সিদ্ধার্থ জোয়ারদার: ভিটামিন সি–‌এর উৎস হিসাবে লেবু, এবং সেইসঙ্গে কাঁচা হলুদ, রসুন, আদা, নিমপাতা, মধু, শাকসবজি খাওয়ার
হিড়িক পড়ে গেছে— ইমিউনিটি বাড়িয়ে করোনা প্রতিরোধ করার জন্য। এমনকি, এই উদ্দেশ্যে বাজারে এসেছে ‘‌ইমিউনিটি সন্দেশ’‌!‌
জেনে হতাশ হবেন, খাবার খেয়ে শরীরে ইমিউনিটি বাড়ানোর প্রামাণ্য কোনও গবেষণাপত্র নেই। ইমিউন কার্যকলাপ যেহেতু ইমিউন কোষের জিনের দ্বারা পরিচালিত, কোনও খাবারেই ডিএনএ বা জিনকে প্রভাবিত করার কোনও উপাদান থাকে না। তবে হ্যাঁ, জিনের স্বাভাবিক কাজকর্মের সময় (পড়ুন, অ্যান্টিবডি, সাইটোকাইন প্রভৃতি প্রোটিন তৈরির সময়) কাঁচামাল হিসাবে অ্যামিনোঅ্যাসিড বা কো–ফ্যাক্টর হিসাবে কিছু পদার্থ (‌সেলেনিয়াম, ভিটামিন–‌সি) দেহে কম থাকলে সরবরাহ করা সামগ্রীগুলো কাজে লাগে। এতে ইমিউন সেলগুলো তার নিজস্ব ক্ষমতায় কাজ করতে পারে; হতোদ্যম হয়ে পড়ে না। কিন্তু খাবারের মাধ্যমে সরবরাহ করা সামগ্রী কখনোই ‘‌ইমিউনিটি পাওয়ার’‌–কে বাড়াতে পারে না। সেটা ব্যক্তি মানুষের জন্য নির্দিষ্টই থাকে।
প্রথমেই একটা জিনিস জেনে রাখা ভাল। আমাদের প্রত্যেকের শরীরে যে প্রতিরোধীশক্তি বা ইমিউনিটি রয়েছে তা একেবারেই আমাদের নিজস্ব, যা প্রত্যেকের প্রতিরক্ষাতন্ত্র বা ইমিউন সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত। অর্থাৎ প্রত্যেকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিন্তু আলাদা আলাদা, যা তার জেনেটিক মেকআপ বা জিনগত চরিত্রের ওপর নির্ভরশীল। এইজন্যই একই ঠান্ডা ও জোলো পরিবেশে থেকে কারও কারও সর্দি–জ্বর হয়, কেউ কেউ দিব্যি সুস্থ থাকেন।
আমাদের প্রতিরক্ষাতন্ত্র খুবই সুনিয়ন্ত্রিত একটি শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থাপনা। এতে মূল চালিকাশক্তি হিসাবে রয়েছে কিছু কোষ ও কিছু জৈব অণুর কার্যকলাপ। প্রতিটি কোষের নিউক্লিয়াসে যে ডিএনএ অণু থাকে তার মধ্যে অবস্থিত জিনের নিয়ন্ত্রণে কোষগুলি কাজ করে। ইমিউন কোষের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। তারা তাদের জিনের নির্দেশেই কোষীয় কার্যকলাপ ও জৈব–অণু নিঃসরণ করে। আর তাই প্রত্যেক মানুষের জিনগত চরিত্রের ওপরই তাদের ইমিউন কোষের কার্যকারিতা নির্ভর করে, যা একে অপরের থেকে ভিন্ন।
ইমিউন বা দেহজ সুরক্ষার কোষ ছড়িয়ে রয়েছে শরীরের বিভিন্ন টিসুতে। যেমন, ম্যাক্রোফাজ, ডেনড্রাইটিক কোষ প্রভৃতি। আবার কিছু সুরক্ষার কোষ রয়েছে রক্তে; যেমন, নিউট্রোফিল, মনোসাইট, লিম্ফোসাইট, ন্যাচারাল কিলার কোষ ইত্যাদি। রক্তে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোষ লিম্ফোসাইট দু ধরনের। ‘‌টি–‌লিম্ফোসাইট’‌ ও ‘‌বি–‌লিম্ফোসাইট’‌। এরা বেড়ে ওঠে যথাক্রমে থাইমাস ও বোনম্যারো (অস্থিমজ্জা)–‌তে। তাই এমন নাম। টি–লিম্ফোসাইট কোষীয় পদ্ধতিতে, ও বি–লিম্ফোসাইট প্লাজমা কোষ এবং তা থেকে পরবর্তীতে অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে দেহজ প্রতিরক্ষার কাজ করে। রোগ প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করলে দুই লিম্ফোসাইট দুই প্রকার কোষ তৈরি করে। একটি হল ইফেক্টর কোষ, অপরটি মেমরি কোষ। ইফেক্টর কোষ তখনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অযাচিত শত্রু জীবাণুকে মারতে উদ্যত হয়। টি–লিম্ফোসাইটের ক্ষেত্রে যাদের নাম সাইটোটক্সিক টি–লিম্ফোসাইট ও হেল্পার টি–লিম্ফোসাইট, আর বি–লিম্ফোসাইটের ক্ষেত্রে প্লাজমা সেল যা পরবর্তীতে অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
টি–‌মেমরি ও বি–‌মেমরি লিম্ফোসাইট শরীরের বিভিন্ন টিসুতে বিশেষ করে লিম্ফ নোড, স্‌প্লিন, টনসিল ও অন্ত্রের পেয়ার্সপ্যাচ ইত্যাদি স্থানে গিয়ে বসে থাকে। পরবর্তী সময়ে আগের জীবাণুরা আবার যখন আক্রমণ করে, তখন সেগুলোকে মারার জন্য মেমরি কোষগুলো ভীষণ তৎপরতার সঙ্গে ইফেক্টর কোষে পরিবর্তিত হয়ে শত্রু মোকাবিলায় অংশগ্রহণ করে। প্রতিদিন ঘটে চলা ছোটখাটো সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে প্রতিরোধী ব্যবস্থাপনা নীরবে কাজ করে চলেছে।
পার্সোনাল ইমিউনিটি কী প্রভাবিত করা যায়? মারণক্ষম বা ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর কোনও নির্দিষ্ট জীবাণু ও ভাইরাসের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে সেই ব্যাকটিরিয়া বা ভাইরাসের প্রতিরূপ বা রেপ্লিকা শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, শরীরে মেমরি লিম্ফোসাইট তৈরি করে রাখা, যাতে তারা পরবর্তীতে সত্যি সত্যি এই বিশেষ ব্যাকটিরিয়া বা ভাইরাস ঢুকে পড়লে, তাদের ওপর আঘাত হানতে পারে। এই রেপ্লিকা ব্যাকটিরিয়া বা ভাইরাসের শরীরে প্রবেশ করানোকেই টিকা প্রদান বা ভ্যাকসিনেশন এবং রেপ্লিকাটিকে ভ্যাকসিন বলে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের ফলেই ইফেক্টর কোষ প্রাথমিকভাবে যে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, রক্তে তার উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই।
এভাবে ব্যক্তিগত স্তরে ভবিষ্যৎ সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে ‘‌অ্যাক্টিভ ইমিউনিটি’‌ গড়ে তোলাকে কাজে লাগিয়ে একটি জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উপকার করা যায়। দেখা গেছে ৬০–৭০% মানুষের শরীরে যদি কোনও ব্যাকটিরিয়া বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি তৈরি হয়, তবে তা বাকি জনগোষ্ঠীকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। বাকিরা ভ্যাকসিন না পেলেও সুরক্ষিত থাকেন। এইভাবে জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ‘‌অ্যাক্টিভ হার্ড ইমিউনিটি’‌ বলে। স্মল পক্স, পাল্‌স পোলিও, মিজল্‌স, ডিপথেরিয়া ভ্যাকসিনেশনের কার্যকারিতা এই নীতিতেই ফলপ্রসূ হয়েছে।
এই অ্যাক্টিভ হার্ড ইমিউনিটি কোভিড রুখতেই পারে। কিন্তু সেজন্য একটি কার্যকর টিকা পেতে হবে। তবে তা পেতে কম করে এক বছর তো লেগে যাবেই।
তা হলে হার্ড ইমিউনিটিই কি সমাধানের উপায়? একটি জনগোষ্ঠীর কমপক্ষে ৭০% মানুষ যখন কোনও সংক্রমণ রুখতে সক্ষম হন (পরিভাষায় ইমিউন হন), বাকি মানুষেরা তখন সেই রোগের সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে
পারেন। অপরদিকে স্বাভাবিকভাবে আক্রান্ত কোনও জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশের দেহে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি পরোক্ষভাবে জনগোষ্ঠীর বাকি মানুষকে রোগের সংক্রমণ থেকে বিরত করতে পারে। তবে এই জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশের আক্রান্ত হতে দীর্ঘ সময় লাগে। সেই সময় অপেক্ষাকৃত রোগ প্রতিরোধে অক্ষম দুর্বল মানুষদের মৃত্যু অবধারিত। সংক্রমক রোগটির মৃত্যুহার যদি ৫% হয়, তবে ভাবুন কয়েক কোটি জনসংখ্যার কোনও দেশে বেশ কয়েক লক্ষ লোকের মৃত্যু নিশ্চিত।
দেশে লকডাউন না করে পরোক্ষ হার্ড ইমিউনিটির মাধ্যমে কোভিড–১৯ আটকানোর চেষ্টা করেছিল উত্তর ইওরোপের দেশ সুইডেন। সে দেশের মুখ্য এপিডেমিওলজিস্ট অ্যান্ডার্স টেগনেল বিশ্ববন্দিত জার্নাল ‘‌নেচার’‌–কে এপ্রিলের গোড়ায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই স্ট্র্যাটেজি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু জুলাই মাসের শেষে দেখা গেল, এক কোটি জনসংখ্যার দেশ সুইডেনে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার, মারা গেছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ। ১৩৮কোটির ভারতে ন্যাচারাল ইমিউনিটির আশায় বসে থাকলে কত লক্ষ মানুষের মৃত্যু গুনতে হবে! 
সুষম আহার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম (৭–৮ ঘণ্টা) এবং হালকা ব্যায়াম (বা যোগাভ্যাস) শরীরকে ফিট ও মনকে সতেজ রাখে, মানসিক চাপ কমায়। ইমিউন সিস্টেমও তার নিজস্ব ক্ষমতায় কাজ করে। অন্যদিকে, ভিটামিন (‌যেমন ভিটামিন–সি, ভিটামিন–ডি), মিনারেল (‌যেমন সেলেনিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন)–‌এর মতো পুষ্টি সাহায্যকারী উপাদান বেশি খেলে শরীরের বিশেষ লাভ হয় না। উৎসেচকের ‘‌কো–ফ্যাক্টর’‌ হিসাবে স্বল্পমাত্রায় কাজে লাগার পর বেশিরভাগটাই মল–মূত্রের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। আবার এদের পরিমাণ বেশি মাত্রায় হলে শরীরে এরা ‘‌হাইপারভিটামিনোসিস’‌ বা মিনারেল টক্সিসিটি (বিষক্রিয়া) তৈরি করতে পারে। পাতলা পায়খানা,
বমি হওয়া, বমি পাওয়া, মাথা ধরা, পেট ব্যথা, এমনকি লিভার, কিডনি, হার্ট ও অস্থির সমস্যা দেখা দেয়। তাই খাবার খেয়ে ইমিউনিটি বাড়ানোর চেষ্টা একেবারেই সমীচীন নয়, বিজ্ঞানসম্মত তো নয়ই।
(অধ্যাপক, পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়, ভাইরোলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগ)‌

জনপ্রিয়

Back To Top