রাজীব ঘোষ: চাহিদা বেশি আর সরবরাহ কম থাকলে দাম বেশি হবে— এটাই ব্যবসার মূল কথা। ভারতে মোবাইল যখন প্রথম এল, তখন এক মিনিট কথা বলতে ১৬ টাকা লাগত। ফোন এলেও একই খরচ। ধীরে ধীরে বহু কোম্পানি এল টেলিকম ব্যবসায়— ফোনের খরচ নেমে দাঁড়িয়েছে মিনিটে কয়েক পয়সায়। কিন্তু আজ যে পরিস্থিতি, তাতে বাজারে মনোপলি না হোক, ডুয়োপলি তৈরি হতে চলেছে, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি মাশুল বৃদ্ধি। অথচ প্রথম যুগের মতো মোবাইল এখন আর নিছক কথা বলার যন্ত্র নেই, এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের রুটি–রুজির সংস্থান হচ্ছে ওই মোবাইল থেকেই। খাবার, পোশাক, যানবাহনের পরিষেবা তো বটেই লক্ষ লক্ষ মিস্ত্রি–কারিগর ওই মোবাইলের জোরে খদ্দেরের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছেন। সারা দেশে মিনিটে বহু কোটির ব্যবসা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া সৃষ্টিশীল কাজের কদর দিচ্ছে, বহু মানুষ উপার্জন করতে পারছেন। মোবাইলকে ঘিরে সমান্তরাল এই অর্থনীতির যথার্থ পরিসংখ্যান বোধহয় ভারত সরকারের হাতেও নেই। মোদ্দা কথা, ভোডাফোন যদি দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা গোটাতে বাধ্য হয়, তাহলে আরও গভীর গাড্ডায় পড়বে ভারতের অর্থনীতি। বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্কে আমার–আপনার গচ্ছিত রাখা টাকা ডুবে যাবে। সরাসরি বেশ কয়েক হাজার মানুষ চাকরি হারাবেন, পরোক্ষভাবে কর্মহীন হবেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। বিএসএনএল এবং এমএনটিএল ‘‌বধ’‌ হয়েই গেছে, মোবাইল বাজারে তারা চুনোপুঁটি, আর সরকারের খাঁই মিটিয়ে কোনওমতে বাজারে ভেসে থাকবে এয়ারটেল। তাহলে?‌ বাজারে কার্যত একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম হবে একটি কোম্পানির। তারাই ঠিক করে দেবে আপনি মোবাইলে কতক্ষণ কথা বলবেন, কী দেখবেন, কী শুনবেন— ইত্যাদি ইত্যাদি। আপনার চলাফেরার নিয়ন্ত্রক হবে সেই কোম্পানিই। তাছাড়া বাজারের স্বাভাবিক নিয়মেই বিপুল চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না দুটি কোম্পানি। ফলে মোবাইলের খরচ বাড়বে, পরিষেবার মান কমবে। ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন যিনি বেচছেন, তিনি ৫জি পরিষেবাও চালু করতে পারবেন না। আর সবথেকে বড় কথা, মোবাইল অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যেতে পারে।
এই সঙ্কটের মূলে তথাকথিত সেই ২জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি। পুরোটাই কল্পিত। ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির কাহিনি ছড়িয়ে মনমোহনকে কলঙ্কিত করে কারা ভোটের বাজারে ফায়দা তুলেছিল তা আজ সবারই জানা। টেলিকম মন্ত্রী এ রাজা জেল খেটেছিলেন, সিবিআই আদালতই তাঁকে মুক্তি দেয়। মেনে নেওয়া হয় কোনও আর্থিক দুর্নীতি প্রমাণিত নয়। তখন স্পেকট্রাম আর লাইসেন্স দেওয়া হত ‘‌আগে এলে আগে পাবে’‌ ভিত্তিতে। সেখানে নাকি প্রভাব খাটিয়ে কেউ কেউ ফায়দা তুলেছিল। হতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট ওই পদ্ধতিতে বিলি হওয়া সব লাইসেন্স বাতিল করে দিয়ে নিলামের পদ্ধতি চালু করে দিল। স্বভাবতই নিলামে তাবড় কোম্পানির সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে ছোটখাট কোম্পানি পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হল, কিংবা বড় কোম্পানি তাদের গিলে খেল। এমটিএস, এয়ারসেল, আইডিয়া, টাটা ডোকোমো— এমন উদাহরণ অসংখ্য। আর বড় বড় কোম্পানি মওকা বুঝে বিপুল পরিমাণ স্পেকট্রাম দখল করল, যা তারা পুরোটা ব্যবহারও করতে পারেনি। তার একটাই কারণ, এই টাকা সরকারকে সঙ্গে সঙ্গে মিটিয়ে দিতে হয় না। পরে যা হয় দেখা যাবে— এই ধারণায় এতদিন টেলি–কোম্পানিরা সরকারকে টাকা দেয়নি। সুদে–আসলে বেড়েছে সরকারের পাওনা, চক্রবৃদ্ধি হারে।
আজ ভারতের টেলিকম ব্যবসার ঘাড়ে ১.‌৫ লক্ষ কোটির দেনা। তার মূলে রয়েছে সরকারের লোভ। ‘‌এজিআর’‌ অর্থাৎ অ্যাডজাস্টেড গ্রস রেভিনিউ। সহজ করে বললে, সেই কোম্পানির সব ধরনের ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থের হিসেব। ধরা যাক কোনও টেলি–কোম্পানি ফোন মাশুল বাবদ ১০০ টাকা আয় করল, আর নিজস্ব বাড়ি–ঘর–সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে ১০০০ টাকা আয় করল। এজিআর অনুযায়ী তাদের ১১০০ টাকার ওপরেই সরকারকে ফি দিতে হবে। ভারত সরকারের কোম্পানি গেল, তারাও টেলি–লাইসেন্স নিয়েছিল। কিছু কিছু অপটিক্যাল ফাইবার কেব্‌ল পেতেছিল। সব মিলিয়ে টেলিকম থেকে তাদের আয় ৩৫ কোটি, কিন্তু আসল ব্যবসার আয় হাজার হাজার কোটি। এবার ফি দাঁড়িয়েছে হাজার কোটির হিসেবেই!‌ গেল না হয় সরকারের কোম্পানি, সরকার তাদের ‘‌ঋণ’‌ দিয়ে মিটিয়ে নেবে, কিন্তু ভোডাফোনের কী হবে?
আসল কথা, মোদি সরকারের ‘‌ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’‌ কথাটা ফাঁকা আওয়াজ মাত্র। একটার পর একটা টেলি–কোম্পানি পাততাড়ি গুটিয়েছে, কেন্দ্র নীরব দর্শক!‌ আইএলএফএস সঙ্কটেও চুপ। চোখের সামনে জেট এয়ারওয়েজ বন্ধ হয়ে গেল। আন্তর্জাতিক বাজারে কী বার্তা গেল?‌ আসলে এই টেলি–সঙ্কট ডেকে আনল সরকারের সীমাহীন লোভ, টাকার খাঁই। নাকি কোথাও বাঁধা আছে টিকি?‌ সরকার পাওনা আদায়ে সুপ্রিম কোর্টে গেল কেন?‌ আদালত তো নিয়ম মেনেই চলবে। বিচারপতি অবিলম্বে পাওনা মেটাবার হুকুম দিয়েছেন, সরকারি অফিসার তবু হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন। সেই অফিসারের আদালত অবমাননার দায়ে হয়তো জেল হবে, কিন্তু তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করেই নীরব ছিলেন।
আজ ভোডাফোন ডুবলে নিজে ডুববে না, ভারতের অর্থনীতিকে নিয়েই ডুববে। এই সার সত্যটুকু উপলব্ধি করার ক্ষমতাও এ দেশের অর্থমন্ত্রী বা টেলিকম মন্ত্রীর নেই। অবিলম্বে অর্ডিন্যান্স আনুক সরকার, সংসদে বিল এনে লাইসেন্স পদ্ধতির বদল আনুক। বলে দিক, আগের পদ্ধতিতে কোনও সমস্যা ছিল না। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই। কথায় বলে, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। সেই অবস্থাই হয়েছে দিল্লি বাহাদুরের।‌

জনপ্রিয়

Back To Top