জয়ন্ত ঘোষাল: লিডার কে?
কেমব্রিজ অভিধানে ‘‌লিডার’‌ শব্দটির অর্থ বলা হয়েছে:‌ a person in control of a group a country or situation. এটা হল আক্ষরিক অর্থ। লিডার শব্দটির বাংলা ‌‘‌নেতা’‌। চলন্তিকা–‌য় রাজশেখর বসু বলেছেন, নেতার অর্থ নায়ক। পরিচালক। অগ্রণী। পথ–‌প্রদর্শক। রাজশেখরবাবুর শব্দগুলি বেশ হৃদয়গ্রাহী।
তাই শুধু ভোটে জিতলেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নেতা হওয়া যায় না। নেতৃত্ব একমুখী নয়, এক উভমুখী প্রক্রিয়া। এবং এক ধরনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। নেতা সমাজের জন্য, এই নাগরিক সমাজের হিতার্থে তাঁর হাত বাড়িয়ে দেবেন, আবার অন্য দিকে নেতা দেশের বৃহৎ জনসমাজের কল্যাণের জন্য তাঁর হাত বাড়িয়ে দেবেন। এই পৃথিবী জুলিয়াস সিজার, নেপোলিয়ন থেকে হিটলার, স্ট্যালিন— নানা ধরনের নেতা দেখেছে। ভারতের মতো বিশাল দেশে গান্ধী–‌নেহরু থেকে জ্যোতি বসু,‌ নরেন্দ্র মোদি— নানা ধরনের নেতৃত্বের মডেল আমাদের ল্যাবরেটরিতে। কিন্তু আজ এই করোনা–‌কাণ্ডে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্ব দেখে আমি যুগপৎ মুগ্ধ এবং বিস্মিত। ১৯৮৪ সালে যখন মমতা সোমনাথ চ্যাটার্জিকে পরাস্ত করেন, তখন সবে আমরা বরুণ সেনগুপ্তর বর্তমান–‌এ যোগ দিয়েছি। সেই সময় থেকে মমতাকে দেখেছি। ওঁর জীবনের রাজনৈতিক উত্থানপতন, বহু রৌদ্রছায়ার সাক্ষী আমি।
আজ এত বছর পর বলতেই হবে, ’‌৮৪ সালে মমতা যেখান থেকে তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজ সেই অবস্থান থেকে তিনি সরে এসেছেন অনেক দূর। তিনি কীভাবে নিজেকে তিল–‌তিল করে আজ এই স্তরে উন্নীত করেছেন, তা ভাবলে আমি বিস্মিত হয়ে যাই। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গে অতীতে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন— বিধানচন্দ্র রায়, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় থেকে জ্যোতি বসু— প্রায় প্রত্যেকেরই অভিজাত পারিবারিক গৌরবগাথা ছিল, নিদেনপক্ষে সকলেই রাজনৈতিক পরিবারের গৌরব বহন করতেন। সবচেয়ে বড় কথা, এঁরা সকলেই ছিলেন পুরুষ। মণিকুন্তলা সেন থেকে গীতা মুখার্জি রাজনীতি করেছেন, আন্দোলন করেছেন পশ্চিমবঙ্গে, কিন্তু কেউ রাজ্যের ‘‌লিডার’‌ হতে পারেননি। মমতা পেরেছেন।
এবার করোনা–‌সঙ্কটের দিনেও ঘরে বসে আমরা সকলে যেভাবে মমতাকে দেখছি, তাতে শুধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে তাঁর প্রশংসা করেছেন তা নয়, রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ দল–‌মত নির্বিশেষে বলছেন, মেয়েটা পারেও বটে!‌ ওর উৎসাহকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিরোধী নেত্রী হিসেবে এভাবেই তিনি দৌড়ঝাঁপ করতেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হয়েও তাঁর গণসংযোগে কোনও ঘাটতি হয়নি। কখনও বাজারে গিয়ে লক্ষ্মণরেখার বৃত্ত আঁকা, আবার কখনও লালবাজারে ছুটে যাওয়া। এহেন নজিরবিহীন মেডিক্যাল ইমার্জেন্সিতে মমতা ঠিক কী করেছেন, কীভাবে করছেন, তা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, রাজ্যস্তরে কিন্তু মমতা এই মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী নন, রাজ্যের যথার্থ অভিভাবক। 
কিন্তু কীভাবে মমতার নেতৃত্ব এভাবে সাফল্য পেল? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বের সাফল্য নিয়ে অনেক গবেষণা  করেছে। একটি গবেষণা বলছে, সিজার খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি শুধু সামনের দিকে তাকাতেন এমন নয়, সর্বদা নজর পেছনে রাখতেন। অর্থাৎ কী ধরনের বাধাবিপত্তি ও শত্রুতা আসতে পারে। সিজার বলতেন, শত্রুর কাছ থেকেও আসলে অনেক কিছু শেখার আছে। ব্রিটেনের প্রতিপক্ষ সেনার কাছ থেকে তিনি অনেক কিছু শিখেছিলেন। সিজারের ভাষায়, 'Thus they show in action the mobility of Cavalry and the Stability of infantry.' সিজারের শিক্ষা ছিল, 'Never turn away from threat or adversity. Learn from it.'
মমতা নিজের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। মোদি এবং অমিত শাহর মতো ক্ষুরধার চতুর রাজনীতি গভীর ভাবে অনুধাবন করেছেন, তার পর প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলেছেন। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এবং সচেতন ভাবে। 
আধুনিক ম্যানেজমেন্টে নেতৃত্বের যে–‌সব গুণের বর্ণনা আছে, সেগুলির প্রেক্ষিতে আসুন আমরা মমতার নেতৃত্বের বিশ্লেষণ করি। প্রথমত, দ্য পাওয়ার অফ ফোকাস। একে বলা হয় লিডারশিপ ফ্রম দ্য মাইন্ডস আই। শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষের চোখ যেমন তাকে দেখছে, সেভাবে নেতার অগ্রাধিকারও হল মানুষের চোখে। মানুষের চোখের ভাষা বোঝার জন্য নেতার প্রয়োজন এক ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান। মমতার আর্থ–‌সামাজিক শিকড় আমরা সবাই জানি। মমতার পদবি ব্যানার্জি, অর্থাৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সামাজিক ভাবে জন্মসূত্রে উচ্চবর্ণের হলেও, বড় হয়েছেন যথেষ্ট আর্থিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। আর্থিক প্রেক্ষিতের বিচারে তিনি সোনার চামচ, রুপোর চামচ মুখে দিয়ে জন্মাননি। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর দুটো টার্ম চলে যাওয়ার পরও তিনি এই শিকড় আলগা হতে দেননি। মানুষের চোখের ভাষা বোঝার অগ্রাধিকার তিনি বদলাননি।
দ্বিতীয়ত, নেতা নীচু স্তরে উৎসাহ সৃষ্টি করবেন। তাঁর নেতৃত্ব হবে মোটিভেশনাল। হতাশ জনসমাজকে তিনি আজও চাঙ্গা করতে পারেন। তাঁর সঙ্গে সফর করতে গিয়ে দেখেছি, জেলায় জেলায় ছেলেমেয়েদের পিঠ চাপড়ে দিলে তারা যেন তড়িৎবাহিত হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে আর অন্য কোনও নেতার কি এই মমতা আছে? 
তৃতীয়ত, নেতার সবচেয়ে বড় গুণ হল, মানুষ তার ওপর আস্থা রাখবে। বিশ্বাস করবে। এই আস্থা বা বিশ্বাস থাকার ফলে নেত্রী যখন বলেন, করোনার জন্য এ–‌সব কথা শুনতে হবে, সার্বিক ভাবে মানুষ মমতার আবেদনে সাড়া দিচ্ছেন। কারণ, মমতার নির্দেশে হিটলারি মনোভাব নেই। সেখানে তিনি অনেক বেশি মানবিক। যেন তিনি এ রাজ্যের অভিভাবক। আমাদের ঘরের কেউ। বাড়ির বড় দিদির মতো। 
চতুর্থ গুণ হল, নেতার ভাষা। সে–‌ভাষা আমজনতার ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। পঞ্চমত, তিনি দু’‌পক্ষের দ্বন্দ্ব ও সঙ্ঘাত ঘোচাবেন। ষষ্ঠত, নেতা এমন হবেন যে তিনি যখন মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন তখন মনে হবে তিনি কথোপকথনে ব্যস্ত। তিনি মানুষের সঙ্গে সেতু রচনা করছেন। হার্ভার্ড ম্যানেজমেন্টের ভাষায়, হাই–ইমপ্যাক্ট নেগোশিয়েটর নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রেও যে এ–‌সব গুণ নেই তা নয়। আজও মূলত হিন্দি বলয়ে তিনি উত্তরভারতীয় সংস্কৃতিতে আম–‌মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন। কিন্তু পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতি ও সমাজতত্ত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। এবং, এই সংস্কৃতিকে, এই বর্তমান বাঙালিয়ানাকে মমতা যেভাবে বোঝেন, তাতে তঁার বিকল্প নেতা তো দেখি না।
কোনও প্রাকৃতিক বা সামাজিক বিপর্যয় হলে মমতা যেভাবে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাও আমি কারও ক্ষেত্রে দেখিনি। একবার দার্জিলিং থেকে মমতার সঙ্গে নামছিলাম সমতলে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ছিলেন সেই কনভয়ে। আমরা পেছনে। হঠাৎ মোড় নিতে গিয়ে পিছলে একটা পুলিশের জিপ খাদে পড়ে গিয়েছিল। সে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি!‌ মমতা কিন্তু তখন রাস্তায় নেমে কোমরে শাড়িটি গুঁজে মাথা ঠান্ডা রেখে যেভাবে খাদে পড়ে–‌যাওয়া পুলিশকর্মীদের দড়ি দিয়ে ওপরে তুলেছিলেন, তা দেখে যে–‌কোনও সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যাবে। মমতা চিরকালের ডাকাবুকো। সঙ্কটে জীবনের ভয় নেই। যেন আরও শক্তি পান। অনশনের সময় বা সিঙ্গুর আন্দোলনের কালেও এই মমতাকে আমরা দেখেছি। এ–‌সবই পুরনো কথা। আমরা সবই জানি। করোনার অভিজ্ঞতায় শুধু বাংলা নয়, ভারতের মানুষ দেখল সেই ভিনটেজ মমতার নেতৃত্বকে। এটি যে আজ অপরিবর্তনীয়, তা টের পাওয়া গেল।
নেতৃত্বের গুণ হিসেবে আরও বলা হয়, নেতা মানুষের সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে পারেন সফলতার সঙ্গে। তার ভিত্তিতে তিনি কনসেশন দেন, যা দেন তা মানুষ মেনেও নেয়। ধরুন, মমতা বললেন, এই সঙ্কটে আমি এতটা খাবার দিতে পারব, এর চেয়ে বেশি আপাতত পারব না। মানুষ কিন্তু তা মেনে নেবে। মানুষ ভাববে, দিদি পারলে সবচেয়ে বেশিই দেবেন। এই বিশ্বাসযোগ্যতা নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় উপাদান।
এক কথায় বলা হয়, নেতা তঁার high energy দিয়ে আমজনতার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এ হল রাজনৈতিক আবেগ। পলিটিক্যাল ইমোশন। প্লেটো রিপাবলিকে একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। সেটি হল Charmides বা Temperance (খারমিদেস বা মিতাচার)। প্লেটো বলেন, মিতাচার হল আনন্দ ও আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে শৃঙ্খলায় আনা। বা, নিয়ন্ত্রণ করা। এখানে আমাদের জীবন আমরা কীভাবে কাটাব, কোনও সঙ্কট এলে কীভাবে তার মোকাবিলা করব, সেটা নিছক কোনও রাষ্ট্র বা নেতার একতরফা নির্দেশ নয়। রাষ্ট্র ও নেতাকে স্বীকার করলে তখনই তা সার্থক হবে, যখন মনে হবে নেতার নির্দেশ আমি নিজেই স্বীকার করছি। তখন সঙ্গত ভাবে আমি নিজেই নিজের মনিব। কর্তা চাকরও বটে। আবার চাকরের কর্তাও বটে। মিথ্যাচার ও আত্মকর্তৃত্বের মাধ্যমে শাসক ও প্রজার সমতান হবে।
মমতার নেতৃত্বের সফলতা রাজ্যে এক বড় অংশের মানুষের মনস্তত্ত্বের মধ্যে আত্মকর্তৃত্বের অনুভূতি দিচ্ছে। সহজ কাজ নয়। বেশ কয়েক বছর আগে রাজ্যে সিপিএমের এক নেতা আমাকে বলেছিলেন, সিপিএম মমতাকে সরাতে পারছে না কেন জানো? আমাদের বিরোধী সিপিএম দলে একজনও মমতা নেই। সম্ভবত আজ বিজেপি–‌র শীর্ষ নেতৃত্বও রাজ্যে একজন বিরোধী মমতাকে খুঁজছেন।


 

জনপ্রিয়

Back To Top