শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়: যঁারা বলছেন ১৯ মার্চ জাতির উদ্দেশে আদরণীয় প্রধানমন্ত্রীজির ভাষণ থেকে কিছুই পাওয়া গেল না, তঁারা ঠিক কথা বলছেন না!‌ আর যঁারা বলছেন, মোদিজি কী বলতে চাইলেন, কিছুই বোঝা গেল না— তঁারা বিষয়টা আরও ঘুলিয়ে দিতে চাইছেন!‌ এবং যঁারা এটা নিয়েও রাজনীতি করছেন, বা অসভ্য রঙ্গ–রসিকতা, তঁাদের কথায় সামান্য গুরুত্ব দেওয়ারও মানে হয় না। কারণ প্রধানমন্ত্রী যা বললেন, তা আদতে খুব সোজাসাপ্টা, সাদামাটা। উনি বললেন, যে হে আমার প্যারে দেশবাসী, আত্মসংযম অভ্যাস করুন। করোনা ভাইরাস ছড়াচ্ছে সারা বিশ্বে। ভারতের মতো জনবহুল দেশ তার আওতা থেকে বঁাচতে পারবে, এমন দুরাশা না করাই ভাল। কিন্তু আগেই ভয় পাওয়ার তো মানে হয় না!‌ কাজেই একদিনের স্বেচ্ছা বন্দিত্ব। জনতা কারফিউ। এমনিতেই রবিবার ছুটির দিন। সকালের বাজারহাট বা সন্ধের আড্ডা বাদ দিলে বাড়ির বাইরে যাওয়ার তেমন দরকার পড়ে না। কাজেই রোববার দিয়েই শুরু হোক। চাইলেই বাড়ির বাইরে বেরোতে পারবেন না— এই ভাবনাটা কেমন লাগে, সইয়ে নেওয়া যায় কি না, ধাতস্থ হতে ক’‌দিন লাগতে পারে, সেটা নিজেই বুঝে নিন।
রবিবারটা দিনটা দিনমজুরদের জন্যেও ভাল। যঁারা দিন আনেন, দিন খান। ওদিনটা সাধারণত তঁাদের স্বেচ্ছা–ছুটি, রোজগার বন্ধ। কাজেই এক দিনের জনতা কারফিউয়ের প্রভাব তঁাদের রুটিরুজিতে কতটা পড়বে, সেটা বোঝার উপায় নেই। অথবা যে দোকানি রবিবার ব্যবসা বন্ধ রাখেন, যে হাটুরে ওই দিন বাড়িতে থাকেন, খেতের কাজকর্ম করেন, তঁারা আন্দাজ করতে পারবেন না, যে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে যদি ভারতেও কখনও ‘‌লক ডাউন’‌ পরিস্থিতি সত্যিই তৈরি হয়, তা হলে আর্থিকভাবে তঁারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কিন্তু সেটাই জানা বেশি জরুরি ছিল। 
‘‌কর্মদিবস’‌ নষ্ট হলে, রাজনৈতিক বন্‌ধ বা অন্য কোনও আপৎকালীন পরিস্থিতির কারণে রোজগার বন্ধ থাকলে কতটা ক্ষতি হতে পারে, খেটে খাওয়া মানুষের অবশ্য সে আন্দাজ আছে। সরকারেরও সেই হিসেবটাই সবার আগে করা উচিত ছিল। যে এমন জরুরি অবস্থায় সাধারণ নাগরিকের আর্থিক ক্ষতি কতটা হতে পারে। সেই ক্ষতি পূরণের দায়িত্ব সরকার কতটা নেবে, সেটা নিশ্চিত করা উচিত ছিল। যেমনটা করলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রঁ। জাতির উদ্দেশে ভাষণে স্পষ্ট ঘোষণা করে দিলেন, ফ্রান্সে চলতি লক ডাউনের কারণে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের যে আর্থিক ক্ষতি হবে, সেটা পুষিয়ে দেবে সরকার। প্রধানমন্ত্রী মোদির তরফে সেরকম কোনও আশ্বাস পেলে স্বেচ্ছা কারফিউ আরও উৎসাহিত, আরও মজবুত হত। অন্তত সরকারের ‘‌ইকনমিক টাস্ক ফোর্স’‌ সেরকম কিছু ভাবছে কি না, সেটুকু জানালেও হত। অথবা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যেভাবে বাড়ছে অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীর দাম, দোকান থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে চাল–ডাল–নুন–তেল, সেটা আটকাতে কোনও টাস্ক ফোর্স থাকবে কি না, মানুষ সে নিয়ে অভিযোগ জানালে দ্রুত প্রতিবিধান হবে কি না, সেটা বলার দরকার ছিল।
কাজেই যঁারা বলছেন, বিবেচক প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে মানসিকভাবে তৈরি রাখার জন্য ‘‌জনতা কারফিউ’‌–এর মতো এমন চমৎকার এক নিদান হঁাকলেন, তঁারা ঠিক কথা বলছেন না। দেশের অধিকাংশ লোক মাসমাইনের চাকরি করেন না। তঁারা রোজ কাজে যান। কাজ শেষে মজুরি পান। একদিন যেতে না পারলে তঁাদের মাথায় হাত পড়ে। সেই দিনটা কুড়িয়ে বাড়িয়ে কিছু খেয়ে নিলেও পরের দিনটা কী খাবেন, সেই চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে যায়। চাল, আটা, নুন, আলু, পিঁয়াজের মতো সামান্য জিনিসেরও কালোবাজারি শুরু হলে এই মানুষগুলো কোনও দিশা পান না। মাত্র এক বেলার জনতা কারফিউ এঁদের কোনওভাবে আশ্বস্ত করবে না। না, মানসিকভাবে তৈরিও করে দেবে না কঠিন সময়ের জন্য।
অনেক জরুরি বিষয়ই আসলে এড়িয়ে গেলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ১৩০ কোটির বিরাট দেশে কোনও সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই যে যথেষ্ট নয়, সেটা সহজ সত্যি। মেনে নেওয়াই ভাল। হালের উদাহরণ ইতালি। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যায় জেরবার, ইওরোপীয় ইউনিয়নের বিত্তবান সদস্যদের দয়া–দাক্ষিণ্যে কোনওমতে চালিয়ে নেওয়া ইতালি যে ভেতরে ভেতরে ফেঁাপরা হয়ে গেছে, কয়েকশো প্রাণ নিয়ে বুঝিয়ে দিল নোভেল করোনা। হাসপাতালে জায়গা নেই, থাকলেও যথেষ্ট লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা নেই, আপৎকালীন অবস্থার মোকাবিলা করার পরিকাঠামো নেই। ফলে বহু অসুস্থকে কার্যত বিনা চিকিৎসায় মরতে দিতে বাধ্য হল ইতালি। দ্বিতীয় কোনও উপায় ছিল না। ভারতেও যদি একই পরিস্থিতি দেখা দেয়, করোনা যদি একই মারণ ব্যাপকতায় ছড়িয়ে পড়ে শহরে–গ্রামে, তা হলে কী হবে, কেউ জানে না!‌ অথবা জানে। ভয়ঙ্কর হবে পরিস্থিতি। মহামারী। সেই সম্ভাব্যতা রুখতে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে, কতটা তৈরি আছে, জানাতে পারতেন প্রধানমন্ত্রী। জানালেন না।
হ্যাঁ, সরকার প্রধানরা জাদুকর হন না। চাইলেই সবকিছু করতে পারেন না। কারণ সেই সামর্থ্য থাকে না। বিত্তশালী আমেরিকা বা ইওরোপই যেখানে সংক্রমণ সামাল দিতে নাজেহাল, সেখানে ভারতের ক্ষমতা আর কতটুকু। কিন্তু সদিচ্ছাটুকু অন্তত জানাতে পারতেন প্রধানমন্ত্রী। বোঝাতে পারতেন, সামান্য, সীমিত সামর্থ্য নিয়েই লড়ে যেতে তিনি তৈরি। উদাহরণ ছিল হাতের কাছেই। না, ফ্রান্স, জার্মানি নয়, পশ্চিমবঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি জানেন, সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো যথেষ্ট নয়। তিনি রাজ্যের সমস্ত মুখ্য বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা সংস্থাকে একজায়গায় এনে প্রথম যে আবেদন রাখলেন, তা হল ‘‌মানবিক’‌ দৃষ্টিতে পরিস্থিতির বিচার করুন। অর্থাৎ, করোনা সংক্রমণ সম্ভাবনার ভয়ার্ত সময়ে বাণিজ্যিক সুফলের কথা ভাববেন না। মানবিক হোন। ‘‌পিপিপি’‌ মডেলের কথা বহু শোনা যায়, মমতা উদ্যোগ নিয়ে দেখালেন, সরকারি–বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগ কীভাবে জনহিতে কাজে লাগানো যেতে পারে। নিঃসন্দেহে লোকে একটু সাহস পেল, নার্সিংহোম মালিককে স্পষ্ট বার্তা, যে এটা একজোটে লড়াইয়ের সময়, ব্যবসার নয়।
প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্য চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের সমবেত অভিনন্দন জানানোর কথা বলেছেন। জনতা কারফিউয়ের সন্ধেতে, ঢাক ঢোল, কঁাসর ঘণ্টা, নিদেনপক্ষে ঘটি বাটি বাজিয়ে জানান দিতে বললেন নিজেদের কৃতজ্ঞতা। অবশ্যই। সেটাও দরকার। আচ্ছা, আপাতত সেটুকুই হোক। যথেষ্ট নয় যদিও। বরং করোনা পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে সরকার ঠিক কী কী ব্যবস্থা নিল, সেটা জানতে পারলে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরাও বরং একটু ভরসা পেতেন। আমরা ঘণ্টা না বাজালেও!‌

গাড়ি রাখার জায়গাতেই অস্থায়ী হাসপাতাল। ইতালির ক্রেমোমায়। ছবি: এএফপি   ‌

জনপ্রিয়

Back To Top