‌সব্যসাচী সরকার: অচেনা এক দৈত্য দাপিয়ে, পিষে দিয়ে গেছে কলকাতা। ছিন্নভিন্ন করে গেছে শহরের চেনা ছবি। অলিগলি, বড় রাস্তা আর হোর্ডিং, আলো, জনপদ, কলরবে জমজমাট শহর কেমন আশ্চর্য স্তব্ধ। বৃহস্পতিবার সকালে দেখে মনে হল গোটা শহরটাই যেন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে গেছে। অথবা এরকমটাই ছিল, ইতিউতি মাথা তুলেছে বহুতল বাড়ি। ঝড় আর বৃষ্টির দাপট শেষে বৃহস্পতিবারের কলকাতা একেবারে বর্ণহীন, ফ্যাকাশে ধ্বংসস্তূপে অবরুদ্ধ নগরী। ঝড়–‌বৃষ্টির দাপটে প্রাণ গিয়েছে অনেকের। আহতও অনেক। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এই ভূখণ্ড দেখে শিউরে উঠতে হয়। আমফান, তুমি ক্ষমাহীন অপরাধী। 
উত্তর কলকাতার খান্না, গৌরীবাড়ি থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে আহিরীটোলার দিকে যেতেই পুলিশ আটকাল। গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ। ফের গাড়ি ঘুরিয়ে রঙ্গনার গলি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। সেখানেও রাস্তা অবরুদ্ধ। অগত্যা মানিকতলা মোড় হয়ে গিরীশ পার্কের দিকে যেতে আরও বিপদ। আমহার্স্ট স্ট্রিটে কোমর জল, জলে ডোবা গাড়ি। লোহাপট্টির সামনে থাকা বড় গাছটা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সামনেও গাছ পড়ে আছে। এবার গাড়ি ঘোরানোই বিপদ। মনে হল, মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মরা গাছেরা চক্রব্যূহের মতো ঘিরে ধরেছে। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। সেখান থেকে বেরিয়ে এবার সোজা শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়। নেতাজির স্ট্যাচুর ওপর টেলিফোনের, কেব্‌লের, ট্রামের তার পড়ে আছে। ফের আহিরীটোলায় যাওয়ার চেষ্টা করি। অসম্ভব। শোভাবাজার মেট্রোর সামনে ফিরে এবার চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। যেন একটা দৈত্য রাজপথ দিয়ে যাওয়ার সময় দু–‌হাত দিয়ে গাছের মুঠি ধরে রাস্তায় টেনে নামিয়েছে। ল্যাম্পপোস্ট উপড়ে ফেলে দিয়েছে। ট্র‌্যাফিক পুলিশের কিয়স্ক ছুঁড়ে ফেলেছে দূরে। যা ইচ্ছে তাই করে গেছে। 
রমেশ দত্ত স্ট্রিটে (‌রামবাগান)‌ বিরাট জটলা। আমফানের আক্রোশ ফুটপাথে সাজানো মন্দির উপড়ে ফেলে দিয়েছে। শুধু ওই জায়গাই নয়, উল্টোডাঙা মুচিবাজার সংলগ্ন বহু জায়গাতেই দেবস্থানের ওপর বহু দিনের পুষে থাকা রাগ মিটিয়ে নিয়েছে। ধর্মতলায় ঢোকার মুখেই রাস্তার ওপর আড়াআড়ি পড়ে আছে গাছ। তখনও যান্ত্রিক ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়নি। গাছের পাতা, ডাল সরিয়ে স্থানীয়রা যাতায়াত করছেন। গোটা কলকাতায় এই ঝড়ে বোধহয় হাজারের ওপর গাছ উপড়ে গেছে। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব কলকাতায় বহু বছরের পুরনো যে গাছগুলো অনেকটা ঠিকানার মতো দাঁড়িয়ে ছিল, তা নিমেষে উধাও। 
ধর্মতলায় চার মাথার মোড়। ডান হাতে কে সি দাশের দোকান। বাঁদিকে চলে গেছে মৌলালির রাস্তা। সামনে সোজা গেলেই পার্ক স্ট্রিটের পথ। মৌলালি ঢোকার শুরুতেই গাছ পড়ে প্রাচীর তুলে দিয়েছে। গাছের শরীরে জড়িয়ে রয়েছে ল্যাম্পপোস্ট, তার, হোর্ডিং আর হ্যাঁ কলকাতা পুলিশের সিসি টিভি খাম্বাও। একজন ঝড়ে উড়ে যাওয়া লোহা, টিন বোঝাই করে গামছার একটা অংশ ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছেন। রাজভবনের সামনে গাছ পড়েছে। বিপজ্জনকভাবে ল্যাম্পপোস্ট আর তার হাত ধরাধরি করে ঝুলছে। বোঝা যাচ্ছে না, জমে থাকা জলে বিদ্যুতের তার কতগুলি জায়গায় পড়েছে। ঝড়ের পরে জমা জলে বিদ্যুতের তার পড়ে থাকলে বিদ্যুৎস্পর্শে মৃত্যুর ঘটনা খুব স্বাভাবিক। 
গাড়ি ঘুরিয়ে রেড রোডের পথ ধরি।  চওড়া রাস্তার দু’‌পাশে অজস্র গাছ হাত–‌পা ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। পার্ক স্ট্রিটে ঢোকার মুখেই গাছ পড়ে বন্ধ। শুরু হয়েছে গাছ কাটার কাজ। সকাল থেকেই কলকাতা পুলিশের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, এনডিআরএফ, দমকলের কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। কলকাতাকে পুরনো চেহারায় ফেরাতেই হবে। ক্যাথিড্রাল রোডে দেখা গেল, গাছ পড়ে রঙিন রেলিংটাই রাস্তায় মিশে গিয়েছে। রবীন্দ্র সদনের সামনে থেকে ডানদিক ঘুরে এসএসকেএম হাসপাতালের সামনে দিয়ে যাচ্ছি। সেখানেও জটলা।
বহু জায়গাতেই পড়ে থাকা গাছের তলাতেই কোনওক্রমে ছোটখাটো গাড়িগুলো যাচ্ছে। অবশ্য, ঝড়ে পড়ার আগে গাছ চেপ্টে দিয়েছে গাছের নীচে থাকা কয়েকটি গাড়ি। 
এখনও শেষ হয়নি লন্ডভন্ড ছবির। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখা গেল অন্য কিছু। সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বহু মানুষ। টালিগঞ্জের আশা ল্যাবরেটরির কর্মীরা তৈরি করা খাবার হাতে হাতে দিচ্ছেন। গড়িয়াহাটের মোড় শুনশান। ফিরতি পথে পার্ক সার্কাসে কিছু কিছু জায়গায় জমা জল। ছোটখাটো গাছ পড়ে ছিল। সরানোর কাজ চলছে। আনন্দ পালিত রোডে গাছ পড়ে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাই হাত লাগিয়েছেন চেনা রাস্তাকে খুঁজে বার করতে। ছাতুবাবু লেনে অবশ্য অন্য ছবি। গাছ কেটে সরাচ্ছেন বাসিন্দারাই। 
ঝড় আর গাছ কলকাতাকে হতশ্রী করে দিল?‌ না। বুধবার সাড়ে তিন ঘণ্টার টানা ঝড়–‌বৃষ্টি (‌এমন বৃষ্টি একেবারে রেকর্ড)‌ উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিয়েছে বহু মানুষের। গোটা পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কলকাতার। কেউ কেউ মোবাইলে কথা বললেও অজস্র মানুষ তার দিকে তাকিয়ে দেখছেন। যেন তিনিই ভাগ্যবান!‌ ফোন কাজ করছে!‌ বিদ্যুৎ ছিল না বহু ঘণ্টা। খাবার জলের সমস্যা। জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে বড় রাস্তা থেকে ছোট রাস্তা পার হওয়া বন্ধ। 
বুধবার রাতভর কলকাতায় একটা যুদ্ধ হয়েছে।
বুধবার রাতভর কলকাতায় মানুষ ভয় পেয়েছে।
বুধবার রাতভর কলকাতায় যা ঘটেছে আর কখনই ঘটেনি।
বৃহস্পতিবার থেকে কলকাতা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। কলকাতাকে দমিয়ে রাখা যায় না।

জনপ্রিয়

Back To Top