রাজীব ঘোষ: ‌সুখবীর সিং বাদলের আমও গেল, ছালাও গেল!‌ 
কৃষি সংস্কার নিয়ে অধ্যাদেশ যেদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় এল, হরসিমরত কউর বাদল সেদিনই বেরিয়ে এলে বোঝা যেত রাজনৈতিক বোধবুদ্ধি এখনও কিছুটা অবশিষ্ট আছে সুখবীরের। বাস্তবে তা ঘটেনি, শুধু তাই নয়, যেদিন মন্ত্রিসভায় বিল এল, সেদিনও হরসিমরত হাজির। তখনও সুখবীর ভাবছিলেন এতদিনের পুরনো শরিককে বিজেপি শেষ পর্যন্ত যেতে দেবে না, হরসিমরতকে সরিয়ে চাপ দিলেই বিল সিলেক্ট কমিটিতে পাঠিয়ে তঁার মান বঁাচিয়ে দেবে। ভুল ভেবেছিলেন। দেখা যাচ্ছে, উদ্ধব ঠাকরে তঁার থেকে অনেক বেশি পরিণত রাজনীতিবিদ। বাজপেয়ী–‌আদবানি যুগ পেরিয়ে বিজেপি–‌র আগ্রাসী চেহারাটি তিনি আগেই চিনতে পেরেছিলেন।
প্রকাশ সিং বাদল ছিলেন এনডিএ গড়ার অন্যতম রূপকার। বাজপেয়ী, আদবানি, যশবন্তরা তঁাকে গুরুত্ব দিতেন। পাঞ্জাবে বিজেপি পেত হিন্দু ভোট, অকালি দলের হাতে ছিল জাঠ আর শিখ ভোট। শিরোমণি অকালি দল ‘‌পন্থিক’‌ আদর্শে–‌গড়া, আদ্যন্ত ধর্মীয় আদল। দলের শীর্ষে বসতে অমৃতধারী শিখ হতে হয়, দস্তুরমতো দীক্ষা নিতে হয়। সুখবীর সিং বাদলও তার ব্যতিক্রম নন। শুধু দেখা গেল, বাবার কাছে রাজনীতির দীক্ষা আর পাঠ নিতেই তিনি ভুলে গিয়েছেন। কারণ, একটাই। অকালি দলের ভোট ব্যাঙ্ক এখন ক্ষয়িষ্ণু। ২০১৪ ও ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে তুমুল বিজেপি ঝড়েও দুটির বেশি আসনে জিততে পারেনি তারা। ১৩ টি আসনে লড়ে সেই ফিরোজপুর আর ভাটিন্ডা, পারিবারিক সীমানার মধ্যেই বঁাধা পড়ে রয়েছে বাদল–‌পরিবারের প্রতিপত্তি। অমৃতসর থেকে অরুণ জেটলি আর হরদীপ সিং পুরীকে জিতিয়ে আনতে পারেনি অকালি দল। তখনই মোটামুটি তাদের ভবিষ্যৎ ঠিক হয়ে গিয়েছিল বিজেপি–‌র অন্দরে।
অকালি দলের ভোট বিজেপি–‌তে যায়নি, তাই তাদের বলি দিতে হাত কঁাপেনি মোদি–‌শাহদের। সত্যি বলতে কী, মদনলাল খুরানার মতো ম্যানেজার নেই এখন, তাই শহুরে বর্ণহিন্দুদের ভোটও অকালিরা পায়নি। বিজেপি–‌অকালি জোট হয়ে উঠেছিল ‘‌ম্যারেজ অফ ইনকনভিনিয়েন্স’‌। বৃহত্তর প্রেক্ষিতে দেখলে ২০১৪ সালে ৩১.‌৩৪ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি একাই গরিষ্ঠতা পেয়েছিল। এনডিএ পেয়েছিল ৩৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে ৩৭.‌৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি, আসন একাই ৩০০। এই বিজেপি একচ্ছত্র হতে চাইবে, কংগ্রেসের মতো ৪০০ আসনে পৌঁছে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকবে, এতে অন্যায় নেই। সমস্যা শরিকদের। দেওয়াল লিখন আগেই পড়তে পেরেছিলেন উদ্ধব। মহারাষ্ট্রে বড় শরিক শিবসেনাকে গিলে খাচ্ছিল বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী না হতে পারলে শিবসেনা দলটাই টিকিয়ে রাখতে পারতেন না উদ্ধব। ভুলটা অবশ্য করেছিলেন বালাসাহেব। হঠাৎ মারাঠি অস্মিতা ছেড়ে তিনি ‘‌হিন্দুহৃদয়সম্রাট’‌ হয়ে উঠতে চাইলেন। মহারাষ্ট্রবাদ ছেড়ে হিন্দুত্ববাদে যাওয়াই তঁার কাল হয়েছিল। জমিটাই কেড়ে নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। যে ভুলটা দ্রুত শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করছেন উদ্ধব–‌আদিত্যরা। কংগ্রেস যখন বড় ছিল তখন তাদের বিরুদ্ধে জোট গড়া অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। মহারাষ্ট্রে একটা নিরীক্ষাই চলছে বলা যায়।
এই বাস্তবতা বুঝতে পারেননি সুখবীর। যখন দেখলেন চাষিদের অবরোধে নিজের গ্রামের বাড়িতেই ঢুকতে পারছেন না, তখন টনক নড়ল। ফুড প্রসেসিং মন্ত্রক নিয়ে পাঞ্জাবে ‘‌চাটনি–‌আচার–‌মোরব্বা’‌ বলে রসিকতা করা হয়। তাছাড়া বাদল পরিবারের স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে অনেকেরই। কংগ্রেসের পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে উদয়াস্ত গাল দেয় যে বিজেপি, তারা ঠাকরে ও বাদল পরিবারকে ঝেড়ে ফেলতেই স্বস্তি পেয়েছে। ব্যাপারটা বিহারে চিরাগ পাসোয়ানও বিলক্ষণ টের পেয়েছেন। অত্যন্ত জরুরি না হলে শরিকদের ঘাড়ে করে বয়ে বেড়ানোর দায় বিজেপি আর নেবে না। যেখানে সংগঠন নেই, সেখানে নিজেদের বাড়িয়ে নেওয়ার এই তো সময়।
পাঞ্জাবের নির্বাচন ছিল দ্বিমুখী। আপ–‌কে ধরলে ত্রিমুখী। এবার আরও ঘুলিয়ে গেল। কংগ্রেস, বিজেপি, অকালি, আপ। এখনও শিখ, বিশেষ করে দলিত শিখদের ভোটে কংগ্রেসের আধিপত্য। তবে খেলাটা জমবে। বাদলের দলের কাছে এখন পাঞ্জাবে দঁাড়িয়ে ভোট চাওয়া দুষ্কর হবে। ‘‌ন্যূনতম সংগ্রহ মূল্য আছে, থাকবে’‌ বলে বিজেপি চিৎকার জুড়লেও, বাস্তবতা হল, মাত্র ৬%‌ ফসল ওই দামে বিক্রি হয়, বাকি ৯৪%‌ স্রেফ লুটপাট হয়। এখনও তাই হবে। অর্থাৎ ন্যূনতম সংগ্রহমূল্য ঘোষণা নয়, অধ্যাদেশ এনে সরকার যদি বলে দিত এর থেকে কম দামে ফসল কিনলে জেল হবে, তা হলে বোঝা যেত।
উদ্ধবরা তবু তো ভেসে আছেন, বাদলরা স্রেফ ডুবে গিয়েছেন।

জনপ্রিয়

Back To Top