প্রচেত গুপ্ত: ‘‌টুকরো করে কাছি আমি ডুবতে রাজি আছি।’‌
তাই কি?‌ সত্যি ‌কি ডুবতে রাজি আছি? নাকি‌ চেনা অবস্থানে, যাকে ‘‌সুখ’‌ ভেবে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত থাকতে জীবন অভ্যস্ত, তার মধ্যে বাস করে ‘‌ডুবে যাওয়া’‌র বিলাস–‌স্বপ্ন দেখি মাত্র? জীবন কী চায় তা যেমন মীমাংসাহীন, তেমন নিয়তি নির্ধারিতও নয়। সে নিজের মর্জি মতো চলতে পারে না। একদিকে হাতছানি, অন্যদিকে দড়িতে বঁাধা। এর মধ্যে পড়ে বেচারি একই সঙ্গে অসহায় এবং আপ্লুত। কখনও নিজেকে নিজেই গালমন্দ করছে। কখনও আবার আহ্লাদে গদগদ হয়ে বলছে— ‘‌এই সুখী জীবন লইয়া কী করিব?  ঘরকন্যা করিব?‌ নাকি তীব্র জ্যোৎস্নায় সংসার ত্যাগ করিব?’ সুখ পাখিটি দেখতে কেমন, জীবন নামের অগোছাল গাছের কোন ডালটিতে সে কবে এসে বসবে কেউ বলতে পারে না। আগেও পারে না, পরেও পারে না। বড় বড় দার্শনিকরা চেষ্টা করেছেন, এখনও করছেন। ফল মেলেনি। তবু ছাই ওড়ানোর কাজ চলে অবিরত, যদি ছাইয়ের আড়ালে মণি–‌মুক্তো কোথাও পড়ে থাকে।
বেশি কথা হয়ে গেল?‌ পাঠক মার্জনা করবেন। কিন্তু ব্রাত্য বসু নির্দেশিত, পূর্ব পশ্চিম নিবেদিত নতুন নাটক ‘‌অথৈ জল’‌ দেখতে বসে এসব কথা মনে না এসে উপায় ছিল না। ‘‌অথৈ জল’‌ এমন একটি নাটক যা দেখার সময় মনের অনেকটা অংশ নাটকের দখলে চলে যায়। মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে। বিস্মিত, মুগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি অপ্রত্যাশিতের আকস্মিকতায় থতমত খেতে হয়। আমার মতো অতি সাধারণ মানের মানুষকেও ভাবতে হয়, জীবনের সুখ ও অসুখ কি তবে সত্যি আপেক্ষিক?‌ এলেমেলো? তা যেমন অর্জন করা যায় না, করা যায় না বর্জনও। সে একই সঙ্গে সত্যদর্শন এবং মায়া। সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম‌ শ্রেষ্ঠ দার্শনিক স্পিনোজোর বলেছিলেন— শরীর মনকে চিন্তা করাতে পারে না, মনও শরীরকে নাড়াতে থামাতে বা আর কিছু করাতে পারে না। অবশ্য যদি আর কিছু করবার থেকে থাকে আদৌ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অথৈ জল উপন্যাসটি সাধারণ মানের, তারপরেও এটিকে নাট্যরূপ দিয়ে মঞ্চে আনবার পিছনে গভীর দর্শন কাজ করেছে বলে আমার বিশ্বাস। পূর্ব পশ্চিম নাট্য সংস্থার সৌমিত্র মিত্র, নাট্যকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদক, পরিমার্জক এবং নির্দেশক ব্রাত্য বসুকে এর জন্য ধন্যবাদ। তারা শুধু একটি উপভোগ্য নাটক তৈরি করেননি, একটি বড় পরীক্ষায় সফল হলেন। সেই পরীক্ষা শুধু নাটকের ফর্মে সীমিত নয়, জীবন উপলব্ধির সত্যকে স্পর্শ করেছে। নাটক টিমওয়ার্ক। তবে নৌকোর হালটি যিনি ধরেন তিনি নির্দেশক, প্রধান কান্ডারি। এই নাটকে নির্দেশক নির্দেশকের থেকেও বেশি। কাহিনী, নাট্যরূপকে ছাপিয়ে তিনি এমন কিছু চরিত্র, ঘটনা, মুহূর্ত তৈরি করছেন যা মন খারাপ, মন ভাল দুটোই তৈরি করে। 
এই প্রসঙ্গে গল্পটা দু–‌তিন লাইনে বলে নিই?‌
১৯৪৭–’‌৪৮ সাল। বর্ধমানের বাতাসি গ্রামে থাকতেন শশাঙ্ক ডাক্তার। মান্যিগন্যি, নীতিনিষ্ঠ, সৎ, চরিত্রবান সুর্দশন পুরুষ। নারী বলতে জানেন শুধু স্ত্রী সুরবালাকে, প্রবল ভালবাসেন। জীবনে নারী বলতে এই একজনই। এই মানুষটিই একদিন একটা খেমটা নাচিয়ে কন্যার প্রেমে পড়ে গেলেন। পান্না। উথালপাতাল প্রেম। ক্ষমতা, পরিচয়, ন্যায়, নীতি, বিশ্বাস, সামাজিকতা সব ছঁুড়ে ফেলে প্রেমের অথৈ জলে ভেসে পড়লেন চরিত্রবান ডাক্তারবাবু। ডাক্তারি সরিয়ে হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে খেমটাদলে যোগ দিলেন। তারপর‌.‌.‌.‌।  
আপাতভাবে যে কাহিনীকে দিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর নকশা নাটক (‌যারা ছিল সামাজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তবে শিল্পের থেকে সমাজ সংস্কারের জোর বেশি।)‌ ধরনের একটা কিছু করা যেত, তাকে উচ্চমার্গে নিয়ে গেছেন নির্দেশক। দুটি উদাহরণ দিই। 
উদাহরণ এক— এই নাটকে তিনজন শশাঙ্ক। একজন মূল চরিত্র, ডাক্তার। একজন স্কুলে পড়া বালক শশাঙ্ক, একজন মেডিক্যাল কলেজে পড়া তরুণ শশাঙ্ক। মূল শশাঙ্ক মাঝেমধ্যেই স্কুলে পড়া এবং কলেজে পড়াদের মঞ্চে ডেকে নেয়। কখনও তারা নিজেরাও আসে। ভালমন্দ, ন্যায়–‌অন্যায়ের পরামর্শ দেয়। ভেসে যাওয়ার সময় কখনও মূল শশাঙ্ককে বাধা দেয়, কখনও দেয় উৎসাহ। প্রাথমিক ভাবে এদের দু‘‌রকম বিবেক বলে মনে হলেও, পরে বোঝা যায়, এরা আসলে শশাঙ্কেরই অংশ।
উদাহরণ দুই— নাটকের শেষ দৃশ্যের সামান্য আগে, ফঁাকা মঞ্চে প্রবেশ করানো হল খেমটা নাচিয়ে কিশোরী পান্নাকে। আবহে ডাক্তার গিন্নির সংসারের কথা। জয়ী অথচ পরাজিতের হাহাকারের মতো ভেসে আসে। বিস্মিত, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত পান্না ঘুরে ঘুরে সেই ডাক শুনতে থাকে। 
এসব কাহিনীতে নেই। নাট্যরূপেও নয়। এসব নির্দেশকের। যা কাহিনীকে কাহিনীর থেকেও বড় করে। 
ব্রশিওরে ‘‌অথৈ জল’ নাটকটি নিয়ে ব্রাত্য যা বলেছেন, তার সঙ্গে আমি পুরো একমত হতে পারিনি। ‘‌অথৈ জল’ শুধু‌ অসম, অবৈধ প্রেমে ভেসে যাওয়ার নাটক নয়। পর্দাথবিদ এরভিন শ্র‌য়েনডিঙ্গারের বিখ্যাত ভাষণ ‘‌মাইন্ড এন্ড ম্যাটার’‌ থেকে ধার করে বলি, এই নাটক বাস্তবতার সঙ্গে ইন্দ্রিয়ানুভূতির বির্তক তৈরি করেছে। বুদ্ধি বলছে, মনে হয় এই সুখে রং আছে, মিষ্টত্ব আছে, মনে হয় তিক্ততাও আছে। কিন্তু আসলে আছে কিছু শূন্যতা। অন্যদিকে অনুভূতি বলছে, বেচারি বুদ্ধি!‌ তোমার জয়ই তোমার পরাজয়।
ব্রাত্য বসুর মতো পরিচালক খুব সহজে যেমন কোনও নাটককে ধরেন না, তেমন সহজে ছেড়েও দেন না।
শশাঙ্ক ডাক্তারের চরিত্রে দেবশঙ্কর হালদার চমৎকার। মানানসই বললে কম বলা হয়। চরিত্রের রসটিকে উপলব্ধি করে কাজ করেছেন। একটুখানি চরিত্র দারোগার। সৌমিত্র মিত্র দারুণ। পান্নার চরিত্রে সুপর্ণা মৈত্র দাস পরিশ্রমী, সাহসী, স্বচ্ছন্দ। রাজেশ্বরী নন্দী যথোপযুক্ত। আর খুব ভাল সঞ্জয় চক্রবর্তী, বিক্রমজিৎ সিন্‌হা। পৃথ্বীশের মঞ্চের তো আমি ভক্ত। মালবিকা মিত্র, মধুমিতা ধাম পোশাক পরিকল্পনা‌ও করছেন ভাবনাচিন্তা করে। আরও অনেকেই নিজের কাজে ভাল।
আর যা ভাল লাগেনি তা হল.‌.‌.‌। থাক, ভাল লাগার তুলনায় তা অতি সামান্য।
 

জনপ্রিয়

Back To Top