দেবপ্রসাদ রায়: আমার এক পা কলকাতায়, আর এক পা জলপাইগুড়িতে, মাঝে দীর্ঘদিন দু’‌পা দিল্লিতেই ছিল। ২ এপ্রিল জলপাইগুড়ি যাওয়ার টিকিট কাটাও ছিল। লকডাউন কলকাতায় বন্দি করে রাখল। তা রোজই ফোন আসে নিজের শহর থেকে, ‘‌দাদা সাবধানে থাকবেন, কলকাতার পরিস্থিতি খুব খারাপ।’‌ খারাপ যে সে তো আমিও বুঝতে পারছি। সাবধানেই থাকছি। বাকিটা কপাল। তা তো জলপাইগুড়ি পালালে বদলানো যাবে না। ওরা ভালই আছে। মুখে একটা রুমাল বেঁধে সব কাজই আগের মতো করছে। কারণ করোনা এখনও ‘‌ইন্ডিয়া’‌র সমস্যা, ‘‌ভারতে’‌র নয়। তাই গ্রাম বাংলায় — ‘‌শোভা বলো, স্বাস্থ্য বলো আছে বা না আছে’‌— এখনও সবাই শান্তিতেই আছে।
কোনও এক প্রতিষ্ঠিত নেতা কলকাতার উপকণ্ঠে একটি শহরতলির সভায় বক্তৃতাকালীন বলেছিলেন এখান থেকে তো গোটা কলকাতায় ঝি সাপ্লাই হয়। বিষয়টা নিয়ে বেশ জলঘোলা হয়েছিল, পরে অবশ্য তিনি বলেছিলেন, আমি কাউকে ছোট করার জন্য বলিনি, ওখানকার দারিদ্র বোঝানোর জন্য বলেছিলাম। আমিও কাউকে ছোট করার জন্য বলছি না কিন্তু সকলেই সহমত হবেন যে পশ্চিমবাংলা সব রাজ্যকেই শ্রম বিক্রি করে। এমন কোনও রাজ্য নেই, যেখানে বাংলার শ্রমিক নেই, ওরা সংখ্যায় কত কোনও দিনও গোনা সম্ভব হয়নি। এবার একটা সেন্সাস করলে বোঝা যাবে, কত লক্ষ কর্মক্ষম মানুষ রাজ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন ইতিমধ্যে এক লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ফিরে এসেছে। আমার ধারণা যদি ঠিক হয়, ধাপে ধাপে একশোটি ট্রেন যখন ঢুকবে (‌মুখ্যমন্ত্রীর বয়ান অনুযায়ী)‌ পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা দশ লাখ অতিক্রম করবে এবং সব গ্রামীণ জেলাতেই তাদের উপস্থিতি অনুভূত হবে। করোনা কি তখন ইন্ডিয়া থেকে ভারতে যেতে চাইবে?‌ আশঙ্কাটা এখন থেকেই উঁকি দিতে শুরু করেছে।
করোনা যোদ্ধারা অসাধারণ কাজ করছেন— ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুল্যান্স চালক, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, এমনকী আমি মনে করি, বেসরকারি সংস্থার দ্বারা নিয়োজিত নিরাপত্তারক্ষীরা পর্যন্ত। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র বদলালে যোদ্ধাও তো বদলাতে হবে। এ রাজ্যে গ্রামাঞ্চলে জনস্বাস্থ্য রক্ষার দায় কিন্তু তঁারাই পালন করছেন, যঁারা চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ে আসেননি। মা ও শিশুদের দেখভাল করেন অঙ্গনওয়াড়ির দিদিরা, আর গ্রামীণ মানুষকে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন রাখেন আশাকর্মীরা। এই যুদ্ধে এঁরাই পদাতিক বাহিনী হতে পারেন। কারণ প্রশিক্ষিত সৈন্যরা রাতারাতি টোটোপাড়া, রায়মাটাং, কালামাটিতে পৌঁছে যাবেন, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই। আর শত্রু এখনও মেঘের আড়ালেই রয়ে গেছে, কোনও দেশের কোনও সেনাবাহিনী তাকে এখনও ঘাযেল করতে পারেনি। তাই এই পদাতিকদের ওপর ভরসা করা ছাড়া আর উপায় কি!‌
প্রসঙ্গত বলি, বাম আমলে জয়পুর থেকে আইআইএইচএমআর–‌কে ডেকে আনা হয়েছিল রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সমীক্ষা করতে। সেই সংস্থা জানিয়েছিল এই রাজ্যে ৫৪ শতাংশ মানুষ এখনও হাতুড়ে চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে। কারণ তারা বাড়ির কাছে থাকে, তারা অনেক সস্তায় চিকিৎসা পরিষেবা দেয় এবং অনেক সময় বাকিতেও ওষুধ দিয়ে থাকে। বর্তমান সরকার যদিও এদের গ্রামাঞ্চলে উপস্থিতি ও অপরিহার্যতাকে অনুভব করে ব্লক স্তরে এক দু’‌বার তাদের ডেকে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় সে বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে কিন্তু তাদের স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামোর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেনি। তাই তারা থেকেও নেই। আমি বিধানসভায় এই বিষয়ে একাধিকবার বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েও কোনও দাগ কাটতে পারিনি। ডাঃ অভিজিৎ চৌধুরি তঁার লিভার ফাউন্ডেশন থেকে নিজের জেলা বীরভূমে আরএমপি–‌দের দক্ষতা বৃদ্ধি করে তাদের গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবায় যুক্ত করতে কিছু পদক্ষেপ করেছিলেন। ঘটনাচক্রে আজ তিনি এই যুদ্ধে প্রথম সারিতে আছেন। প্রত্যাশা করব তিনি এই লড়াইয়ে এদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে চেষ্টা করবেন।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া–‌‌র ১১ মে–‌র সংখ্যায় ডক্টর দেবী শেঠী যে রণকৌশলের কথা বলেছেন, তা মূলত মাইক্রো লেভেলে এই সন্ত্রাসকে আটকে রাখার পরামর্শ। তাতে রোগ প্রকট আকার ধারণ করলেও মৃত্যুর হার কমবে। ১৩ মে–‌র দৈনিক সংবাদপত্রগুলি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছে, করোনা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এই রাজ্য অষ্টম স্থানে আছে— আক্রান্তের দিক থেকে এই তথ্যটা ঠিক হলেও মৃতের সংখ্যা শুনলে এই রাজ্য চতুর্থ স্থানে আছে। তাই ‘‌কিউরেটিভ’‌ প্রক্রিয়ার চেয়ে ‘‌প্রিভেনটিভ’‌ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া সমীচীন হবে।
মাইক্রো লেভেলে ‘‌প্রিভেনটিভ’‌ প্রক্রিয়ার ইউনিট যদি একটা গ্রাম সংসদ হয়, তাহলে সেখানে পনেরোশো থেকে দু’‌হাজার জনসংখ্যা থাকা উচিত। অর্থাৎ প্রায় চারশো পরিবার। সেক্ষেত্রে সেখানে দু’‌জন আশাকর্মী ও চারজন অঙ্গনওয়াড়ি দিদির (‌ওয়ার্কার ও হেল্পার সহ)‌ থাকার কথা— ছ’‌জনের দল। অর্থাৎ এক একজনকে কমবেশি ৭০টি পরিবারকে নিরীক্ষণে রাখতে হবে। এর সঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সিএসপি–‌দের যদি যুক্ত করা হয় তাহলে মাথাপিছু পরিবারের সংখ্যা আরও কমে আসবে। তাদের রণকৌশল হিসেবে তিনটি দায়বদ্ধতা পালন করতে বলা যেতে পারে এবং তাহলে গোষ্ঠী সংক্রমণের ভীতিও এড়ানো যাবে বলে আমার ধারণা। (‌ক)‌ সতর্কীকরণ (‌খ)‌ চিহ্নিতকরণ (‌গ)‌ ব্যবস্থা গ্রহণ (‌নিভৃতাবাস/‌চিকিৎসা কেন্দ্র)‌।
প্রত্যেকের মাস্ক পরা, হাত ধোয়া ও সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা প্রথম ধাপ। কেউ কোনওভাবে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা (‌জ্বর, সর্দি, কাশি দেখে)‌ তা নজরদারি করা দ্বিতীয় ধাপ। আর কারও হয়ে থাকলে তাকে নিভৃতাবাসে বা চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো তৃতীয় ধাপ। পাশাপাশি আরএমপি–‌দের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করলে নিরীক্ষণের কাজটা মাইক্রো লেভেল থেকে মাইক্রোস্কোপিক লেভেলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।
রাজ্যে করোনা নিয়ে যে রাজনীতি শুরু হয়েছে তাতে স্বাভাবিকভাবেই মুখ্যমন্ত্রী অসন্তুষ্ট। গ্রামে পঞ্চায়েতি রাজের আশি শতাংশ পরিকাঠামো শাসক দলের নিয়ন্ত্রণে। কুড়ি শতাংশ হয়তো বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে আছে। এই পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে সংযোগ রাখার জন্য যদি নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্যকে নোডাল এজেন্টের দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাহলে এই কুড়ি শতাংশকেও এই ব্যবস্থায় যুক্ত করে সমালোচকদের যোগ্য জবাব দেওয়া যেতেই পারে।

জনপ্রিয়

Back To Top