সংবাদ সংস্থা, মিনিয়াপোলিস: করোনা ভাইরাস সংক্রমণে বিধ্বস্ত আমেরিকা। তারই মধ্যে পুলিশি নির্যাতনে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে আমেরিকা। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে উন্মত্ত প্রতিবাদে। আই কান্ট ব্রিদ— মৃত জর্জ ফ্লয়েডের এই কথাগুলোই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদীদের স্লোগান। আমেরিকা জুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়েছে অন্তত ৭৫টি শহরে। ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ও বোতল বৃষ্টি, পুলিশের গাড়িতে আগুন, দোকানপাটে আগুন ও লুঠপাট— ১২টির বেশি বড় শহর–‌সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে। নানা শহরে নামানো হয়েছে ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীকে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে পুলিশ। রবার বুলেটে আহত হয়েছেন এইচবিও চ্যানেলের সিরিজ ‘‌ইনসিকিওর’‌–‌এর অভিনেতা কেনড্রিক স্যাম্পসন। পুলিশের লাঠিও লেগেছে তাঁর গায়ে। ফ্লয়েডের ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন অভিনেত্রী লেডি গাগা, রিহানা, ডয়নে জনসন, সেলিনা গোমেজ–‌সহ অন্যরা।
গত সোমবার মিনিয়াপোলিসে প্রকাশ্য রাস্তায় একজন পুলিশ অফিসার হাঁটু দিয়ে গলা চেপে ধরেন ৪৬ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের। তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন যে, তাঁর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এর পরেও চাপ আলগা করেননি ওই অফিসার। দমবন্ধ হয়ে ফ্লয়েডের মৃত্যু হয়। খুব দ্রুত মোবাইলে তোলা ফ্লয়েডের মৃত্যুর দৃশ্য ভাইরাল হয়। তার পরেই প্রতিবাদে মিনিয়োপোলিসের রাস্তায় নামেন মানুষ। দিন কয়েকের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। বৃহস্পতিবার আগুন লাগানো হয় মিনিয়াপোলিসের একটি থানায়। শুরু হয় দোকানপাট ভাঙচুর ও লুঠপাট। পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে পথে নামেন আফ্রিকান আমেরিকানরা। কার্ফু অস্বীকার করে শুক্র ও শনিবার প্রতিবাদ ও হিংসা ছড়িয়ে পড়ে দেশ জুড়ে।
বিক্ষোভকারীদের উসকানি দেয় ট্রাম্পের মন্তব্য। শুক্রবার তিনি টুইট করেন,‌ ‘‌লুঠ শুরু হলে গুলি (‌শুট)‌ শুরু হবে।’ শনিবার হোয়াইট হাউসের সামনে জমায়েত হওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর ‌‘হিংস্র কুকুর’ ও ‌‘ভয়ঙ্কর অস্ত্র’ প্রয়োগের হুমকি দেন। এতেই পরিস্থিতি আরও তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ‌‘মহামারী ও অর্থনীতির সঙ্কটে আমরা ব্যতিব্যস্ত। তবে মনে রাখতে হবে, লক্ষ লক্ষ আমেরিকানকে স্রেফ বর্ণের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। এটা ট্র্যাজিক ও বেদনাদায়ক। স্বাস্থ্য পরিষেবা, অপরাধীর বিচার, রাস্তায় জগিং করা কিংবা পার্কে বসে থাকা— সর্বত্রই এই বিভাজন দেখা যাচ্ছে। ২০২০ সালের আমেরিকায় এ সব ‌‘স্বাভাবিক’ হতে পারে না।’  ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনার কড়া নিন্দা করেছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেন। তবে একই সঙ্গে হিংসার সমালোচনাও করেছেন তিনি।
এ পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে, বিক্ষোভের জেরে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, ফ্লোরিডা, আটলান্টা, ডেনভার, লস এঞ্জেলেস, মিনিয়াপোলিস, সান ফ্রান্সিসকো, সিয়াটেল–সহ ১২টির বেশি শহরে জারি করা হয়েছে কার্ফু। প্রায় সব ক’‌টি শহরের বহু বাড়িতে স্প্রে দিয়ে লেখা হয়েছে ‘আই কান্ট ব্রিদ’। লস এঞ্জেলেসে লুঠ হয়েছে দোকানপাট। আগুন লাগানো হয়েছে শহরের বহু জায়গায়। সেখানে জারি হয়েছে জরুরি অবস্থা। ডাকা হয়েছে ন্যাশনাল গার্ডদের। নামানো হয়েছে ১০ হাজার পুলিশকর্মীকে। ভার্জিনিয়ার রাজধানী রিচমন্ডের একাধিক জায়গায় আগুনের ছবি দেখা গেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আগুন লাগানো হয়েছে গাড়িতে। পুড়ে ছাই একটি সংস্থার অফিস। বিক্ষোভ সামলাতে গিয়ে আহত একাধিক পুলিশ অফিসার হাসপাতালে ভর্তি। ইন্ডিয়ানাপোলিসে প্রতিবাদ চলাকালীন একাধিক রাবার বুলেট ছোড়া হয়। গুলিতে অন্তত একজনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। বিক্ষোভের উৎস মিনিয়াপোলিসে শনিবার রাত ৮টা থেকে কার্ফু জারি করা হয়। কার্ফু অমান্য করে লোকজন বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করলে রাতেই পুলিশের পাশাপাশি নামানো হয় ন্যাশনাল গার্ডদের। বিক্ষোভ থামাতে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ব্যবহার করে পুলিশ। শনিবার রাতে ফিলাডেলফিয়ায় আগুন লাগানো হয় পুলিশের গাড়িতে। আহত হন ১৩ জন পুলিশ অফিসার। নিউ ইয়র্কে বিক্ষোভকারীদের মাঝখান দিয়ে চলে যায় পুলিশের দুটি গাড়ি। গাড়ির ধাক্কায় রাস্তায় পড়ে যান কয়েকজন। ভাইরাল হয়েছে সেই ভিডিও। নর্থ ডাকোটায় রেনো সিটি হলে আগুন লাগানো হয়। সল্টলেক সিটিতে পুলিসের গাড়ি উল্টে দিয়ে আগুন লাগায় বিক্ষোভকারীরা। বেসবল ব্যাট দিয়ে পেটানোয় আহত হন এক পুলিশ অফিসার। ২২টি শহর থেকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১,৬৬৯ জন। এর এক–তৃতীয়াংশই ধৃত লস এঞ্জেলেসে। শনিবার রাতে কড়া ব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়েছেন ট্রাম্প। বলেছেন, ‘ছেলেখেলা চলবে না। নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশকে কাজ করতে দিতে হবে।’‌

জনপ্রিয়

Back To Top