সুতপা বসু- গত কয়েকমাস ধরে সারা বিশ্বের মানুষের  জীবনযাপনের ধারাটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। বদলেছে করোনাভাইরাসের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।  সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক, শৈল্পিক— প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর  প্রভাব পড়েছে। যে প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। রোজকার জীবনযাপনে  স্বাস্থ্যবিধি, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, পেশা, ক্রয়, বিক্রয়, সঞ্চয়ের  প্রতিটি ক্ষেত্রে কিছু না কিছু পরিবর্তন এসেছে।
এই অতিমারির দুঃসময়ে মানুষে মানুষে শারীরিক দূরত্ব  বজায় রাখার আবশ্যিকতায় পৃথিবী জুড়ে ‘‌লকডাউন’‌।  মানুষ দিনের পর দিন গৃহবন্দি। এই ভয়াবহ, অসহনীয় পরিস্থিতিকে জয় করতে আমাদের দেশের এক অংশের মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এক নতুন জীবনধারায়। তার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে ‘‌অনলাইন’‌। এর মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় এবং প্র‌য়োজনীয় হয়ে উঠেছে বাড়ি থেকে  অনলাইনে অফিসের কাজ বা ‘‌ওয়ার্ক ফ্রম হোম’‌। এর সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের ‘‌অ্যাপ্লিকেশন’ বা ‘‌অ্যাপ’‌–‌এর  সাহায্যে অনলাইনে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো, ক্লাস করা। রয়েছে অনলাইনে দোকান–‌বাজার করা, অনলাইনে ব্যাঙ্কের  কাজ করা,  রান্নাকরা খাবার  কেনা, ওষুধ কেনা, বিভিন্ন পরিষেবার বিল  জমা  দেওয়া–‌সহ অনেক কিছু। আগে থেকেই  ভারতবর্ষের কিছু মানুষ এই ধরনের অনলাইন ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু সংখ্যায় তা ছিল অতি অল্প। ‘‌তথ্য প্রযুক্তি’ সেক্টরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অথবা বহুজাতিক সংস্থার কিছু অংশে। যে কাজ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্ত। বাকি যেটুকু যা হয়েছে তা বিচ্ছিন্নভাবে। কোনও কোনও প্রযুক্তি উৎসাহীও ব্যক্তিগতভাবে পেশায় বা শখে ‘‌অনলাইন’‌ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছেন। করোনার এই  কঠিন সময়ে এসে  এই ব্যবস্থা ছড়িয়ে পড়ল। বাধ্য হয়েই মানুষকে অভ্যস্ত হতে হল। যাঁরা দীর্ঘদিন প্রযুক্তিকে এড়িযে চলেছেন, আড়ষ্টতা বোধ করেছেন, মানসিকভাবে অবরুদ্ধ থেকেছেন, তাঁরাও মেনে নিতে বাধ্য হলেন। ঘরবন্দি স্তব্ধ  হয়ে যাওয়ায় পৃথিবীকে অবশ্যম্ভাবী অর্থনৈতিক মন্দা থেকে খুব সামান্য হলেও প্রতিহত করতে এই মুহূর্তে অন্য বিজ্ঞানসম্মত পথ ছিল না।  
একই সঙ্গে আমাদের দেশে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে নতুন নতুন ‘‌অ্যাপ’‌। ভিডিও কনফারেন্সে ডাক্তার  দেখানোর কথা আগে আমরা আগে কতটা ভাবতে পেরেছিলাম?‌ টেলিমেডিসিন জানতাম কী?‌ বিদেশে এমনটা হয় শুনেই এসেছি শুধু। এখন আমরাও শিখেছি। পাশের ঘরে হোমা কোয়ারেন্টিনে থাকা আত্মীয় বা  হাসপাতালে থাকা কোভিড পজিটিভ আত্মীয়ের সঙ্গে এখন একমাত্র যোগাযোগ ফোনকল বা ভিডিও  কনফারেন্সে। চিরকাল হাতে ছুঁয়ে পড়ে দেখা বহু পত্রিকা, বই ডিজিটাল চেহারায় চলে এসেছে মোবাইলে, ল্যাপটপে। কেনার সুযোগ মিলছে। সংবাদমাধ্যম অনলাইন কাজে নিজেকে পাকাপোক্তভাবে গুছিয়ে নিয়েছে। বাড়িতে বসে পড়ুয়াদের স্কুল করা, আঁকা বা গান শেখা, বাড়িতে বসেই শিল্পীদের তৈরি করা গান, নাচ, নাটক, সিনেমার ভিডিও আজ গোটা বিশ্বের মতোই আমাদের বাংলাতেও সহজ, চেনা বিষয় হয়ে উঠেছে।
পেশায় তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকা একজন কর্মী হিসেবে ‘‌ওয়ার্ক  ফ্রম  হোম’‌ ব্যাপারটি  একটু বিশদে বলার প্রয়োজন বোধ করছি। Remotely, অর্থাৎ ‘‌দূরে থেকে‌ কাজ’‌ করার পদ্ধতিটি  নতুন  না  হলেও প্রাককরোনা ভারতবর্ষে এটি  বিশেষ জনপ্রিয়  হয়নি। তবে আজ থেকে দশ বছর আগেও গুটিকয়েক  বহুজাতিক সংস্থায় খুব সীমিত পরিসরে এর প্রচলন  ছিল। তখন অনেক দেশে, বিশেষ করে আমেরিকায়  ‌‘‌ওয়ার্ক ফ্রম হোম’‌ বিষয়টি ছিল যথেষ্ট জনপ্রিয়।  তথ্যপ্রযুক্তি, মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশন, কনটেন্ট রাইটিং,  গ্রাফিক্স, অ্যানিমেশন, ডিজাইনিং ইত্যাদি অনেক ধরনের  কাজ তখন ওসব দেশে অনেকেই বাড়িতে থেকে  করতেন। তাঁরা বলেন ‘‌হোম অফিস’‌। এদেশে বিষয়টি  জনপ্রিয় না–‌হওয়ার দুটি প্রধান কারণ হল, এদেশে   ইন্টারনেট পরিষেবা অপোক্ত  এবং এদেশের  কর্মকর্তা, কর্মী উভয়েরই Remote management  সম্পর্কে  মানসিক বাধা কাজ করেছে।  কাছ থেকে  তত্ত্বাবধান   ছাড়া কাজ করানোর  এবং করার উপায় ও অভ্যাস  আয়ত্তে আসেনি। এছাড়া ঘরে ঘরে ক‌ম্পিউটারও ছিল না।
অনলাইনে অফিসের কাজ করার জন্য প্রয়োজন  নিরবচ্ছিন্ন হাইস্পিড  ইন্টারনেট পরিষেবা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সংযোগ, সমস্ত প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার ও  সফটওয়্যার সমৃদ্ধ একটি কম্পিউটার। তাতে উপযুক্ত  firewall  ও  virus,  malware,  hacking,  data privacy breach,  data theft,  ইত্যাদি নানা উৎপাত  প্রতিহত করার উপযুক্ত  সফটওয়্যার থাকা আবশ্যক।  এখন অধিকাংশ কাজেই  cloud platform ব্যবহৃত  হয়,  অতএব data security প্রধান বিষয়।
যে সব সংস্থায় এই পন্থা আগে থেকেই প্রচলিত ছিল ও পরিকাঠামো তৈরিই ছিল, সেখানে হাজার হাজার মানুষ বাড়ি থেকে কাজ করেই তাদের যথাযথ  productivity ও contribution দিয়ে  কোম্পানিগুলিকে,  অর্থনীতিকে আগলে রেখেছে। অন্য সংস্থারাও তড়িঘড়ি পরিকাঠামো তৈরি করে তাদের production অব্যাহত রেখেছে। যে সব সংস্থার এই পরিকাঠামো নেই বা এই পন্থায় কাজ চালানোর উপায় নেই, সেখানে ব্যবসা না হওয়ায় দুর্ভাগ্যবশত বহু মানুষ কর্মহীন হয়েছে।
শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বা ব্যাঙ্কিং সেক্টর নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,  স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রভৃতি যে সব ক্ষেত্রে সম্ভব, অনেকেই এই ‘‌অনলাইন’‌ পরিকাঠামোয় কাজ করার সুবিধা ও  বিপুল সম্ভাবনা অনুধাবন করে এই পন্থাকে আত্মস্থ ও করায়ত্ত করে ফেলেছে। এতে কোম্পানি, কর্মচারী  উভয়েই নানাভাবে  উপকৃত। ভবিষ্যতে একদিন নিশ্চয়ই অতিমারির প্রকোপ কমবে। কিন্তু, এই  যে বিপুল সংখ্যক মানুষ অনলাইন জীবনযাত্রার সঙ্গে অভ্যস্ত  হয়ে  গেল, বিবর্তনের এই ধারা কিন্তু আমাদের দেশে অনেকাংশেই অব্যাহত থাকবে। রাখতেই হবে। দেশের অর্থনীতির সামনে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্ন উঠতে পারে আমরা কি কেবল নগরজীবনের  আঙ্গিকে ভবিষ্যতে অনলাইন নির্ভর জীবনযাত্রার ছবি  আঁকছি? বাস্তবে গ্রাম্যসমাজ ও তার জীবনযাত্রার নিরিখে  এর কি আদৌ প্রাসঙ্গিকতা আছে?
নিশ্চয়ই আছে। কৃষিপ্রধান দেশ ভারতবর্ষ। এটা সত্যি যে  তৃতীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত এই দেশে এখনও অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আশ্রয়, বিদ্যুৎ সংযোগ অপ্রতুল। কিন্তু, যেখানে নেই সেখানেই তো কাজ করার সুযোগ। যা  সম্পৃক্ত  নয়, সেখানে ভরে দেওয়ার সম্ভাবনা। বর্তমানে  যদিও গ্রামের খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই এই ব্যবস্থায়  উপকৃত হন সেটা হবে সবথেকে বড় পাওনা। এক সময়ে গ্রামে মোবাইল সংযোগের কথা ভাবাও যেত না, কম্পিউটার কী জানতেন না অনেকেই। এখন তো সেই চিত্র পাল্টেছে। বিভিন্ন ‘‌অ্যাপ’‌–‌এর  সাহায্যে তথ্য দিয়ে  কৃষিকাজে সহায়তা, অনলাইনে লেখাপড়া ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির সুযোগ, দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া, ইত্যাদির অস্তিত্ব ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। আশা করব, করোনার প্রকোপ থেকে শিক্ষা নিয়ে, অদূর ভবিষ্যতে  সরকার পরিকাঠামোকে আরও উন্নত করবে। আরও বহু সংখ্যক মানুষকে এর আওতায় এনে, এর সুযোগ নিয়ে  উপকৃত হওয়ার ব্যবস্থা করবে, এবং অনলাইন  জীবনযাত্রার এক বিপুল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে ত্বরান্বিত করবে।

লেখক সাহিত্যিক এবং তথ্যপ্রযুক্তি সম্পৃক্ত সংস্থায় দীর্ঘদিন কর্মরত

জনপ্রিয়

Back To Top