শুভময় রায়: ‘‌তুমি কোন দিকে তাকিয়ে আছ, তার তুলনায় তুমি কী দেখছ, তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’‌ —হেনরি ডেভিড থরো

বর্তমানে সারা পৃথিবী যে মহামারীর জ্বরে আক্রান্ত, সেটি প্রথম মহামারী নয়। সম্ভবত শেষও নয়। মহামারী ছাড়াও আরও যেসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় গত দুটি দশক ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বারংবার ঘটে চলেছে, তার নিরীক্ষণ যে কোনও চিন্তাশীল মানুষের মনেই এই ভাবনার উদ্রেক ঘটাতে বাধ্য, যে এই ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ডের পরিণামে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। কিন্তু এই সব বিপর্যয় থেকে সামগ্রিকভাবে আমরা কি শিক্ষা নিচ্ছি? বোধহয় না। লকডাউন উঠতেই আবার আমাদের শহরে পরিচিত ছবিই চোখে পড়ছে। অর্থনীতির দোহাই দিয়ে পৃথিবী এবং পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বকে আমরা ক্রমাগত বিপন্ন করে তুলছি কিনা, সেই প্রশ্ন ওঠা উচিত। যে শিক্ষা এই বিষয়ে মানুষকে ভাবিত করতে পারে, সেই ভাবনার প্রভাবে নিজেদের প্রবৃত্তি ও ইচ্ছের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে শেখাতে পারে, আমাদের মধ্যে সেই শিক্ষার অভাব। অথচ মানব ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়, যারা বহুদিন আগে থেকেই আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে আরও সংবেদনশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
আজ থেকে চল্লিশ–পঁয়তাল্লিশ বছর আগে আমাদের শৈশবে গুরুজনদের মুখে মুখে যেসব উপদেশের পুনরাবৃত্তি শুনতাম, আর তা শুনতে শুনতে ক্রমশ কতগুলি ধারণা মনে গেঁথে যেত, তার মধ্যে একটা ছিল জীবনদর্শন সম্পর্কিত— যা একজন শিক্ষিত, আলোকপ্রাপ্ত মানুষ তাঁর সারা জীবন কীভাবে অতিবাহিত করবেন সেই বিষয়ে একটা ধারণা দিত। বলা হত, মানুষের জীবন হবে সরল–সাদাসিধে, কিন্তু তার মন বিচরণ করবে উচ্চমার্গীয় চিন্তাভাবনায়। পরে মনে হয়েছে, যে এই দুটি বিষয় পারস্পরিক সম্বন্ধযুক্ত। মানুষের মন তার চিন্তাভাবনার উৎস। জীবন যদি সরল না হয়, তাতে যদি ক্রমাগত জাগতিক অনুষঙ্গ যোগ হতে থাকে এবং তা ক্রমশ যদি মনকে বিক্ষিপ্ত করে তুলতে থাকে, তা হলে বোধহয় আমরা স্বাধীন চিন্তাভাবনার ইচ্ছে এবং অবকাশ দুইই হারিয়ে ফেলি। নিষ্ক্রিয় বিনোদনের আকর্ষণে কোনও বিষয়ে মাথা খাটানোর মতো তুলনামূলকভাবে কষ্টকর কাজগুলো আর আমাদের সেভাবে টানে না। এখন বাহ্যিক দিক থেকে আড়ম্বরহীন, সাদামাঠা জীবনের কথা বললে তা অনেকের কাছেই নেতিবাচক শোনায়, ওই ধারণায় বিশ্বাসীরা সমাজে অন্যদের কাছে অনুকম্পা বা ঘৃণার পাত্রও হয়ে উঠতে পারেন।
অথচ চিন্তার জগতে অনেক মহাপুরুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের জীবনশৈলীতে উপরোক্ত জাগতিক আড়ম্বরহীনতার সঙ্গে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মননের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকে আজকের পৃথিবীর বিচারে প্রায় অসামাজিক জীবন যাপন করেছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল কখনও–সখনও আমরা তাঁদের স্মরণ করি, তাঁদের ছবিও হয়তো দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখি, কিন্তু নিজের জীবনে তাঁদের দর্শনের বিন্দুমাত্র প্রতিফলন ঘটাতে আমরা হয় অপারগ অথবা অনিচ্ছুক। পার্থিব ধনে উদাসীন অথচ মননের জগতে উচ্চাসীন এই ধরনের মানুষের অভাব ভারতবর্ষে কোনও যুগেই ঘটেনি। কিন্তু অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ পাশ্চাত্যেও এই ধরনের মনীষীর সংখ্যা বিশেষ কম নয়। এমন অনেকেই আছেন যাঁদের জীবন উপরোক্ত উপদেশের সম্যক উদাহরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এই প্রসঙ্গে মার্কিন সর্বেশ্বরবাদী পথপ্রদর্শক হেনরি ডেভিড থরো'র (Henry David Thoreau) নাম প্রথমেই মনে পড়ে। আধুনিক সভ্যতায় জীবনযাত্রার যে কোনও মানের নিরিখে থরো–র জীবন বিষণ্ণ, অসফল একটি জীবন হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি ভিন্নতর কোনও ড্রামবাদকের ছন্দে পা মিলিয়েছিলেন! হার্ভার্ডের কলেজে ছাত্র অবস্থায় একটি বক্তৃতায় থরো বলেছিলেন: ‘‌আমাদের এই আশ্চর্য পৃথিবী যতটা সুবিধেজনক, তার চেয়ে বেশি চিত্তাকর্ষক, যতটা না ব্যবহারযোগ্য, তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। এ পৃথিবী তারিফ করার মতো, এর সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো, আমাদের ব্যবহারের জন্য নয়।’‌ ছাত্র থাকাকালীনই থরো তাঁর পরবর্তীকালে বিখ্যাত দিনলিপি বা জার্নাল লেখা শুরু করেন। আবহাওয়া থেকে শুরু করে পাখির বাসার বর্ণনা অথবা জীবনের অর্থ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা, কী নেই তাতে!
থরো তাঁর নিজের জীবন এমনভাবে পরিচালিত করতে পেরেছিলেন যে প্রতিদিন অপরাহ্নে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বনের মধ্যে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারতেন। প্রকৃতির এত গভীর পর্যন্ত তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে পরবর্তীকালের সব প্রকৃতিবিদ অনুপ্রেরণার জন্য তাঁকে অনুসরণ করেন। নাগরিক অধিকার, পরিবেশবিদ্যা, যুক্তিবাদী ধর্ম বিষয়ে তিনি পথিকৃৎ। ‘‌অধিকাংশ মানুষ তাঁদের জীবন নিরুক্ত হতাশায় অতিবাহিত করেন’‌ থরো–র এই উক্তিতে যেন আধুনিক মানুষের জীবনের সারাৎসার ধরা আছে। আর তাঁর নিজের জীবন সেই স্তব্ধ আশাহীনতাকে অতিক্রম করতে আমাদের পথ দেখায়।
কংকর্ডের ওয়াল্ডেন হ্রদের তীরে নিজের হাতে তৈরি কাঠের কেবিনে তিনি থাকতেন। নিজেই বলেছেন, ‘‌আমি ভ্রমণপিপাসু নই, কিন্তু কংকর্ডকে আমি ভাল চিনি।’‌ পায়ে হেঁটে বা নৌকোয় করে ঘুরতেন— কেপ কড, নিউ হ্যাম্পশায়ার, মিনেসোটা, কানাডা। ওয়াল্ডেন হ্রদের তীরের ওই জীবন, ওই এলোমেলো ভ্রমণ, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, গভীর অন্তর্বীক্ষণ— এই সব অভিজ্ঞতার ফসল তাঁর বিখ্যাত বই ‘‌ওয়াল্ডেন’‌ (১৮৫৪), যা মার্কিন ধ্রুপদী সাহিত্যের অঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়। মূল কথা হল ওয়াল্ডেন হ্রদের তীরে থরো–র কাঠের কেবিনে একাকী জীবনের উদ্দেশ্য ছিল জীবিকা নির্বাহ নয়, আত্মানুসন্ধান। তাই তিনি প্রকৃতি অবলোকনের পর্যাপ্ত সময় পেতেন। ওয়াল্ডেন হ্রদের প্রতিবেশের পুঙ্খানুপুঙ্খ ছিল তাঁর করায়ত্ত। বাকি সময় কাটত পড়াশোনো–লেখালেখি আর চিন্তাভাবনায়।
জীবিকা নির্বাহ করতেন সাময়িক ছোটখাটো কাজকর্ম করে— পেন্সিল তৈরি, জমি জরিপ, কখনও সখনও ছাত্র পড়ানো। কিন্তু তাঁর আসল কাজ ছিল নিজের এলাকার অরণ্য, নদী, প্রান্তরের প্রাকৃতিক ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, দর্শন আর অতীতের অন্বেষণ, অভিযাত্রীদের কাহিনি অধ্যয়ন, গভীর চিন্তাভাবনা, এমার্সন এবং অন্যান্য অতীন্দ্রিয়বাদী বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মূলত চিঠিপত্রের মাধ্যমে আলাপ–আলোচনা, ক্রীতদাসপ্রথা বিরোধী প্রবন্ধ রচনা— আর সর্বোপরি তাঁর ব্যক্তিগত দিনলিপিতে নিজস্ব পর্যবেক্ষণ আর পরীক্ষামূলক চিন্তাভাবনার প্রায় দৈনিক অবতারণা, যা পরবর্তীকালে হয়ে উঠবে প্রবন্ধ আর বইয়ের উৎস। জার্নাল–এর এই সব রচনায় ধরা আছে তাঁর ব্যক্তিগত একান্ত নিজস্ব জীবনের আখ্যান। দিনলিপিতে প্রকৃতি বিষয়ক তাঁর যাবতীয় পর্যবেক্ষণ ধরা থাকত, কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিস্তার তাঁর লক্ষ্য ছিল না, বরং ব্যক্তিগত সচেতনতার আরও গভীরে প্রবেশ করাই ছিল তাঁর অভীষ্ট। থরো যেন তাঁর দিনলিপি রচনার মধ্যেই ধরে রাখতেন বেঁচে থাকার অনুভূতি। লেখাপড়া তাঁর কাছে জীবনের বাইরের বস্তু না হয়ে জীবনেরই প্রসারিত অংশ হয়ে উঠেছিল। থরো–র কথায়, ‘‌একজন লেখক, যিনি লিখছেন, তিনি হলেন সমগ্র প্রকৃতির লিপিকর। তাঁর মধ্যে দিয়ে শস্যদানা, তৃণ, পরিবেশ সকলেই নিজের কথা বলছে।’‌
সম্ভবত তাঁর আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে থরো–র কোনও কোনও প্রতিবেশী তাঁকে অলস বলে মনে করতেন। যেহেতু এই অসম্ভব পরিশ্রমী মানুষটির অধ্যবসায় থেকে তাৎক্ষণিক কোনও উপার্জন বা জাগতিক সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল না, তাই তিনি অলস বলে পরিগণিত হতেন। ‘‌আমি চারিদিকে ঘুরে বেড়াই বটে, কিন্তু অলস নই।’‌ কংকর্ড–এর গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ঘুরে বেড়ানোই তাঁর কাছে ছিল প্রগাঢ় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতেই তিনি উপলব্ধি করেন যে এই ‘‌অরণ্য প্রকৃতিই হল পৃথিবীর রক্ষাকবচ’‌, আর ‘‌স্বর্গ যেমন আমাদের মাথার ওপরে আছে, তেমনি আছে আমাদের পায়ের তলায়’‌।
থরো–র পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রত্যুষে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি মানুষের পুনর্জন্ম ঘটে, যে মানুষের মধ্যে আছে ভবিষ্যতের বীজ। ‘‌যদি প্রতিটি দিবারাত্রিকে তুমি সানন্দ ও সাদর সম্ভাষণ জানাও, আর তোমার জীবনকে করে তুলতে পারো ফল আর সুগন্ধী গুল্মের মতো সুরভিত, যদি জীবন হয় আরও নমনীয়, আরও নক্ষত্রখচিত, আরও মৃত্যুঞ্জয়ী— তবে সেখানেই তোমার সাফল্য। সর্বত্র প্রকৃতির মধ্যে ধরা আছে তোমার অভিনন্দনবার্তা, আর সেই মুহূর্তে তুমি নিজেই নিজেকে আশীর্বাদ জানাচ্ছ।’‌ থরো বুঝেছিলেন যে মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান উপাদানগুলোই অস্বীকৃত থেকে যায়, আমরা তাদের সম্পর্কে প্রায়শই সচেতন থাকি না, অথবা অভিজ্ঞতা লাভের সঙ্গে সঙ্গেই তা ভুলে যাই। কিন্তু প্রকৃতি–পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে এই সচেতনতাই আমাদের মনুষ্যজীবনের পরমতম প্রাপ্তি। সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক, বাস্তব এই অভিজ্ঞতাগুলোর কথা মানুষ থেকে মানুষে সতত সঞ্চারিত হয় না। অথচ ব্যতিক্রমী এই মার্কিন দার্শনিক লিখছেন— ‘‌আমার দৈনন্দিন জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসল হল কতগুলো অনধিগম্য, অবর্ণনীয় মুহূর্ত, যেমন প্রদোষ আর সায়াহ্নের আকাশ। ওই আমার তারা থেকে খসে পড়া ধুলো, আমার রামধনুর একটা টুকরো।’‌
Plain living and high thinking–এর আদর্শে থরো যেন তাঁর জীবন গড়ে নিয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁর জীবন ছিল সরল আনন্দে পরিপূর্ণ। তাই তো যখন ওক গাছের কোনও কার্যকারিতা খুঁজে না পেয়ে এক চাষা তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘‌ওক গাছ কোন কাজে লাগে?’‌, তখন তিনি উত্তর দিতে পারেন, ‘‌বলো কী!‌ ওরাই তো আমার এলাকার মন্ত্রী, কোনওভাবেই ওদের নড়ানো যাবে না!’‌

জনপ্রিয়

Back To Top