বাহার উদ্দিন- শীতে এত ঝঞ্ঝা আর ঝঞ্ঝাট সচরাচর দেখা যায় না। বই নিয়ে, হরেকরকম মেলা নিয়ে, কমলালেবুর গন্ধ নিয়ে, উষ্ণতা সন্ধানী আমেজ নিয়ে আমাদের তারুণ্য, আমাদের স্বপ্নময়তা যখন মেতে ওঠার কথা, তখনই মনোহর মরসুমের প্রত্যাশিত সুন্দরকে ছিনিয়ে নিচ্ছে ভুল রাজনীতি আর দুর্বৃত্তের বেলাগাম উগ্রতা। ধর্ষণ, হত্যা, অপরাধের বেআদব, বেআবরু লম্পঝম্প চারপাশের শান্তির স্থিতিকে, স্থিতির আমুল ভিতকে কাঁপিয়ে তুলছে। এ এক ভয়ঙ্কর দুলর্ক্ষণ। এর কারণ কী? ক্ষমতামত্ততার ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি আর বিকৃতি এবং সমাজে তার লোভ হিংসা আর বৈষম্যবোধ ছড়িয়ে দেবার হিসেবহীন, দৃষ্টিহীন লিপ্সার পরিনাম।
মানুষ আর নির্মীয়মাণ সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস বারবার প্রমাণ পেশ করে সতর্ক করেছে যে, শাসক যখন একমুখী, প্রবল আধিপত্যবাদী, প্রকারান্তরে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে; যখন যুক্তি ও বুদ্ধি হারিয়ে বসে, যখন বিদ্বেষ আর অন্ধতার গুরুভার চাপিয়ে দেয়, তখন সামাজিক অবক্ষয় সমূলে গ্রাস করতে মরিয়া হয়ে ওঠে দেশ আর রাষ্ট্রকে।নিহিত ঘূন পোকারা দৈত্যের চেহারা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে দেশঘাতী মানুষঘাতী অভিযানে, একসময় শাসকের দিকেও ধেয়ে আসে। গিলে খেতে চায় তার অস্তিত্ব। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিশ্বজুড়ে এরকম নৈরাজ্য আমরা দেখেছি, দেখেছি পশ্চিম এশিয়ায় এক দেশ ভেঙ্গে বহু দেশ গঠনের অস্থির প্রক্রিয়া। দেখেছি সোভিয়েত রাশিয়ার পতনে-- বসনিয়া, আফগানিস্তানে মানুষের হত্যালীলা, সমাজ আর রাজনীতিতে বেনজির অস্থিরতার উদ্ধগীরণ। সে এক উদ্ভট অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। হুমকি আর হুঙ্কার তার অব্যাহত। দুর্ভাগ্য, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে হাতে নিয়ে শাসক কোথাও প্রশ্রয় দিচ্ছে হিংসাকে, কোথাও বৈষম্যের বিকার ছড়াতে গড়ে তুলছে অবিশ্বাসের নীতি আর কৌশল। তার নীতির বিরুদ্ধে নৈতিকতা ও ন্যায়ের প্রশ্ন তুললেই মুক্তবুদ্ধিকে, বুদ্ধিজাত সংগঠিত শক্তিকে কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়ে বলে দিচ্ছে 'ওরা দেশদ্রোহী'। আমাদের দেশ, আমাদের প্রিয় মাতৃভুমিও আজ এই ঘোর সঙ্কটের সম্মুখীন।
অসমে এন আর সি-র নৈরাজ্যের অবসান নেই। হত্যা, হয়রানিতে মানুষে দিশেহারা। দেশভাগে ভিটেচ্যুত লক্ষ লক্ষ ভারতীয় 'দেশহীন' হয়ে ঝুলেছেন। শাসক তার বিকার আর অন্ধতা ঢাকা দিতে দেশজুড়ে এন.আর.সি করার হুমকি দিচ্ছে। দুষ্ট রাজনীতি, বৈষম্যের রাজনীতি যে কতটা নির্বোধ, বিবেকহীন হতে পারে, এটা তার নিকটতম দৃষ্টান্ত। নাগরিকপঞ্জিতে সমাজের বৃহত্তর দেহে যে দগদগে ক্ষত তৈরি হল, তাকে আড়াল করতে শাসক নাগরিক আইন সংশোধনের দাবিতে সোচ্চার। সোচ্চার বলাটা কম হয়, বলা উচিত তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নাগরিক বিল যদি সংসদে আটকে যায়, সম্ভবত অর্ডিনান্স জারি করে নাগরিকপঞ্জির ক্ষত আর রক্তক্ষরণে প্রলেপ লাগাবে। যা বড়ো করবে বিভাজনের অবরুদ্ধ ইচ্ছাকে। এরকম ধ্বংসাত্মক ইচ্ছাকে আমল দিয়ে একসময় দ্বিজাতিতত্ত্বের খসড়া তৈরি করেছিল মুসলিম লিগ। আজ যারা সাম্প্রদায়িক আধিপত্য স্থাপনের দাবিদার, যারা হিন্দু সংস্কৃতির উদারতা আর সহিষ্ণুতার স্রোতকে রুদ্ধ করতে অতিউৎসাহী, তারা পাকিস্তানি দ্বিজাতিত্ত্বে প্রয়োগ চাইছে মহাভারতের দিগন্তহীন, সীমান্তহীন অভিমুখে। এক্ষেত্রে তাদের সুপরিকল্পিত এন আর সি এবং প্রস্তাবিত নাগরিক আইনের দূরত্ব কোথায়? একটি আরেকটির পরিপূরক। একই মুদ্রার এক পিঠ আরেক পিঠকে খোরাক জোগাবে। এই দ্বিমুখী শত্রুনিধনে দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুঃসাহসী নেত্রী। তাঁর বিচক্ষণতা, তাঁর বৈষম্যহীনতা, তাঁর আপোসহীন শপথকে অভিনন্দন। আমরা বিশ্বাস করি, জয় সুনিশ্চিত। এই জয় থেকে শিক্ষা নেবে দক্ষিণ এশিয়ার লড়াকু সব দেশ, সব জাতিসত্তা, সব সম্প্রদায়। শত্রুবধে অস্ত্র তাঁর অবলম্বন নয়, অবলম্বন গান্ধীজির অহিংসা, শানিত, আবেগ তাড়িত যুক্তি এবং মানুষ আর সংবিধানের ঘোষিত, নিনাদিত সঙ্কল্প।
অপরপক্ষে, দম্ভমত্ত শাসকের ভরসা কলোনিয়াল লিগেসি, অযুক্তি আর মূঢ় বুদ্ধিমত্তা। ১৯৪৬ সালের কথা। দেশভাগ তখন আসন্ন, ব্রিটিশ সরকার বিদেশি চিহ্নিত করতে আইন তৈরি করে বলল, সন্দেহজনক বিদেশইকেই  তার ভারতীয় নাগরিকতার তথ্য-প্রমাণ পেশ করতে হবে। এখানে রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের দায় নেই। ১৯৮৫ সালের আইএমটিডি অ্যাক্টও এই দায় চাপাল নাগরিকদের ঘাড়ে। যার জমিজমার দলিল নেই, বন্যায়-ঝড়ে যে সব হারিয়ে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ভিটেহারার মতো ভাসতে থাকে, যে রাষ্ট্রবিধাতার নিষ্ঠুর খেলায় হত্যা, লাঞ্ছনা, ভাঙনের পর ভাঙন অথিক্রম করে দ্বিখন্ডিত দেশের আরেকপ্রান্তে এসে আশ্রয় নেয়, তার কাছে সব দলিলই মৃত। দলিলের লাশ খোঁজার দায়িত্ব সে কেন বইবে? তাহলে রাষ্ট্রের কাজ কী? ঘুসপেটিয়া বলে নিন্দিত পিপড়ে খুঁজতে নিরীহ হাতির ব্যবহার? হাতি যদি বেঁকে বসে, শুঁড়ে তুলে আছাড় দেয়, তাহলে কী হাতির বিরুদ্ধে শুরু হবে অভিযোগ আর অত্যাচার?
অসমে এনআরসি তৈরিতে শাসকের অপচয়, দুর্নীতি ও নৈরাজ্য সৃষ্টির ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত বেরিয়ে আসছে। খসে পড়ছে পলেস্তারা। এবার 'ক্যাব' দিয়ে বিভ্রান্তি, বিচ্যুতি আর বিভাজনের মুখোশ দিয়ে শাসক তার মুখ ঢাকতে চাইছে। এ এক মারাত্মক অন্যায়। অন্যায় ইতিহাসের বিরুদ্ধে। সংহতির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। ভারত এ আইন মানবে না। মানতে পারে না। তার সংবিধান, ১৯৫৫ সালে নির্মিত তার নাগরিক আইন বৈষম্য আর ক্ষুদ্রতাকে প্ৰশ্ৰয় দেয়নি। ক্ষুদ্রের বিরুদ্ধে বৃহতের আরও বৃহৎ মহৎ হয়ে ওঠার সাধনাকে গুরুত্ব দিয়েছে তার মহান মন্ত্র। মন্ত্রে আঘাত মানেই দ্রোহ, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ। একেই কি দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের নাম দিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দিয়েছেন মমতা? এটা তাঁর ব্যক্তিকতার ইচ্ছা নয়। সমষ্ঠির দাবি। এ দাবিকে মান্যতা দেবে ভারতীয়তার শক্তি, যাকে গণমণের অধিনায়ক বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
পুনশ্চ: যে প্রস্তাবিত আইন শরনার্থীর একাংশকে আশ্রয় দিয়ে সৌভাগ্যময় করে তুলবে, আর আরেকাংশের ওপর শঙ্কা ও অবিশ্বাস চাপিয়ে দেবে, এটা কোন ধরনের আইন? বিভাজনের ঘোষিত সংকল্পের আরেক খসড়া নয় তো?

জনপ্রিয়

Back To Top