তরুণ চক্রবর্তী- বিভাজনের বিভেদরেখা আরও স্পষ্ট করতে একা এনআরসি (নাগরিকপঞ্জি)–তে রক্ষে নেই, আসছে দোসর ক্যাব (সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল)! আর এই দুইয়েই পূর্ণ হবে উত্তর–‌পূর্ব ভারতে বিজেপি–‌র ষোলোকলা। ২০২১–‌এ অসমের বিধানসভা ভোট। বাঙালি ভোট চাই। এনআরসি ক্ষত মেটাতে তাই ললিপপ হিসেবে আসছে ক্যাব। কাশ্মীর পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই ফের শুরু হবে অমিত শাহের বিক্রম। উত্তর থেকে এবার টার্গেট উত্তর–পূর্ব। সেই টার্গেট পূরণে কোনও নীতিকথা শুনতে নারাজ বিজেপি নেতারা। জিততে হবে। এটাই একমাত্র মন্ত্র। দলের সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনেক আগেই দলীয় নেতাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন নৈতিকতার কোনও ঠেকা বিজেপি নেয়নি। অর্থাৎ মুলুক এখন তাঁর। শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন করার নেই কো রীতি!
৩১ আগস্ট প্রকাশিত হবে এনআরসি–‌র চূড়ান্ত তালিকা। তার আগে থেকেই এনআরসি–‌র রাজ্য সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলা থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ সমালোচনায় মুখর বিজেপি নেতারা। সাংবিধানিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে বিধানসভাতেই খুল্লামখুল্লা সমালোচনা করা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের। বিরোধীদের আপত্তি না শুনে একতরফা ভাবে অসম বিধানসভার জিরো আওয়ারে এনআরসি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশিত হল বিজেপি মন্ত্রী–‌বিধায়কদের গলায়। খোদ পরিষদীয় মন্ত্রী সরাসরি বললেন, ‘বহু বাংলাদেশি মুসলিমের নাম থাকছে এনআরসি–‌র চূড়ান্ত তালিকায়।’ এমনকী, সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা প্রতীক হাজেলার গোপন রিপোর্ট তুলে ধরে তিনি জানান জেলাওয়াড়ি এনআরসি–‌ছুটদের সংখ্যাও। 
আর বিজেপি বিধায়করা আরও একধাপ এগিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও এনআরসি কর্তাদের বিরুদ্ধে কামান দাগতে শুরু করেছেন। বাঙালি বিধায়ক শিলাদিত্য দেব তো বিধানসভাতেই এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতেই গোটা প্রক্রিয়া চলছে। আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিজেও জন্মসূত্রে অসমিয়া। তিনিও আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। সংসদীয় বা পরিষদীয় রাজনীতির এই নজিরবিহীন ঘটনায় আদালত অবমাননার অভিযোগ করেছেন অসম বিধানসভার বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য জানিয়ে দিয়েছে, তারা বাইরের কথায় কান দেবে না।
অবশ্য, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ভার পাওয়ার আগেই সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনাধীন বিষয়টি নিয়ে বাংলার বুকে একাধিক বার মন্তব্য করেছেন অমিত শাহ। উইপোকা বা ঘুষপেটিয়াদের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে খুঁজে বার করার ঘোষণা নতুন কিছু নয়। সেই লক্ষ্যেই কাজ করেছে অসমের এনআরসি প্রক্রিয়া। বাঙালিরাই সবচেয়ে বড় ভিকটিম। হিন্দু বা মুসলিম নয়, বাঙালি হলেই তাঁকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। প্রাক্তন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী তথা বিজেপি নেত্রী বিজয়া চক্রবর্তীকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি অসমিয়া হলেও তাঁর পদবি তো ‘চক্রবর্তী’! শুধু তিনি নন, তালিকাটি বেশ বড়। অসমিয়াদের সঙ্গে বাঙালিদের পদবিতে অনেক মিল রয়েছে। চক্রবর্তী, ভট্টাচার্য, দাশ, নাথ প্রভৃতি পদবি উভয় সম্প্রদায়েরই। তাই অনেক সময়ে বাঙালি বাছতে গিয়ে অসমিয়ারাও বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে।
এটা বুঝতে পেরেছিলেন বঙাল খেদা আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ তথা অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লকুমার মহন্ত। তাই চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশের পর খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্ররাও যে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, সেটা নিয়ে তিনি প্রথম মুখ খোলেন। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল অসম গণ পরিষদ (অগপ) খিলঞ্জিয়াদের স্বার্থ রক্ষার বদলে বিজেপি–‌র সঙ্গলাভ করে মন্ত্রিত্ব ভোগকেই বেশি গুরুত্ব দিতে ব্যস্ত। বিজেপি–‌র হাতে তামাক খেতে গিয়ে অসমিয়াদের স্বার্থ ভুলে যাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে অগপ–‌র বিরুদ্ধে।
কিন্তু হঠাৎ করে বিজেপি এত এনআরসি বিরোধিতায় নামছে কেন? আরএসএস এতদিনে বুঝে গিয়েছে এনআরসি–‌ছুটদের মধ্যে বেশিরভাগই বাঙালি হিন্দু। ৪২ লাখ নাম–‌ছুটদের মধ্যে বাঙালি মুসলিমের সংখ্যা বড়জোর ৫ লাখ। এত সাধের এনআরসি প্রক্রিয়াতেও মুসলিমদের বড় অংশকে কোনও অবস্থাতেই বিদেশি বলে প্রমাণ করা যাচ্ছে না। বারবার হয়রানি করা হলেও তাঁদের নাগরিকত্বের ভিত্তি বেশ শক্ত। কারণ বংশপরম্পরায় তাঁরা অসমেরই বাসিন্দা। বংশবৃক্ষ পরীক্ষায় তাঁদের বাদ দেওয়ার কোনও উপায় নেই। বাদ দিতে গেলে উল্টে নাকানিচোবানি খেতে হচ্ছে সরকারকে। যেমনটা মুখ পুড়ল কার্গিল–‌যোদ্ধা মহম্মদ সালাউদ্দিনকে নিয়ে। ফলে মুসলিমদের নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক প্রশাসন। আর এতেই শুরু হয়েছে প্রতীক হাজেলার সমালোচনা। 
শুধু এনআরসি তালিকাতেই নয়, অসমে বিদেশি তকমা লাগিয়ে যাঁদের জেলবন্দি করে রাখা হয়েছে তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশই বাঙালি হিন্দু। হিন্দু বাঙালিদের এখন রক্ষাকর্তা সাজতে চাইছে বিজেপি। গেমপ্ল্যান খুব সুন্দর। প্রথমে বিপদে ফেল। তারপর উদ্ধারকর্তা সেজে আশার আলো দেখাও। বাঙালি মাত্রই এখন অসমে বিপাকে। নাগরিকত্ব প্রমাণ দিতে ব্যস্ত। শুধু প্রমাণ দিলেই চলছে না, খরচা আছে। পদে পদে খরচ। নাগরিকত্ব খোয়াবেন কয়েক লাখ হিন্দু বাঙালি। এবার সেই বাঙালিদেরই রক্ষাকর্তার ভূমিকায় আসরে নামবে বিজেপি। তাই আনা হচ্ছে ক্যাব।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে শরণার্থী হিসেবে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি, এমনকী, খ্রিস্টানরাও শর্ত সাপেক্ষে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে পারেন। বলা হচ্ছে এনআরসি–‌ছুট বাঙালি হিন্দুদের সামনে কোনও বিপদ নেই। কারণ এনআরসি–‌বুনো ওলের বদলে থাকছে বাঘা তেঁতুল ক্যাব। আসলে এটাও একটা জুমলা। ক্যাব হলেও হিন্দুদের সমস্যাও কমছে না। কারণ গত লোকসভায় পেশ করা ক্যাব–‌এ নাগরিকত্ব পাওয়াটি অত সহজসাধ্য নয়। বরং অনেক জটিল। এমনকী, গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি থাকছে অনেক বেশি। থাকছে টেবিলের তলায় খরচাপাতির বিপুল সম্ভাবনা। কারণ আপনি বেআইনি অনুপ্রবেশকারী, এটা জানিয়েই আবেদন করতে হবে নাগরিকত্বের। এরপর নাগরিকত্ব পাওয়াটি আপনার অধিকার নয়, প্রশাসনের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। জেলা প্রশাসন চাইলেই আপনাকে বেআইনি অনুপ্রবেশের দায়ে পুরতে পারে জেলে। আবার শরণার্থী–‌র সংজ্ঞা নিয়েও জটিলতা কম নেই।
আসলে অসমে এনআরসি আর ক্যাব নিয়ে হিন্দু বাঙালিকে মুসলিম বাঙালির থেকে আলাদা করাটাই হচ্ছে মুখ্য বিষয়। আর এই কাজে বিজেপি অনেকটাই সফল। কিন্তু শুধু বাঙালি আর অসমিয়া, হিন্দু আর মুসলিমে ভাগ করলে চলবে না। তাদের প্রয়োজন আরও বেশি বিভেদ। বিভেদের মাঝেই রয়েছে প্রবল পদ্মচাষের সম্ভাবনা। তাই আসছে ক্যাব। আপাতদৃষ্টিতে ক্যাব–‌বিরোধী উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলের বেশির ভাগ আদিবাসীরা। এবার তাঁদের মধ্যেও বিরোধ ঘটাতে হবে। বিভেদ আনতে হবে উপজাতি ও অনুপজাতিদের মধ্যে। একা এনআরসি সেটা পারবে না। তাই এবার আসছে ক্যাব। এটাই বিজেপি–‌র উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলীয় পাটিগণিত।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top