে চেনেও না। নবীন পট্টনায়কের সরকার আমাকে কোনও পুরস্কার দেয়নি। আমি শুধু লিখে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করেছিলাম। বলেছিলাম, আমাদের গর্বের স্যাটেলাইট, আবহাওয়া দপ্তরের বিজ্ঞানী এবং সব শেষে স্থানীয় প্রশাসনের জন্যই এত প্রাণ বেঁচে গেল। শুনেছিলাম, সমুদ্রের ধার থেকে যঁারা ঘর ছেড়ে আসতে চাইছিলেন না, ওডিশা পুলিশ তঁাদের দু’‌ঘা দিয়ে, ঘাড় ধরে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। ঝড়ের পর দীর্ঘ দিন তঁারা ঘর পাননি, আলো পাননি, জল পাননি। কিন্তু প্রাণ পেয়েছিলেন। এবার আসি আমফান ঝড়ে।
কলকাতা এবং লাগোয়া এলাকার বেশ কিছু অংশের মানুষ ক’‌টা দিন খুব কষ্ট পেলেন। পাওয়ারই কথা। বিদ্যুৎ নেই, জল নেই, ফ্যান নেই, এসি নেই, ফ্রিজ নেই, মোবাইল নেই, ইন্টারনেট নেই, নেটফ্লিক্স নেই, ফেসবুক নেই। শুধু কি তাই?‌ টিভিতে ছবি দেখলাম, আলোর অভাবে ছোট ছেলেমেয়েরা চার‌–‌পঁাচ দিন পড়াশোনা পর্যন্ত করতে পারল না। ইশ্‌,‌ চার–‌পঁাচটা দিন শিক্ষা থেকে নষ্ট!‌ বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ মানুষ, শিশুরা আরও বেশি কষ্ট পেলেন। সবাই খুব রেগে গেলেন। স্বাভাবিক। টানা চার–‌পঁাচ দিন বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। রাগ তো হবেই। সেই রাগের কারণে দিকে দিকে পথ–অবরোধ পর্যন্ত হতে থাকল। স্লোগান উঠল।
‘‌আমার বাড়িতে বিদ্যুৎ চাই। আমার বাড়িতে জল চাই। আমার বাড়িতে মোবাইল চাই।’‌
আমাকে একজন ফোন করে বলল, ‘‌বিদ্যুৎ ব্যর্থ। মোবাইল ব্যর্থ। সরকার ব্যর্থ।’‌
আমি মিনমিন করে বলতে গেলাম, ‘‌তাতে কী হয়েছে?‌ আমফান ঝড় তো সফল!‌ ৫০ বছরেও এমন ঝড় হয়নি। কলকাতার ওপর দিয়ে ১৩৩ বা ১৩৫ কিলোমিটার বেগে বিনা বাধায় ছুটে যাওয়া সহজ কথা নয়। বিরাট সাফল্য।’‌
সে বলল, ‘‌রসিকতা হচ্ছে?‌ নিজের বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকলে বুঝতে!‌ রসিকতা বেরিয়ে যেত!‌’‌
অতি বিনয়ের সঙ্গে জানাই, দীর্ঘ দিন আমি কলকাতার এমন একটা জায়গায় থাকতাম, যেখানে বন্যা ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। বাঙুর অ্যাভিনিউ। যে–‌সব বন্যা আমি দেখেছি, মানে ঘরে জল ঢুকেছিল, তার সালগুলো একটু বলি?‌ ১৯৭০, ১৯৭৮, ১৯৮৪, ১৯৮৬, ১৯৯৯, ২০০৭, ২০১০ সাল। বন্যার সময় কখনও আত্মীয়র বাড়িতে দু’‌মাস আশ্রিত হয়ে থেকেছি। কখনও দশ দিন, পনেরো দিনও গিয়ে থাকতে হয়েছে। বিদ্যুৎ থাকেনি কখনও আটাশ দিন, কখনও বাইশ দিন, কখনও বারো–‌চোদ্দো দিন। গলা, বুক, কোমরজল ঠেলে যাতায়াত করতাম। পাড়ার দাদারা নৌকো চালাত। সেই বালক–‌বয়স থেকে চাকরি করার সময় পর্যন্ত। বাঙুর যে খুব হেঁজিপেঁজি জায়গা ছিল, এমন নয়। বাংলার বহু বিশিষ্ট মানুষ সেই সময় ওখানে থাকতেন। নাম বললে যঁাদের আজও সবাই চিনতে পারবেন। শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, চিত্রকর, চিত্রপরিচালক, সঙ্গীত–‌পরিচালক, খেলোয়াড়, সরকারের বড় অফিসার। এঁদের অনেকের বাড়িতে একমাত্র সম্পদ বলতে ছিল শুধু বই। মূল্যবান, দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ। প্রতি বন্যায় শত শত, হাজার হাজার বই নষ্ট হত। রাস্তায় ফেলে দিতে হত। কাগজে সেই ছবি ছাপা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। ফেসবুক তো ছিলই না। বন্যার সময় কোনও সরকারের কোনও প্রতিনিধি আমাদের এলাকায় ঢুকেছেন বলে মনে পড়ে না। জল, বিদ্যুৎ, ত্রাণ, ইমার্জেন্সি, চিকিৎসা— কিচ্ছু না। রাজনীতির দাদা–‌কাকাদের টিকিটি দেখা যেত না। আমরা দিনের পর দিন পচা জলে, অন্ধকারে ডুবে থাকতাম, ডুবে থাকতাম এবং ডুবে থাকতাম। বাইরের লোকে বলত, ‘‌ও তো বড়লোকদের জায়গা, নিজেরা ঠিক বুঝে নেবে।’‌ কেউ আমাদের দেখে হাসত। বলত, ‘‌ও, তুই বন্যা–‌বাঙুরের ছেলে?‌’‌ কেউ বলত, ‘‌ও তো ভৌগোলিক কারণ!‌ বাটির মতো জায়গা। তাই বন্যা। কোনও দিন ঠিক হবে না।’‌ আমরা মুখ শুকনো করে থাকতাম।
২০১০ সালের পর বাঙুরে আর এ–‌রকম বন্যা হয়নি। তার মানে, কারণটা ভৌগোলিক ছিল না। কারণটা আসলে ছিল রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক অবজ্ঞা, অবহেলা, বঞ্চনা। কেউ বলে ষড়যন্ত্র। বন্যার কারণে প্রায় সব খ্যাতিমান বাঙুর ছেড়ে পালালেন। সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যঁারা পারলেন সবাই এদিক–‌ওদিক চলে গেলেন। শুনি, সেই বাঙুরে এখন নাকি এক কোটি টাকার ফ্ল্যাট কোনও ব্যাপার নয়। একশোর বেশি এটিএম কাউন্টার।
এই অভিজ্ঞতার কথা কেন বললাম?‌ বললাম এই কারণে যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে দুর্ভোগ কাকে বলে অনেকের থেকে আমার একটু বেশি জানা আছে। সাত–‌আট বার ঝড়জলের অভিজ্ঞতা কম নয়। দু’‌মাস গৃহহারা হয়ে থাকাই বা কম কী?‌ মনে পড়ে, সেই সময় প্রশাসন এবং মানুষের চরম অবহেলা দেখেছি। টিভি, মোবাইল, ফেসবুক ছিল না বলে কঁাদতেও পারিনি, রাগও দেখাতে পারিনি।
এখন মানুষ ‌তিন–‌চার দিনের দুর্ভোগেই রাগ দেখাতে পারছেন। এটা একটা সৌভাগ্যের কথা। এখন মানুষ ১৩৩ কিলোমিটার জোরে ঝড় বয়ে গেলেও দু’‌দিন–চার দিন কেন বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই বলে চিৎকার করতে পারছেন, এটা একটা প্রযুক্তিগত বিপ্লব। স্বাগত। এখন গোটা বাংলায় ১০ লক্ষের বেশি ঘর ভেঙে গেলেও, মানুষ আমার বাড়িতে নেট কেন নেই বলে ফুঁসতে পারেন। এটা একটা চরম অধিকারবোধ। এত সৌভাগ্য, এত প্রযুক্তিগত বিপ্লব, এত অধিকারবোধ আমাদের ছিল না। আজও এক কোটি দুর্গত মানুষের নেই। তঁাদের ঘরে শিশু নেই, অসুস্থ মানুষ নেই, বয়স্ক মানুষ নেই, নিভে–‌যাওয়া আলো নেই, বন্ধ–‌হয়ে–‌যাওয়া মোবাইল নেই, তা তো নয়। সম্ভবত তঁারা বোকা। তাই তঁাদের নেই যেমন অনেক কিছু, তেমন রয়েছে ধৈর্য, কষ্ট সহ্য করবার শক্তি।
আচ্ছা, যে–‌প্রশাসন আমফান ঝড়ের আগে ৬ লক্ষ দরিদ্র, অসহায় মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে, তাদের জন্য কি আমরা একবার কুর্নিশ জানাব না?‌ মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজে যদি কোনও গাফিলতি হত, তা হলে কী ঘটতে পারত?‌ মৃত্যুর সংখ্যা ৮৬ থেকে বেড়ে কোথায় গিয়ে দঁাড়াত?‌ ১০ হাজার?‌ ৫০ হাজার?‌ নাকি ১ লক্ষ?‌ সেই ভয়ঙ্কর সংখ্যা কল্পনা করলেও শিউরে উঠতে হয়। নিজের বাড়িতে চার দিন, পঁাচ দিন, ছ’‌দিনের বিদ্যুৎ–বিপর্যয় কি আমাদের এতটাই স্বার্থপর করে দিল যে আমরা সেই উদ্ধারের কথা ভুলে গেলাম!‌ আমফান ঝড়ে সব থেকে বড় এবং জরুরি কাজ ছিল মানুষকে সরানো। বিজ্ঞানসম্মতও বটে। আগে বেশি মানুষের প্রাণ বঁাচাও। দুর্যোগের পথ থেকে মানুষকে সরাও। খুব কঠিন কাজ। কড়া রোদে কেউ দুর্যোগের কথা ভেবে ঘর ছাড়তে চায় না। প্রশাসন সেই কঠিন কাজ করছে। এবার খিচুড়ি বিলি অনেক হবে। ফেসবুকে ছবি হবে বিস্তর। ত্রাণের বন্যা বয়ে যাবে। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ, রামকৃষ্ণ মিশনের মতো কয়েকটি মহতী সংগঠন ছাড়া সকলেই ত্রাণ দিয়ে প্রচারের ঘনঘটা করবে।
১০ লক্ষের বেশি ঘর ভেঙেছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙেছে তার বহুগুণ। গ্রামের পর গ্রাম আলো নেই। বঁাধ ভেঙে চাষের জমি নষ্ট। তবে চিন্তা নেই, চার দিন পরে আমার ঘরে তো বিদ্যুৎ এসেছে। নিশ্চিন্তি। এবার আমি টিভিতে অনেক দুঃখ–‌কষ্ট দেখতে পাব। ফেসবুকে একটা কিছু করতে পারব। গালাগালি থেকে ত্রাণ বিলি। সব থেকে বড় কথা, আমাদের ছেলেমেয়েরা এবার মন দিয়ে লেখাপড়া করতে পারবে। লকডাউনে অনলাইন ক্লাস আছে না?‌
একটা অদ্ভুত কথা কি জানেন?‌
নিজের বাড়ি ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে যে ছোট ছেলেমেয়েরা খুব কষ্ট করে অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে, ভেজা ছেঁড়া বই–‌খাতা খুলে পড়ছে, জানেন, তঁাদের মধ্যে কেউ কেউ বড় পরীক্ষায় দারুণ রেজাল্ট করবে। শহরের বড় স্কুলকে টেক্কা দেবে হইহই করে। কাগজে তাদেরই ছবি ছাপা হবে। টিভিতেও দেখাবে।
এত কষ্টের মধ্যেও সেদিনের কথা ভেবে আনন্দ হচ্ছে না?‌ আমার তো হচ্ছে। খুব হচ্ছে।

(শিরোনামের জন্য ঋণস্বীকার:‌ সলিল চৌধুরী। মনে করিয়ে দিয়েছেন বলে কৃতজ্ঞতা ‘‌আবার ক্ষীরের পুতুল’‌ পত্রিকার সম্পাদক মুনমুন দাশগুপ্তকে।) ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top