গোবিন্দ গায়েন: সুন্দরবন অন্তঃপ্রাণ ছিলেন তুষার কাঞ্জিলাল। ওই প্রান্তিক অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযন্ত্রণা যঁাকে বিদ্ধ করত। সুন্দরবন নিয়ে তঁার বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে সুন্দরবনের নদীবাঁধ ভাঙনের সমস্যা, তার বিপদ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেন, প্রশাসনিক দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। এ বিষয়ে তঁার মৌলিক গবেষণা জাতীয়স্তরে স্বীকৃত হয়। ভারত সরকার ১৯৮৩ সালে ‌তঁাকে ‘‌জাতীয় শিক্ষক’‌ এবং ১৯৮৬ সালে ‘‌পদ্মশ্রী’‌ উপাধি দেয়। সুন্দরবনবাসীর সতর্ক প্রহরী ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই‌। ‘‌সুন্দরবন না বাঁচলে কলকাতা বাঁচবে না, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ রক্ষা করতেই হবে’—‌ এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি একদিকে যেমন সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে সভা সংগঠিত করতেন, তেমনি খবরের কাগজ, রেডিও, টিভিতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যেতেন লাগাতার। নদীবাঁধ ভাঙনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের খেঁাজে তিনি একবার জার্মানি, চারবার নেদারল্যান্ড যান। তঁার আমন্ত্রণে নেদারল্যান্ড থেকে সমুদ্র বিজ্ঞানীরা রাঙাবেলিয়ায় আসেন। এই বিজ্ঞানীরা সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীবাঁধ দেখে, নোনা জলের গতিপ্রকৃতি পরিমাপ করে দীর্ঘ গবেষণার বিস্তারিত রিপোর্ট তুষারবাবুর কাছে পেশ করেন এবং তুষারবাবু তা সরকারের নজরে আনেন। 
তুষারবাবু রাঙাবেলিয়ায় আসেন ১৯৬৭ সালে। বিশিষ্ট সমাজসেবী শ্রী সেবকচরণ দাস অনগ্রসর রাঙাবেলিয়ায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে, গ্রামে শিক্ষার প্রসারে সহায়তা করতে কলকাতা থেকে তুষারবাবুকে রাঙাবেলিয়া নিয়ে আসেন। তখন যে রাঙাবেলিয়া ছিল এক দুর্গম, যোগাযোগহীন প্রত্যন্ত এলাকা। স্যর ডানিয়েল হ্যামিল্টনের আবাদ নামে খ্যাত গোসাবা, রাঙাবেলিয়া, সাতজেলিয়াতে তিনটি বুনিয়াদি ‌স্কুল ছিল। জমিদারির অবসানের পর রাঙাবেলিয়া স্কুলটি প্রথমে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পরে অষ্টম মান পর্যন্ত সরকারি স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৬৭ সালে ওই স্কুলটি মাধ্যমিকে উন্নীত হয় ও পঃবঃ সরকারের স্বীকৃতি পায়। তুষারবাবু ১৯৬৭ সালে রাঙাবেলিয়া হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করেন। ক্লাস নেওয়ার সময়ই তিনি বুঝতে পারতেন অধিকাংশ ছেলেমেয়ে অভুক্ত। টিফিনে হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরে লাইন দিয়ে এসে ছুটির জন্য অনুরোধ করত ছাত্রছাত্রীরা। কারণ জিজ্ঞাসা করায় অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী না খেয়ে স্কুলে আসার কথা জানাত। তুষারবাবু উপলব্ধি করেন, পেটে খিদে নিয়ে যতই তত্ত্বের কথা বলা হোক, অঙ্ক, ইংরেজি শেখানো হোক, সবই বৃথা হবে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, অধিকাংশ ছেলেমেয়ে খুব গরিব ও দিনমজুর পরিবারের। প্রতিদিনের রোজগারে দিন চলে। মুষ্টিমেয় ছেলেমেয়েরা সঙ্গতিসম্পন্ন পরিবার থেকে স্কুলে আসে। এরপর মাস্টারমশাই এবং শিক্ষকরা মিলিতভাবে অবসরকালীন সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষা শুরু করেন। এই অর্থনৈতিক সমীক্ষার ফল তঁাকে কার্যত বাধ্য করে রাঙাবেলিয়াতে একটি সমাজসেবী সংগঠন গড়ে তুলতে।
‘‌তোমরা যে পার, যেখানে পার এক–‌একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়া আশ্রয় পাও, গ্রামগুলিকে ব্যবস্থাবদ্ধ কর, তাদের মধ্যে উৎসাহ সঞ্চার কর, যাহাতে নিজেরা সমবেত হইয়া গ্রামের সমস্ত কর্তব্য সম্পাদন করে সেইরূপ বিধি উদ্ভাবিত কর, এ কার্যে খ্যাতির আশা করিও না, এমনকি গ্রামবাসীদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে বাধা ও অবিশ্বাস স্বীকার করিতে হইবে’‌— কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের এই বাণীই শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাইকে রাঙাবেলিয়া গ্রামকে ভালবাসতে অনুপ্রাণিত করে। মূলত, আজীবন বামপন্থী মতাদর্শে দীক্ষিত হলেও প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। গান্ধীজি ও রবীন্দ্রনাথের সমাজ চেতনা, গান্ধীজির স্বরাজ, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, রাষ্ট্রচিন্তা এবং রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়নের ভাবনায় স্বেচ্ছাসেবী মানুষদের সমাজ গঠনে যুক্ত করাকে তিনি বেশি প্রাধান্য দেন। এই ভাবনা থেকেই ১৯৫৭ সালে সৃষ্টি করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘‌টেগোর সোসাইটি ফর রুর‌্যাল ডেভলপমেন্ট, রাঙাবেলিয়া প্রজেক্ট।
প্রান্তিক সুন্দরবনের গ্রাম জীবনে মেয়েদের পড়াশুনা করা খুবই দুরূহ ব্যাপার ছিল। মেয়েদের স্কুলে এনে শিক্ষা দেওয়া পরিবার এবং সমাজের কল্যাণে একান্ত দরকার এই বার্তা মাস্টারমশাই পাড়া মিটিং এবং অভিভাবকদের সভায় বোঝাতে সমর্থ হন। মা শিক্ষিত হলে সন্তান সন্ততি লেখাপড়া শিখবে, স্বামী, সংসারের পাশে দাঁড়াবে এই কথাগুলি তিনি সবার কাছে তুলে ধরেন। এ কাজে তিনি তাঁর সহধর্মিণী শ্রীমতী বীণা কাঞ্জিলালকে পাশে পেয়েছিলেন। মূলত তিনিও দমদম মতিঝিল গার্লস স্কুল থেকে পাকাপাকিভাবে সুন্দরবনের রাঙাবেলিয়ায় চলে আসেন। তাঁরই হাতে গড়া ‘‌রাঙাবেলিয়া মহিলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট কো–‌অপারেটিভ সোসাইটি’‌ সংগঠন। গ্রামে মহিলাদের সংগঠিত করে তাঁতে তৈরি শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ব্যাগ, পুরাতন কাপড়, শতরঞ্চি, খেশ, গ্রাম থেকে মধু সংগ্রহ করে পরিশুদ্ধ করা এবং তা বাজারজাত করার ব্যবস্থা করে এই সংগঠন। আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে মধু প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, লেবেলিং করে মহিলা সমিতির সেলস কাউন্টার, বিভিন্ন মেলা ও পাখিরালা বিপণন কেন্দ্রের মাধ্যমে সুন্দরবনে পর্যটকদের কাছে বিক্রির জন্য রাঙাবেলিয়া সমিতি মহিলা সংগঠনকে দায়িত্ব দেয়। গ্রামে গ্রামে মহিলাদের সঞ্চয়ে লক্ষ্মীর ঝাঁপি বা মাটির পাত্র দেওয়া হয়। সুন্দরবনে শিল্প না হলেও মাস্টারমশাইয়ের হাত ধরেই গ্রামে গ্রামে ছোটখাটো হস্তশিল্পে জোয়ার আসে। চাষাবাদে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার প্রভৃতি আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে, মাটি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সার, কীটনাশক, প্রায় ৮/‌৯টি থানা এলাকায় কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষিক্ষেত্রে একপ্রকার জোয়ার সৃষ্টি হয় বলা 
যেতে পারে। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পশুপালন, পশু প্রজনন, পশু চিকিৎসক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ, হাঁস, মুরগি, শূকর চাষে আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ। ঔষধপত্র ও সঠিক সময়ে পশু চিকিৎসককে গ্রামে গ্রামে পাঠিয়ে পশু মৃত্যুর মতো মহামারী রোধ করার কাজে রাঙাবেলিয়া মডেল ফার্ম বা পশু চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে মাস্টারমশাই সুন্দরবনে এক অনন্য নজির গড়ে তোলেন।
রাঙাবেলিয়া প্রজেক্টের বিভিন্ন শাখা সংগঠনগুলিও মাস্টারমশাইয়ের গ্রামোন্নয়নের ভাবনাকে সফল করতে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এ ছাড়া সংস্কৃতি সংসদের মাধ্যমে বিভিন্ন দ্বীপে সাংস্কৃতিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। শ্রীমতী বীণা কাঞ্জিলালের লেখা অজস্র গান, তরজা, মাঝিমাল্লা নিয়ে লেখা গীতি আলেখ্য পরিবেশনে দ্বীপাঞ্চলের মানুষগুলোর মনে নতুন উৎসাহ ও উন্মাদনা সঞ্চার করে তুলেছিল। শ্রীমতী বীণা কাঞ্জিলাল ‘‌দিদিমণি’‌ নামে সকলের কাছে সুপরিচিত ছিলেন। দিদিমণিও ছিলেন সকলের সুখে দুঃখের সমান অংশীদার। গ্রামে গ্রামে আদিবাসী মেয়েদের চুল আঁচড়ে দেওয়া, সিঁদুর পরিয়ে দিদিমণি তাদের একান্ত আপন করে নিতেন। তারাও তাঁকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন। স্বামী স্ত্রী এই যুগল সুন্দরবনের গ্রামীণ মানুষের সার্বিক বিকাশে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।
(‌লেখক প্রাক্তন শিক্ষক, রাঙাবেলিয়া হাইস্কুল)‌

জনপ্রিয়

Back To Top