সুমন সেনগুপ্ত- ভারতের নির্বাচনে এক নতুন দিক উন্মোচিত হল। সাধ্বী প্রজ্ঞার মতো একজন হিন্দু সন্ত্রাসবাদী নির্বাচনে লড়ার বৈধতা পেল। ভোপাল লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন তিনি। এটা সত্যি যে ভারতের সংবিধানে কোনও নিয়ম বলে না যে সন্ত্রাসবাদের দায়ে অভিযুক্ত কেউ ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না। কিন্তু এটাও সত্যি যে সাধ্বী প্রজ্ঞার মতো একজনকে নির্বাচনে অংশ নিতে দিলে, শাসক দল ঘৃণা–বিদ্বেষের যে রাজনীতি ৫ বছর ধরে ভারতের সমাজে ঢুকিয়েছে, তা সহজেই মান্যতা পেয়ে যায়। প্ররোচনামূলক মন্তব্যের কারণে যোগী আদিত্যনাথ–সহ অনেক নেতা, মন্ত্রীকে বারবার সাবধান করছে নির্বাচন কমিশন এবং লোক দেখানো হলেও ছোটখাটো কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। সেখানে সাধ্বী প্রজ্ঞা যে ঢালাও ছাড় পাচ্ছেন, তাতে এই ভয়টা কি থাকে না যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর শুধু বাণী হিসেবে থাকবে না, বরং সমাজের মূলস্রোতেও ঢুকে পড়বে? 
গত ৫ বছর ধরে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে যেভাবে এই ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, বিজেপির এই পদক্ষেপ তারই শেষ পরিণতি। গত ৫ বছরে শুধুমাত্র মুসলমান হবার কারণে যে ভাবে জুনেইদ, পেহেলু খান, আখলাখ–‌সহ অন্যদের গণপ্রহারের শিকার হতে হয়েছে, সেখানে সাধ্বী প্রজ্ঞাকে প্রার্থী করা কীসের ইঙ্গিত? আসলে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্যে এমন একজনকে প্রার্থী করলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়। একদিকে যেমন অপ্রাসঙ্গিক, অথচ উসকানিমূলক কুকথার তোড়ে অর্থনীতি ও অন্যান্য জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনার স্রোত ঘুলিয়ে দেওয়া যায়, তেমনি যিনি নিজেই একটি সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁকে সামনে রেখে হিন্দু ভোট একজোট করা যায়। আর এই মুহূর্তে বিজেপি এটাই চায়, সমস্ত আলোচনা কেন্দ্রীভূত হোক ‘‌ভারত কি হিন্দু রাষ্ট্র হবে’‌— এই প্রশ্নে। 
প্রজ্ঞা ঠাকুরকে প্রার্থী করার আরও একটা উদ্দেশ্য আছে। তিনি শুধু মালেগাঁও বিস্ফোরণে অভিযুক্ত নন, সরাসরি এই বিস্ফোরণের কৃতিত্বও দাবি করতে পারেন। মানুষের কাছে বার্তা যায়, যে বিজেপির মুসলিম বিদ্বেষের অন্যতম মুখ প্রজ্ঞা ঠাকুর শুধুমাত্র কংগ্রেসের কারণে ৯ বছর জেল খেটেছেন। সুতরাং কংগ্রেস কখনই হিন্দুদের ভাল করতে পারে না। ফের সেই নরম হিন্দুত্ব এবং গরম হিন্দুত্বের বিতর্ক। বিজেপির এই উগ্র হিন্দুত্ব কিন্তু কেবল মুসলিমদের জন্য বিপজ্জনক নয়। যঁারা রাজনৈতিক বিরোধী, বা যঁারা এই উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারেন, যঁারা মানবতাবাদী, যঁারা সমাজের শুভচিন্তক—  সবার জন্য সমান বিপদের। ‌
দেশের মানুষও গত পঁাচ বছরে এটা ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে মুসলমান মানে ‘‌আমরা’‌ নয়, ‘ওরা’। অবশ্য এই ধারণাটা দীর্ঘদিন ধরেই লালিত–‌পালিত হয়েছে। শেষ পঁাচ বছরে এই ধারণাটা শুধু কিছু স্তর অতিক্রম করেছে। এখন অনেকেই মিথ্যেগুলোয় বিশ্বাস করে যে মুসলমানদের জন্যই আজ হিন্দুরা চাকরি পায় না। ওরা ক্রমশ সংখ্যায় বাড়ছে এই দেশটার দখল নেবে বলে। মিথ্যে প্রচারের বোতল থেকে বেরিয়ে এসেছে বিদ্বেষের ‘জিন’! যার ফল আখলাখ, পেহেলু খানদের গণপিটুনি, হত্যা। গুজরাট পরবর্তীতে তেমন কোনও সংগঠিত দাঙ্গা কিন্তু হয়নি, যাতে একসঙ্গে অনেক মানুষ মারা গেছেন। কিন্তু ছোটখাটো বেশ কিছু ঘটনা পর পর ঘটে চলেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বলি হয়েছেন মুসলিমরা। খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, ঘটনাগুলোও খুব পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে, যাতে মুসলমানেরা ভয় পায়, মাথা নিচু করে চলে। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে বেপরোয়া ছড়ানো হয়েছে কিছু বার্তা বা আফরাজুলকে কুপিয়ে হত্যা করে তাঁকে পুড়িয়ে মারার ভিডিও, যা দেখে অন্য মুসলমান সহনাগরিকেরাও ভয় পান।
এই প্রেক্ষিতে কংগ্রেসের নরম হিন্দুত্ব কি বিজেপির উগ্র হিন্দুত্বকেই মান্যতা দেয় না? যখন মায়াবতী কিংবা নভজ্যোত সিং সিধু বলেন মুসলমান ভোট যেন ভাগ না হয়, যখন সোনিয়া গান্ধী পরোক্ষে স্বীকার করে নেন যে বিজেপি এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে বিজেপি বাদে অন্য দলগুলি আসলে মুসলমানদের পক্ষে, তখন বোঝা যায় যে প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর বা আফরাজুলের হত্যাকারী শম্ভুলাল রেগা’র রাজনীতির বিরোধিতা কী করে করতে হয় ওঁদের জানা নেই। তাই তঁারা সাধ্বী প্রজ্ঞা সম্পর্কে একটা কথাও জোর গলায় বলে উঠতে পারেন না। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির চিন্তার দৈন্যতাই এতে প্রকাশ পায়। যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধী জোর গলায় বলেন, যে মুসলমানেরা তাঁকে ভোট না দিলে যেন কোনও উন্নয়ন আশা না করেন, তখন এটাই প্রমাণিত হয় যে মুসলমানেরা তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলগুলির ভোটব্যাঙ্ক ছাড়া নিজেকে উন্নীত করতে অক্ষম হয়েছেন। এর জন্য কে বা কারা দায়ী সেটা ভিন্নতর বিতর্ক। কিন্তু আপাতত সত্যিটা এটাই যে একজন মুসলমান একদিকে সংগঠিত ঘৃণা–‌বিদ্বেষের শিকার এবং অন্যদিকে কারুর ভোটব্যাঙ্ক ছাড়া কিছু নন। কিন্তু এটা কি কোনও বৈচিত্র‌্যে ভরা ভারতের মতো দেশের কাছে কাম্য? আধুনিক ভারতবর্ষ কি এটা দাবি করে না যে এখানে প্রতিটি মানুষ তাঁর ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে একসঙ্গে তর্ক–‌বিতর্ক করতে করতে এগিয়ে যাবে? আধুনিক ভারতে কি জুনেইদ, গৌরি লঙ্কেশ, পানসারে কিংবা নাসিরুদ্দিন শাহদের একসঙ্গে থাকার অধিকার নেই?‌ অন্যান্য অনেকের সঙ্গে যারা অন্য ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে আছেন? এই আধিপত্যবাদ কি কোনওদিন কোনও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে অন্যের বিশ্বাসে আঘাত করাটাই আইনত সিদ্ধ হয়ে যায়?‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top