অনিন্দ্য জানা: নেট–চরাচরে হাহাকার পড়িয়াছে। 
হাহাকার। কারণ, ৭৭ বছরের সেলিব্রিটি বৃদ্ধ এক অজ্ঞাতপরিচয়কে ‘ঠুকিয়া’ দিবার হুমকি দিয়াছেন প্রকাশ্যে। সোশ্যাল মিডিয়ায়। দিয়াছেন, কারণ সেই বেনামা তাঁকে বার্তা পাঠাইয়াছে, ‘তুমি কোভিডে মরো!’ মুম্বইয়ের হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ড হইতে করোনা–আক্রান্ত ‌বৃদ্ধ তাঁর মৃত্যুকামনাকারীকে সটান হুঁশিয়ারি দিয়াছেন, ‘দে রাইট টু টেল মি..‌ আই হোপ ইউ ডাই ইউথ দিস কোভিড। হে মিস্টার অ্যানোনিমাস, ইউ ডু নট ইভন রাইট ইওর ফাদার্স নেম। বিকজ ইউ ডু নট নো হু ফাদার্ড ইউ। ওহে শ্রী অপরিচিত, তুমি তো তোমার বাবার নামটাও লেখো না। কারণ, তুমি তো জানোই না তোমার বাপ কে।’ 
এই বেনজির গোলাবর্ষণে চরাচরে হাহাকার পড়িয়াছে। নেট–দুনিয়া স্তম্ভিত। হতবাক। বীতশ্রদ্ধ। সত্যই, যিনি জনসমক্ষে কথা বলিবার সময় ‘দেবীওঁ অওর সজ্জনোঁ’ বলিয়া সম্মুখস্থ শ্রোতৃমণ্ডলীকে সম্বোধন করিয়া থাকেন, তঁার লিখনে এ কী ভাষা!‌ এ কেমন বিষোদ্গার!‌ 
নিজের বিখ্যাত এবং বহুপঠিত ব্লগপোস্টে ইংরাজিতে লিখিত দীর্ঘ হুমকিতে অজ্ঞাতপরিচয়কে ‘ইউ’ সম্বোধন করিয়াছেন বৃদ্ধ। এর বঙ্গানুবাদ ‘আপনি’ হইতে পারে না। দুন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রের সহবতবোধ প্রবাদপ্রতিম। কিন্তু অমনও নয় যে, তিনি সম্মানের ‘আপনি’ সম্বোধন করিয়া গুলি করিবার হুমকি দিয়া কাউকে লিখিবেন ‘ঠোক দো সালে কো’। বরং ঘৃণাসঞ্জাত এবং কিঞ্চিৎ দূরবর্তী ‘তুমি’টিই বেশি প্রযোজ্য বলিয়া মনে হয়। অতএব এই উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে কবি হরিবংশ রাই বচ্চনের জ্যেষ্ঠপুত্রের ক্রুদ্ধবচনের অনুবাদটিতে সম্বোধনে ‘তুমি’ই রহিল। 
নানাবতী হাসপাতালের রোগশয্যা হইতে অমিতাভ বচ্চন যে ব্লগে ওই হুঁশিয়ারি দিয়াছেন, তার ছত্রে ছত্রে বিচ্ছুরিত ক্রোধ এবং ঘৃণা। কান পাতিয়া শুনিলে সাতের দশকের ‘জঞ্জির’ বা ‘দিওয়ার’–এর অ্যাংরি ইয়ং ম্যানের ব্যারিটোনটি নির্ভুল শোনা যায়। শোনা যায় হিলহিলে চেহারার তরুণ পুলিশ অফিসারের ইস্পাতসদৃশ কণ্ঠ, যে এত্তেলা পাইয়া থানায় হাজিরা দিতে আসা এলাকার দোর্দন্ডপ্রতাপ ডন শের খান অতি প্রগলভতা দেখাইয়া চেয়ার টানিয়া বসিতে যাওয়ায় সজোর পদাঘাতে সেটি ছিটকাইয়া দিয়া বলিয়াছিল, ‘যব তক ব্যয়ঠনে না কহা যায়ে, শরাফত সে খাড়ে রহো। ইয়ে পুলিশ স্টেশন হ্যায়। তুমহারা বাপ কা ঘর নহি।’ শোনা যায় সেই সমাজবিচ্যুত, ক্রুদ্ধ এবং আত্মাভিমানী যুবকটির স্বর, যে অপরাধ জগতে তার বস্‌কে বলিয়াছিল, ‘ম্যায় আজ ভি ফেকে হুয়ে প্যায়সে নহি উঠাতা।’ 
তিনি ছিলেন অ্যাংরি ইয়ং ম্যান। যিনি পর্দায় কোনওপ্রকার অবমাননা সহ্য করিতেন না। ইনি অ্যাংরি ওল্ড ম্যান। যিনি ব্যক্তিজীবনে কোনও কিসিমের ননসেন্স সহন করিতে পারেন না। রক্তের তেজ কমিয়াছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। দেহে নানা রোগের বাস। কিন্তু কোনও অজ্ঞাতকুলশীল তাঁর মৃত্যুকামনা করিলে তিনি এখনও আগের মতোই গর্জন করিতে পারেন। এবং করেন। যখন করেন, তখন ‘সরকার’–এর সুভাষ নাগরের হিমশীতল কণ্ঠ মনে পড়িয়া যায়, ‘ম্যায় ইয়ে জরুর মানতা হুঁ কে ম্যায় কঁয়ি অ্যায়সে কাম করতা হুঁ, যিন্‌হে কানুনি নহি কহা যা সকতা। ওহ্‌‌ ইস লিয়ে হ্যায় কি, মুঝে যো সহি লগতা হ্যায়, ম্যায় করতা হুঁ। ওহ্‌ চাহে ভগওয়ান কে খিলাফ হো, সমাজ কে খিলাফ হো, পুলিশ–কানুন ইয়া ফির পুরে সিস্টেম কে খিলাফ কিঁউ না হো।’
সম্ভবত সেই ‘সরকার’–ই ব্লগপোস্টে চাঁছাছোলা লিখিলেন, ‘দুটো জিনিস হতে পারে। হয় আমি বেঁচে থাকব। নয় মারা যাব। আমার মৃত্যু হলে তুমি আর সেলিব্রিটির নাম নিয়ে নিজের ক্ষোভটা জানাতে পারবে না। তোমার জন্য করুণা হচ্ছে। তোমার লেখা এত গুরুত্ব পাওয়ার কারণ তো অমিতাভ বচ্চন। যার উপর তোমার এত বিরক্তি আর রাগ, সে–ই তো তখন আর থাকবে না। কিন্তু উপরওয়ালার দয়ায় আমি বেঁচে ফিরলে ক্রোধের ঝড় থেকে তুমি রেহাই পাবে না। আর সেটা একা আমার ক্রোধ নয়। খুব কম করে বললেও আমার ৯ কোটিরও বেশি অনুগামীর ক্রোধ। আমি এখনও তাদের কিছু বলিনি। কিন্তু বেঁচে থাকলে তো বলবই। তোমায় বলে রাখি, এরা কিন্তু একটা বিশাল শক্তি। যারা গোটা পৃথিবী নড়িয়ে দিতে পারে। পশ্চিম থেকে পূর্ব, উত্তর থেকে দক্ষিণ। আর এরা শুধু আমার পেজের অনুগামী নয়। এরা আমার বর্ধিত পরিবার। যারা চোখের পলক ফেললে একটা আস্ত ঘাতক শক্তিতে বদলে যেতে পারে। শুধু আমায় একবার বলতে হবে, ঠোক দো সালে কো।’
এরপর বাছাই রাষ্ট্রভাষায় বৃদ্ধ লিখিয়াছেন, ‘তুমি মারীচ, অহিরাবণ, মহিরাবণ, অসুরের উপনাম। আমাদের কাজ শুরু হলেই তুমি ওই রাক্ষসদের মতো দগ্ধাবে। এটা জেনে রাখো, শুধু তুমি এই সমাজের কণ্ঠস্বর নও। তুমি একটা চরিত্রহীন, অবিশ্বাসী, শ্রদ্ধাহীন কীট। নির্লজ্জ, বেহায়া, সমাজের কলঙ্ক— জ্বলো, গলে যাও, পচে যাও।’
অন্তিম চরণ আবার ইংরাজিতে, ‘মে ইউ বার্ন ইন ইওর ওন স্টু।’
চরাচরে হাহাকার পড়িয়াছে। 
জুলাই মাসের ১১ তারিখে করোনাক্রান্ত হইয়া যখন তিনি সপুত্র হাসপাতালে ভর্তি হইলেন এবং নিজেই সমাজমাধ্যমে সে খবর জানাইলেন, চরাচর সচকিত হইয়াছিল। গভীর রাতে টেলিফোনে বিশ্রম্ভালাপের অবসরে অনুজ সহকর্মীকে বলিয়াছিলাম, ‘এতদিনে করোনা জাতে উঠল। রোগটা ব্রাহ্মণত্ব পেল।’ সে বলিল, ‘ঠিক বলেছো। অ্যাদ্দিনে করোনার পৈতে হল।’ 
সেদিনও চরাচরে হাহাকার পড়িয়াছিল। এখন আবার পড়িয়াছে। কারণ, এক প্রায়–অশীতিপরের গনগনে ক্রোধের আঁচ ধরিত্রীকে তপ্ত করিয়াছে। 
১৯৮২ সালে বাঙ্গালোরে ‘কুলি’ ছবির সেটে অনামী অভিনেতা পুনিত ইসারের মুষ্ট্যাঘাতে পতনশীল অমিতাভ একটি লৌহমেজে ধাক্কা খান। প্রথমে সুপারস্টারসুলভ তাচ্ছিল্য দেখাইলেও পরে অন্ত্রে অবিরল রক্তপাতে অবস্থা ক্রমশ সঙ্গিন হইতে থাকায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এবং বচ্চনদের পারিবারিক সুহৃদ ইন্দিরা গান্ধীর তৎপরতায় চল্লিশ বছরের তারকাকে উড়াইয়া আনা হয় বম্বের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে। জীবন–মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দোদুল্যমান নক্ষত্রের আরোগ্যকামনায় আসমুদ্রহিমাচল পূজাপাঠে রত হয়। অমিতাভ পরপারের বিপদঘন্টিটি স্বহস্তে বাজাইয়াও স্বমহিমায় ফিরিয়া আসেন। 
আরবসাগর তীরে প্রায় চার দশক অতিক্রান্ত। পেশাগত জীবনে দেউলিয়া হইয়াও অমিত শক্তিধর ফিরিয়া আসিয়া হিন্দি ছবির জগতে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে স্বীয় মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত। জীবনের উল্লেখযোগ্য মাইলফলকে লিখিত আছে রাজনীতি এবং রাজনীতি–ত্যাগ, দেশের সর্বাধিক ক্ষমতাধর পরিবারের বন্ধুত্ব এবং বন্ধুত্ব–ত্যাগ, নায়ক হইতে চরিত্রাভিনেতায় সরণ এবং টেলিভিশনে দেশের ‘স্নেহশীল বড়দা’ হইয়া ছিন্নমূল, প্রান্তিক এবং সাধারণস্য সাধারণকে কোটিপতি করিবার আন্তরিক প্রয়াস। তাঁর হাত ধরাধরি করিয়া হাঁটিয়াছে বয়স। সময় তাঁকে প্রপিতামহ করিয়াছে। একদা অধরা তিনি অধুনা সমাজমাধ্যমে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়া থাকেন। পরবর্তী প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করিয়া থাকেন। নিজের অভিমত নিজস্ব অবসর এবং পরিসরে ব্যক্ত করিয়া থাকেন। 
এমনই মৃদুমন্দ প্রবাহে দিন অতিবাহিত হইতেছিল। অকস্মাৎ একাধিক কো–মর্বিডিটির বাহক সাতাত্তর বছরের অমিতাভ প্রতিষেধকহীন অতিমারীতে আক্রান্ত হইয়া পুনরায় হাসপাতালবাসী হইলেন। তফাত হইল, এই পর্যায়ে চিকিৎসকেরা অহরহ জানাইতে থাকিলেন, তাঁর জীবনসঙ্কট নাই। মৃদু উপসর্গ রহিয়াছে বটে। কিন্তু চিকিৎসায় সাড়াও মিলিতেছে। উদ্বেগ, আতঙ্ক বা শঙ্কার কোনও কারণ নাই। কিন্তু জীবন গিয়াছে চলে সাঁইত্রিশ বছরের পার!‌ যে দেশ একদা তঁার আরোগ্যকামনায় উদ্বেল হইয়াছিল, সে দেশেরই কোনও এক অর্বাচীন বৃহত্তম সেলিব্রিটিকে সরাসরি বার্তা পাঠাইয়া তঁার মৃত্যুকামনা করিতেছে। 
ভদ্রতা এবং সহবতের চলমান প্রতিরূপ, তুঙ্গ সংস্কৃতিমান, জীবনের বহুবিধ উত্থানপতনেও স্থিতধী ও সমাহিত বৃদ্ধ অভূতপূর্ব ভাষায় তার প্রত্যুত্তর দিয়াছেন। ইংরাজি দৈনিকে জনপ্রিয় কলামলেখক লিখিয়াছেন, ‘অমিতাভ বচ্চন হিট্‌স ব্যাক।’ যে নিবন্ধের প্রেক্ষিতে তুলনায় নবীন সাংবাদিক টুইট করিয়াছেন, ‘কমপ্লিটলি ডিজেগ্রি। দ্য আউটবার্স্ট শুড বি কল্‌ড আউট ফর ইট্‌স পেটিনেস, রিগ্রেসিভ ইনসাল্ট অ্যান্ড ভায়োলেন্ট থ্রেট। কান্‌ট বি কনডোন্‌ড। কান্‌ট বি গিভ্‌ন আ পাস জাস্ট বিকজ হিজ ওয়ার্ক ব্রিংগস জয় টু মিলিয়ন্‌স।’ অমিতাভ বচ্চনের কনিষ্ঠ অঙ্গুলির নখাগ্রেরও অসমতুল বাচাল উচ্চৈস্বরে বলিতেছে, ‘ওকে তো অ্যারেস্ট করা উচিত!‌’
অমিতাভ বচ্চন কি ভুল করিয়াছেন?‌ সেলিব্রিটির আস্তরণটি সরাইয়া দেখি তো!‌ ঈশ্বর না করুন, যদি আমাদিগের কারও ৭৭ বছরের বৃদ্ধ পিতা বা পিতামহ করোনায় আক্রান্ত হইতেন এবং কেহ তাঁকে বার্তা পাঠাইয়া মৃত্যুকামনা করিত এবং তিনি এইভাবেই তাঁর অগ্নিগর্ভ প্রতিক্রিয়া ‌সর্বসমক্ষে ব্যক্ত করিতেন?‌ তখন সবজান্তা আন্তর্জালিকেরা 
তঁাহাকে প্রতি আক্রমণ করিলে সমর্থন করিতাম?‌ হয়তো বলিব, ক্রোধের এমন বহিঃপ্রকাশ বচ্চন শিরোভূষণকে শোভা দেয় না। তিনি হইলেন আইকন। সেলুলয়েড ব্যতীত তাঁহার ক্রুদ্ধ হইবার অধিকার নাই। বরং ‘মোহাব্বতেঁ’ ছবির গুরুকুলের প্রধান হিসাবে কথিত তাঁরই সংলাপ ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ই তঁার অভ্যাস করা উচিত ছিল।‌ 
কিন্তু আইকন–সম্মানটি তো কেহ রূপার রেকাবিতে বহন করিয়া স্বর্ণচমসে তাঁর অধরে তুলিয়া দেয় নাই। তিনি যা হইয়াছেন, যা করিয়াছেন, তা স্বোপার্জিত। নাকি সেলিব্রিটি হইলে বা জীবনে কিঞ্চিদধিক সাফল্য পাইলেই যাবতীয় দুর্বিনীত অভদ্রতাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখিতে হয়?‌ অবজ্ঞা করিতে হয়?‌ 
হয় না। কারণ, অসূয়াপ্রবণরা সহবত এবং ভদ্রতাবোধকে অহরহ দুর্বলতা ভাবিয়া নেয় এবং বিষধর কলমটি অধিক উৎসাহভরে বিষের থলিতে পুনরায় ডুবাইয়া লয়। কোথাও না কোথাও তাহাদের পাল্টা কশাঘাত করিতে হয়। অবাধ, অসংযত এবং যথেচ্ছাচারীকে বল্গাহীন হইতে দেওয়া অবিমৃশ্যকারিতা। 
হাসপাতালের রোগশয্যায় একাকী বৃদ্ধ নির্ভুল জানিয়াছিলেন, সময়ের দাবি এবং সম্মানের অবমাননায় সেলিব্রিটির আলখাল্লাটি কখনও সখনও খুলিয়া এবং চিত্রনাট্যকে অতিক্রম করিয়া ব্যক্তিজীবনে প্রতিস্পর্ধীর মতো দাঁড়াইতে হয়। গত রবিবার বৃদ্ধের করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসিয়াছে। তিনি আবার ‘জলসাধীন’। এখন দেখার, বাঁচিয়া ফিরিবার পর তিনি ‘ঠোক দো’ নির্ঘোষ তাঁর অনুগামীকুলে ছড়াইয়া দেন কিনা। 
নেট–চরাচর হাহাকার করুক। ভুক্তভোগীদের চরাচর ‘সরকার’–কে কুর্নিশ করিতেছে।

জনপ্রিয়

Back To Top