প্রীতিময় রায়বর্মন
আনলক পর্ব শুরু এবং লকডাউনের কড়াকড়ি কমতেই দিঘা, মন্দারমণি, বকখালি, শান্তিনিকেতন, বড়ন্তির মতো কাছাকাছি উইকএন্ড পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় বাড়ছে বাঙালি পর্যটকদের ভিড়। পরের সপ্তাহান্ত ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর মন্দারমণিতে চালু হওয়া প্রায় সব হোটেলেই হাউসফুল। পুজোয় বাঙালি একই ট্রেন্ড দেখাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশ্বের বৃহৎ শিল্পের অন্যতম পর্যটন। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্য জানাচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের অবদান ৮.‌৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে বিশ্ব–‌অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ২.‌৯ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্বের মোট জিডিপি–‌র ১০.‌৩ শতাংশ। বিভিন্ন দেশে সফরকারীর সংখ্যা ছিল ১৫৬ কোটি। অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে ১ জন পর্যটক। করোনার গ্রাসে এশিয়া প্যাসিফিক দেশগুলোয় ৩৫ শতাংশ, ইওরোপে ১৯ শতাংশ, আমেরিকায় ১৫ শতাংশ এবং আফ্রিকায় ১৩ শতাংশ পর্যটক কমেছে। করোনা সংক্রমণ কিছুটা কমতেই কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ‘‌ফুটফল’ বাড়ছে। বিশেষত পালে হাওয়া সৈকত পর্যটনের।‌
কন্টিনেন্টাল ট্রাভেলসের অন্যতম পার্টনার শঙ্কর সাহার মতে, ‌প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের করোনা–ভয় কেটেছে। আশা, অক্টোবরে ৩০–৪০ শতাংশ বুকিং হবে। ১৩, ১৪ আগস্ট থেকে একটু হলেও পর্যটনশিল্প গতি পেয়েছে। দিঘা, মন্দারমণিতে যাওয়া শুরু হয়েছে। ক’‌দিন আগে পাঁচটি পরিবার তাজপুরে যাওয়ার গাড়ি ও হোটেল বুক করল, একজন ক্যান্সার রোগীও আছেন দলে!‌ কম দূরত্বে দিঘা, মন্দারমণি, তাজপুরের ভাল চাহিদা। পুজোয় পুরুলিয়া, বড়ন্তি, মুকুটমণিপুর, বিষ্ণুপুরের দিকে পর্যটকেরা পা বাড়াতে পারেন। দার্জিলিং খুলেছে, অক্টোবরের বুকিং হচ্ছে টুকটাক। ট্রাভেল এজেন্টস হোটেলিয়ার্স অ্যান্ড ট্রাভেলার্স (‌টিএএইচটি)‌–এর কার্যকরী সভাপতি এবং এক্স–সার্ভিসম্যান পরিচালিত পর্যটন সংস্থা ইন্ডিয়ান হলিডেজ–এর সিইও সুপ্রতিম সিনহা‌ জানালেন, রেল পরিষেবা বন্ধ। সব ফ্লাইটও চলছে না। নিজস্ব গাড়ি নিয়ে সবার বেড়ানোর ক্ষমতা নেই। যদিও বেরোনোর জন্য অনেকেই তৈরি। ঝুঁকি নিয়ে বেরোচ্ছেন।
জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (ইউএনডব্লিউটিও)–র মতে, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যটনশিল্পে কর্মরত প্রায় ১০–১২ কোটি মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। কম করে ৩৩ কোটির বেশি মানুষ পর্যটনশিল্পে কর্মরত। ভারতে সংখ্যাটা সরকারি মতে সাড়ে ৪ কোটি হলেও আসলে তা দ্বিগুণেরও বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এ বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ অন্যান্য বছরের তুলনায় পর্যটক সংখ্যা কমেছে ৬ কোটি ৭০ লাখ, অর্থাৎ ২২ শতাংশ। ট্রাভেল এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল (‌টিএএবি)–এর‌ যুগ্ম সম্পাদক সুদীপ্ত গোস্বামীর আক্ষেপ, মিডিয়ার একটা বড় অংশ শুধুমাত্র করোনার খারাপ দিকে আলোকপাত করছে, সুস্থতার হার নিয়ে তেমন আলোচনা কই?‌ ভয় না কাটলে সফর সম্ভব নয়। বেড়ানো মানে রিল্যাক্সেশন, ভয় বা অস্থিরতা নয়।‌ একদিন দিঘায় প্রচুর মানুষ মানেই পর্যটন চাঙ্গা হয়ে গেল, এমনটা নয়। নিয়মিত ট্যুর দরকার। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)–এর তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গোটা বিশ্বে এ সময় বাতিল হয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ বিমান। ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩১৪ বিলিয়ন ডলার, এর মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিকেই ১১৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে বিমান শিল্পে ২০১৯–এর তুলনায় এ বছর আয় কমার আশঙ্কা প্রায় ৫৫ শতাংশ।
অ্যাসোসিয়েশন অফ ট্যুরিজম সার্ভিস প্রোভাইডার অফ বেঙ্গল (‌এটিএসপিবি)–এর‌ সম্পাদক ও রামকৃষ্ণ ট্রাভেলসের কর্ণধার কমলকিশোর গুপ্ত বললেন, ‌পর্যটনশিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। করোনা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলে এ বছর পর্যটন ব্যবসা মার খাবে। ঘরবন্দি থাকার পর মানুষ এখন বেড়াতে যেতে পারলে বাঁচেন। এখনও কিছু রাজ্য করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ দেখে তবেই ঢুকতে দিচ্ছে। কমলবাবুর আক্ষেপ, ‌ভারতে মোট জিডিপি–‌র ৯–১০ শতাংশ আসে পর্যটন থেকে। তবুও কেন্দ্রের সরকারি সাহায্য বা আর্থিক প্যাকেজ কোথায়? কল্যাণী ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের কর্ণধার সমর ঘোষের আশা, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে মানুষ আবার ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করবেন। তাঁর কথায়, যাঁদের নিজস্ব গাড়ি আছে বা অনেকে গাড়ি ভাড়া করে ইতিমধ্যে উইকএন্ড ট্যুরে দিঘা, পুরুলিয়া, মাইথন, ঝাড়গ্রাম যাচ্ছেন। বছরখানেক দু–তিনদিনের উইকএন্ড বা কাছেপিঠে সফরই চলবে, খুব বেশি হলে এক–‌দু’ ‌রাতের জার্নি।‌
‌ম্যাগনাম হলিডেজের কর্ণধার তপন নন্দী জানালেন, ‌‌ডিসেম্বর থেকে একটু হলেও আশার আলো দেখছি। সেই সময় হিমাচল, অরুণাচলে ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে মানুষ খোঁজখবর নিচ্ছেন। যতক্ষণ না ভ্যাকসিন আসছে ততক্ষণ পর্যটন স্বাভাবিক হওয়া মুশকিল। মা দুর্গা ট্রাভেলসের কর্ণধার সমীরকুমার জানা বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে স্বাভাবিক হতে শুরু করবে পর্যটনশিল্প। বিমানে যাতায়াতের খরচ না বাড়লে ৩০–৪০ শতাংশ মানুষ রাজ্যের বাইরে এবং বাকি ৬০–৭০ শতাংশ কাছেপিঠে ঘুরতে যাবেন।‌ দেবলোক গ্রুপ অফ হোটেলসের কর্ণধার তরুণ সাহা জানালেন, ‌অক্টোবরে হিমাচল বেড়ানোর কিছু বুকিং হয়েছে। হিমাচলে পৌঁছোনোর ৭২ ঘণ্টা আগে করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ থাকা চাই, তবেই মিলবে প্রবেশের ছাড়পত্র। হিমাচল ছাড়া আন্দামান নিয়েও মানুষের আগ্রহ আছে।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top