দেবেশ রায়: অসমে নাগরিকপঞ্জি তৈরির ব্যাপারে মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য ৩ লক্ষের সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পার্থক্য আছে। মমতা ব্যানার্জি যে এটাকে ‘‌গৃহযুদ্ধ’‌–‌এর সূচনা বলেছেন সেটা যথার্থতম বর্ণনা। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদরা যে শিলচর গিয়েছিলেন ও অসম সরকারের প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছিলেন— সেটা সর্বোত্তম সময়োচিত কর্তব্য। ও আজ মেয়ো রোডে অমিত শাহের সভার দিন যে রাজ্যব্যাপী ধিক্কার দিবস পালনের কর্মসূচি নিয়েছেন সেটাও বিজেপি বিরোধিতার সর্বোৎকৃষ্ট রাজনৈতিক পদ্ধতি। কাগজে পড়েছি তৃণমূল কংগ্রেসেরই একটি সংগঠন, ‘‌যুব তৃণমূল’‌ বোধহয়, মেয়ো রোডে অমিত শাহের সভাস্থলেই পাল্টা সমাবেশ করবে বলে স্থির করেছে। এটাও একটা সময়োচিত কর্তব্য।
একটু অবাক হয়েই দেখলাম— একই দিনে সিপি‌এম‌–‌এর দুই নেতা মহম্মদ সেলিম ও সূর্যকান্ত মিশ্র মমতা ও তৃণমূলের এই আন্দোলনগুলির বিরোধিতা করেছেন।
সেলিম বলেছেন— এর আগে যখন সাংসদরা অসমে গিয়েছিলেন, তখন তৃণমূল সাংসদরা যাননি। কিন্তু সন–‌তারিখ উল্লেখ করেননি। কঠিনতম রাজনৈতিক সঙ্কটকে এমন শিশুসুলভ করে ফেলায় প্রমাণ হয়— সিপি‌এম‌ সঙ্কটটা বুঝতেই পারছে না।
সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন— বিজেপি অসমে যে ‘‌মেরুকরণ’‌ করছে, পশ্চিমবঙ্গে মমতাও তাই করছেন। মানে?‌ মমতা এক লিস্টি বানিয়ে ৭৪ হাজার নাগরিককে বাদ দিয়েছেন?‌ ও ভোটার লিস্টভুক্ত ভোটারদের D-‌চিহ্নিত করেছেন?‌
কিন্তু ৯ আগস্ট অসম নাগরিকপঞ্জির প্রতিকার চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে দেবগৌড়া, ওমর আবদুল্লা, আনন্দ শর্মা, রামগোপাল যাদব, ওয়াই এস চৌধুরি, মিসা ভারতী, সুপ্রিয় সুলে, তিরুশি শিবা, মহম্মদ সেলিম, ডি রাজা, সঞ্জয় সিং, সুদীপ ব্যানার্জি ও ডেরেক ও’‌ব্রায়েন— এই সম্মিলিত বিরোধী নেতারা যে–‌দাবি জানিয়ে এসেছেন, তাতে কিন্তু সিপি‌এম‌– তৃণমূল দুই দলই ছিল। তা হলে এখানে তাঁরা ভিন্নস্বর কেন?‌
খুব সম্ভবত তারা সিপি‌এম‌ সমস্ত ইতিহাস ও তথ্য জানে না।
অসমের যে জনবিন্যাসকে মূল জনবিন্যাস প্রমাণের জন্য নাগরিকপঞ্জি তৈরি হচ্ছে, নাগরিকপঞ্জি উপলক্ষেই সেই কথা আমাদের দিক থেকে সবে শুরু হয়েছে। আমরা দেখতে চাই— অসমের মূল জনবিন্যাসের শুদ্ধ পঞ্জি তৈরি করতে গিয়ে অসম–‌প্রদেশ গঠন ও পুনর্গঠনের নানা প্রক্রিয়ায় যে–‌সব জনগোষ্ঠী অসমের স্থায়ী অধিবাসী হিসেবে গৃহীত হয়েছিল আসলে অসমকে যাঁরা নির্মাণ করেছেন, এখন তাঁদেরই কেন ‘‌অনুপ্রবেশ’‌কারীর তকমা পরানো হচ্ছে।
চা–‌শ্রমিক ও গোয়ালপাড়ার রাজবংশী জনসমাজের কথা তো আছেই। তাঁরা ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে চা–‌শিল্পের প্রয়োজনে অসমে এসেছিলেন বা তাঁদের আনাও হয়েছিল। আর, সেই চা–‌শিল্পের স্বার্থে ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে গোয়ালপাড়া জিলা পুরোপুরি অসমভুক্ত হয়।
নমঃশূদ্র ও মুসলমান জনবিন্যাসের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব নমঃশূদ্র ও মুসলমান বাঙালিরা সমর্থন করেছিলেন। প্রধানত বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত ‘‌বঙ্গভঙ্গ’–‌কে একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপান্তরিত করে। সেই আন্দোলনের সঙ্গে এমন ভারতবিখ্যাত মনীষীদের নাম জড়িয়ে যায় ও মধ্যবিত্তের স্বাভাবিক সৃষ্টিশীলতায় সে আন্দোলন এমন সংস্কৃতিবান হয়ে ওঠে যে তার বিপরীত ও বিরোধী এক চলমান সামাজিক প্রক্রিয়া আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। এমনকী সুমিত সরকারের বিখ্যাত গ্রন্থ স্বদেশি আন্দোলনেও এ নিয়ে বিশেষ কথা হয়নি, এর পরিণতি নিয়ে তো নয়ই।
বাংলা যেমন ভাঙা হয়েছিল, তেমনি আর একটি প্রদেশ তৈরিও হয়েছিল, একই সঙ্গে— ‘‌পূর্ববঙ্গ ও অসম প্রদেশ’‌।
পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা এর পক্ষে ছিলেন। বরিশাল–‌ফরিদপুর–‌পাবনা–‌খুলনা–
‌যশোহরের বিস্তারিত ও বিপুল ও অনেকটা স্বাধীন নমঃশূদ্র সমাজও এর পক্ষে ছিল। রাজশাহির পদ্মার চর সন্নিহিত এলাকার মুসলমান ও নমঃশূদ্র সমাজ এর পক্ষে ছিল। এই সমর্থনের ইতিহাস থেকেই যোগেন মণ্ডল মহাশয় তাঁর রাজনৈতিক তত্ত্বে ধীরে ধীরে পৌঁছেছিলেন, তাঁর পরিণত বয়সে। অভিজ্ঞতা থেকে তত্ত্বের প্রস্তুতিকালে:‌ নমঃশূদ্ররা স্বভাবত হিন্দু নয় ও মুসলমানদের সঙ্গে তাঁদের কোনও স্বভাব–‌বিরোধ নেই। নমঃশূদ্রদের মধ্যে একটি ক্ষমতাবান অংশ নিজেদের হিন্দু বর্ণসমাজের অন্তর্ভুক্ত করার আন্দোলন করত। সেই আন্দোলনের দুটি আবশ্যিক কর্মসূচি ছিল— পইতে পরা, ব্রাহ্মণদের সমতুল্য অশৌচপালন ও ব্রাহ্মণদের মতো শ্রাদ্ধপালন। এমন একটি শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রিত হয়েও ব্রাহ্মণরা নিমন্ত্রণরক্ষা না করায় সেই অঞ্চলের নমঃশূদ্ররা ব্রাহ্মণদেরই প্রায় মাসখানেক একঘরে করেন। নমঃশূদ্র–‌আন্দোলনে এটা খুব বড় ঘটনা।
১৯০৫–‌এ ফরিদপুরের নমঃশূদ্র নেতা ও গুরু হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুর ‘‌অসম ও পূর্ববঙ্গ প্রদেশ’‌ গঠনকে সমর্থন করেন। নবনিযুক্ত লেফটেন্যান্ট–‌গভর্নর (‌উপরাজ্যপাল)‌ তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন ও তাঁদের সঙ্গে রাজনীতি নিয়েও কথা বলেন।
সরকারের এই স্বীকৃতি নমঃশূদ্র সমাজের কাছে খুবই গৌরবের ঘটনা মনে হয়েছিল।
ব্রাহ্মণ–‌আধিপত্যের হিন্দু সমাজে কোনও ধরনের মান সম্মান না–‌পাওয়া নমঃশূদ্ররা চিরকাল নিম্ন শূদ্র ও ‘‌অচ্ছুৎ’‌ হিসেবে পরিচিত ও ব্যবহৃত হওয়ার পর তথাকথিত হিন্দুশাস্ত্রনিষ্ঠ সমাজে— শূদ্রের পালনীয় কর্তব্য করতে করতে অপমানবোধও হারিয়ে ফেলেছিল অথচ আমাদের গ্রামসংগঠনে তাদের জন্য নির্দিষ্ট পল্লী ছিল অপরিহার্য। সেখানে স্বয়ং শাসনকর্তা সাহেব তাঁদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ায় তাঁরা আত্মসম্মান অর্জনের যেন একটা অবলম্বন পান নতুন ‘‌অসম ও পূর্ববঙ্গ’‌ প্রদেশে।
সেই প্রদেশ হওয়ার পর তাঁরা ঘোষণা করেন যে তাঁরা ব্রিটিশ–‌বিরোধী কোনও আন্দোলনের সমর্থক নন। নমঃশূদ্ররা ব্যাপক হারে খুলনা–‌ফরিদপুরের বিল–‌অঞ্চল ও ফরিদপুরের চর অঞ্চল থেকে অসমে একটু ডাঙা জমিতে বসতি প্রতিষ্ঠা করেন ও চাষবাস শুরু করেন। অসমের নমঃশূদ্র–‌আধিপত্যের কারণ ‘‌অনুপ্রবেশ’‌ নয়— মাতৃভূমি আবিষ্কার— সেই ১৯০৫ থেকে।
অসমে প্রকাশিত নাগরিকপঞ্জি যে ভুলে ভরা তার উদাহরণ বা প্রমাণ— প্রাক্তন এক রাষ্ট্রপতির ভাগনের পরিবারের নাম, বা, প্রাক্তন এক মুখ্যমন্ত্রীর নাম, বা যুদ্ধে নিহত কোনও জওয়ানের নাম, বা প্রাক্তন এক উপাচার্যের নাম— বাদ পড়া নয়। এই নামগুলি উদাহরণ হিসেবে উল্লিখিত হলে বিষয়টি অনেক অনেক খাটো ও তুচ্ছ হয়ে যাবে। যেন, এগুলো সংশোধনীয় কিছু ভুল মাত্র।
নাগরিকপঞ্জি যে জাতিপরিচ্ছন্ন করার এক ছল বা আড়াল বা অছিলা সংবিধান বিরোধী সেই সক্রিয়তাটাই ঢাকা পড়ে যাবে। ভারতে বিজেপি ফ্যাসিস্ট শুদ্ধতার জাতিপ্রাধান্য, ভাষাপ্রাধান্য ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা–‌প্রাধান্য কায়েম করতে চাইছে।
অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস ছিল সেই কর্মসূচির একটি শীর্ষবিন্দু, বিজেপির অভ্যন্তরীণ ক্যুপের ফলে নরেন্দ্র মোদিকে সাধারণ নির্বাচনে বিজেপির ‘‌মুখ’‌ বলে প্রচার ছিল আর এক শীর্ষবিন্দু আর, অসমে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা ও প্রকাশ করা আর এক শীর্ষবিন্দু। এই শীর্ষের লক্ষ্য ২০১৯–‌এর সাধারণ নির্বাচন।
নাগরিকপঞ্জি তৈরির উদ্দেশ্য:‌ বিজেপির তালিকা অনুযায়ী তৈরি ‘‌ভারতবাসী’–‌রা ভোট দিয়ে জিতিয়ে পরের ভোটে সংবিধান সংশোধন করে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বলে বিধিবদ্ধ করবে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top