দেবেশ রায়: আমি ‘‌ফেসবুক’‌–এ নেই।
দিল্লি থেকে আমার এক বন্ধু সন্ত্রস্ত খবর পাঠিয়েছেন আমার মোবাইলে। কংগ্রেস–‌বাম জোট‌ না হওয়ার ফলে বিজেপি–‌বিরোধী ভোট বেড়েও যেতে পারে— এমন একটা সম্ভাবনার কথা আমি ‘‌আজকাল’‌–‌এ লিখেছিলাম, সংখ্যাতত্ত্বের একটি সূত্রের ব্যাখ্যা–‌সহ। ব্যাখ্যাটা খুব সোজা। কোনও সচেতন, রাজনীতি–‌করা, মার্কসবাদী কমিউনিস্টের যদি মনে হয় যুদ্ধটা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, তা হলে যে–‌দল নিশ্চিত বিজেপিকে হারাতে পারবে, সেই তৃণমূলকেই ভোট দেব। আমি কানে শুনি না। ফোনও না। অন্তত জনা ছয়েক ফোন করে জানিয়েছেন, তাঁরা তাই করবেন। সেই ছ’‌জনই কোনও–‌না–‌কোনও কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। তাঁদের কারও বয়সই ৭০–‌এর কম নয়। তাদের তিনজনের কথা জানি— যাঁদের কাকা–‌জেঠারা বহু বছর জেল খেটেছেন।
আমার দিল্লির বন্ধু জানিয়েছেন— আবার ওই লেখাটির চার–‌পাঁচ লাইন উদ্ধৃত করে একজন আমাকে প্রশ্ন করেছেন। উদ্ধৃত করেননি— তাঁর যা মনে হয়েছে সেটা আমার মুখে বসিয়েছেন। আমি নাকি লিখেছি কংগ্রেস বা বামফ্রন্টকে ভোট দিলে বিজেপিকে রোখা যাবে না। আমি কী লিখেছি তা তো কাগজে ছাপা আছে। দেখে নিলেই হত। আলাদা–‌আলাদা করে যদি কংগ্রেস ও বামফ্রন্টকে, কংগ্রেস ও বাম সমর্থক ভোটাররা ভোট দেন, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে হারানো যাবে?‌ ছু–‌মন্তরে?‌ সুতরাং একজন কমিউনিস্ট ভোটার এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যদি নেন যে, ফ্যাসিবাদকে হারানো আগামী পার্লামেন্টের প্রধান কর্মসূচি তাই তৃণমূলকেই ভোট দেব— সেটা তো খুব স্বাভাবিক ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হতে পারে।
আমাকে একটু ঠেস দিয়ে বলা হয়েছে যে, যদি ৪২–‌এ ৪২টাই তৃণমূল পায়, তা হলে কি বিজেপি–‌র সমস্ত কুকাজে বিরোধিতা করবে ‘‌আপনার অধুনা প্রিয় রাজনৈতিক দলটি?‌’‌ এটা প্রথমত কুরুচি। দ্বিতীয়ত, এমন প্রশ্নের মধ্যে লুকনো আছে এমন ধারণা যে, বিজেপি জিততেও পারে। আমার রাজনীতি আমার জীবন ও মননের অঙ্গাঙ্গী। তার বিচার তো হবে আমার সারা জীবনের কাজকর্ম ও লেখালেখি দিয়ে। আমি তো বিজেপি–‌র অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে কলকাতার ময়দানে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর হাত ধরাধরি ও ভাষণের কথা তুলিনি। বা, ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য জ্যোতি বসুর নাম প্রস্তাবিত হলে পার্টির প্রত্যাখ্যানের ‘‌হিমালয়ান ব্ল্যান্ডার’‌–‌এর কথা তুলিনি। বা, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পার্টি থেকে বের করে দেওয়ার কথা তুলিনি। তখনও বুঝিনি, এখনও বুঝিনি— কোন সিদ্ধান্ত ছিল বিপ্লবলক্ষ্য রণকৌশল আর কোনটা ছিল সেই মুহূর্তের একটা ট্যাকটিস। কিন্তু এখন তো দেখছি বামপন্থীরা ফ্যাসিবাদকে ফ্যাসিবাদ বলে চিনতে পারছেন না। ফ্যাসিবাদ তো এখন প্রমাণিত ইতিহাস। জানা খুব কঠিন না। কিন্তু জানার প্রয়োজন বোধ করতে হবে। তৃণমূলও ফ্যাসিস্ট বলে বিজেপিকে ছাড়ান দেওয়া যায় না। শুধু ফেসবুকের উদ্ধৃতি থেকে রাজনীতি হয় না। আমার ‘‌অধুনা প্রিয়তা’‌ তো কোনও বিষয়ই হতে পারে না।
২০১৭–‌এর ২৫ জুলাই প্রায় বছর দু–‌এক আগে আমি ‘‌আজকাল’‌–‌এ লিখেছিলাম— ‘‌ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের পশ্চিমবঙ্গই যোগ্যতম জায়গা।’‌ তারও আগে ২০ জুন ‘‌বিজেপিকে প্রতিহত করার যে কোনও চেষ্টাই বামপন্থা?‌ লিখেছিলাম। এগুলো তো রাজনৈতিক সূত্র। তখন পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি–‌অমিত শাহের সরকারকে বলা হচ্ছিল ‘‌অধৈর্যশীল’‌, ‘‌অসহিষ্ণু’‌, ‘‌অঘোষিত জরুরি অবস্থা’‌। ওই বছর ১৮ জুলাই অমর্ত্য সেন বলেন— এগুলো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের মতো ব্যবহার। প্রসঙ্গত তিনি ইতালিয়ান ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিবরণ বলেন। অমর্ত্য সেন নিজেই তো ইতালীয় অর্থনীতিবিদ শ্রোফার ছাত্র। আর শ্রোফা ছিলেন গ্রামশ্চির অন্তরঙ্গ বন্ধু। শ্রোফা চেষ্টা করেছিলেন গ্রামশ্চিকে বাঁচাতে। এই সব জানা ইতিহাস অমর্ত্য সেন সেই সাংবাদিক সম্মিলনে বলেছিলেন আমাদের সচেতন করতে ও ইতালীয় ফ্যাসিবাদের সঙ্গে ভারতীয় ফ্যাসিবাদের মিল দেখাতে।
বামফ্রন্ট ও তার নেতা পার্টি তো অমর্ত্য সেনকে ডেকে একটা বড় মিটিং করতে পারতেন। কিন্তু তাঁদের তো কিছু জানার নেই এক তাঁদের নিজেদের কাছ থেকে ছাড়া।
ঠিক এই সময়ই সিপিআই (‌এম)‌–‌এর কোনও এক বার্ষিক বক্তৃতায় ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব বলেছিলেন— ‘‌ভোটে দাঁড়িয়ে যদি জামানত জব্দ হয়, তা হলে ভোটে দাঁড়াব কেন। এতে তো পার্টির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। আর, এখন তো প্রয়োজন প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্য।’‌
আমি সেই বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম। পার্টির কাছে তো তার রেকর্ড থাকার কথা। ছেপে বের করুন না।
আশ্চর্য মিল। ১৯৩২–‌এর ভোটের আগে জার্মানিতে সোশ্যাল ডেমোক্র‌্যাটিক পার্টির সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির জোট হল না স্তালিন–‌নিয়ন্ত্রিত কমিনটার্নের নেতৃত্বে— সোশ্যাল ডেমোক্র‌্যাটরাই তো ফ্যাসিস্ট, তাদের সঙ্গে কী করে ফ্যাসিবাদ–‌বিরোধী জোট হবে।
কমিনটার্ন নেই, স্তালিন নেই, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বলে একটি পৃথিবী আছে। সেখানে বামফ্রন্টকে হারিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার চালাচ্ছে। সুতরাং— মোদিকে ফ্যাসিস্ট বলতে হবে মমতাকেও ফ্যাসিস্ট বলতে হবে।
এটা, আর যাই হোক, মার্কসবাদী যুক্তিবিজ্ঞান নয়। এমন যুক্তিতে মমতাকেই ফ্যাসিবাদের নিয়ামক মানা হয়েছে। আর মোদিকে ভাবা হয়েছে ফ্যাসিবাদের ছোট পার্টনার। এখন বিচারবিভ্রাটের সোজা কারণ:‌ যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেই।
ভয় করছে।
৮৭ বছরের ব্যবধানে জার্মান ও বঙ্গীয় কমিউনিস্টদের ভাষার মিলে।    

জনপ্রিয়

Back To Top