পবিত্র সরকার: হিন্দি সম্বন্ধে দক্ষিণ ভারতের, বিশেষত তামিলভাষীদের যেমন একটা সন্দেহ বা বিদ্বেষ আছে— তাদের মধ্যে কিছু তামিলভাষীর শহিদ হওয়ার ইতিহাস তাকে বিশেষ শক্তি দিয়েছে— তার তুলনায় বাঙালি একটু দু–মুখো মনোভাব পোষণ করে। বাঙালি প্রচুর হিন্দি ছবি দেখে, টেলিভিশনে সিরিয়ালও দেখে (এতে বাংলাদেশের বাঙালিরাও বাদ নেই), হিন্দি গান সম্বন্ধেও তার কোনও আপত্তি নেই।  উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, কবির, মিরাবাইয়ের ভজন, নানা ধরনের গজল তো দীর্ঘদিন তার শ্রদ্ধা পেয়েছে। সে হিন্দি বলয়ে কাজে বা বেড়াতে বা তীর্থ করতে যায়, তখনও ভুলভাল হলেও হিন্দি বলতে তার আপত্তি নেই। এক সময় কলকাতার পাঞ্জাবি বা অন্য ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সঙ্গেও তারা হিন্দি বলেই শুরু করত, ট্যাক্সি ড্রাইভার যতক্ষণ না বলতেন, ‘আমি বাঙালি’। কিন্তু অন্য দিকে হিন্দি ভাষা সম্বন্ধে তার একটু প্রাচীন অশ্রদ্ধা আছে— যখন সে অবাঙালিদের ‘মেড়ো’ আর ‘খোট্টা’ ইত্যাদি বলত, তখনকার। কারণ তখন, কলকাতা নগর গড়ে–ওঠার সময়ে সাধারণ কুলি–মজুর–মুটে শ্রেণির হিন্দির সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় ঘটে, সেই হিন্দি ‘ছোটলোকদের ভাষা’, যাকে ‘বাজার হিন্দি’ বলে তাই, এই রকম একটা ধারণা হয়েছিল। তার পরে হিন্দিভাষীদের মধ্যে বিশাল এক ধনী শুধু নয়, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে, তাঁরা সারা দেশেরই অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, সাহিত্য–সংস্কৃতিতেও তাঁদের বিপুল অগ্রগতি হয়েছে। এই উচ্চ–মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত, সংস্কৃতিমান হিন্দিভাষী সমাজের সঙ্গে সাধারণ বাঙালির পরিচয়ের পথ খুব বেশি খোলা নেই। কলকাতায় ভারতীয় ভাষা পরিষদ, নাট্য শোধ সংস্থান, মাড়োয়ারি বা রাজস্থানি সমাজ, কিংবা হিতেশ শর্মা ও তাঁর সঙ্গীরা কিছু চেষ্টা করেন। কলকাতার বাইরে ভোপালের কালিদাস সম্মান সমিতি, দিল্লির সাহিত্য অকাদেমিও কিছু যোগাযোগের সূত্র তৈরি রাখেন।  বাঙালিদের দিক থেকে তেমন সাংগঠনিক উদ্যোগ আছে বলে আমার জানা নেই।    
এ তো গেল হিন্দিকে খানিকটা তুচ্ছ করার অন্তর্গত কারণ। কিছুটা তুলনাত্মক কারণও আছে।  বাঙালির মনে বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতি সম্বন্ধে ‘নবজাগরণ’, ‘নোবেল পুরস্কার’ ইত্যাদি প্রসূত একটা উচ্চম্মন্যতার বোধও আছে, হিন্দি তার তুলনায় কিছুই নয়— এমন একটা ধারণা তো ছিলই, তার পর বাঙালি যে ভাষাকে পুজো করত, এবং এখনও নিশ্চয়ই করে, সেই ইংরেজির তুলনায় হিন্দি একেবারেই ‘তুরুশ্চু’— এ রকম একটা চিন্তাও বোধ হয় ছিল। কিন্তু হিন্দি ফিল্ম, হিন্দি গান, হিন্দিভাষী প্রতিবেশের সাংস্কৃতিক ও ভাষিক প্রভাব সে এড়াবে কী করে? আর ঊনবিংশ শতাব্দীতেই লক্ষ্য করা গিয়েছিল যে, ভারতে হিন্দি ভাষার ব্যবহার বাংলার চেয়ে অনেক ব্যাপক, তাই ভূদেব মুখোপাধ্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত হিন্দিকে সরকারি কাজে ব্যবহারের ভাষা হিসেবে সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু এ সব কথা বাঙালি অস্বস্তির সঙ্গে মেনেছে, এবং সংবিধানের ভাষাবিতর্কের সময় হিন্দির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হয়েছে। এমনকি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর আগেকার মতামত ভুলে সংস্কৃত ভাষাকে সরকারি ভাষা করার জন্য এক অবাস্তব সুপারিশ করেন। এর মধ্যে অবশ্য পুরুলিয়ার ভাষা আন্দোলন একটা অবিশ্বাসের উপাদান তৈরি করেছিল।      
হিন্দি আমাদের সংবিধানের ৩৪৩ ধারায় স্বীকৃত প্রশাসনিক ভাষা, এক হিসেবে ভারতের সবচেয়ে বৃহৎ ভাষাও বটে। শেষ জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী হিন্দি বলে জন্মভাষা হিসেবে প্রায় ৩২ কোটির বেশি লোক, আর দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বলে ২৭ কোটি লোক। পৃথিবীর নানা জায়গায় তার অভিবাসীর সংখ্যা বিপুল— আর ফিজি, সুরিনাম ইত্যাদি দূরান্তরে এক ধরনের হিন্দি মানুষের মুখেরও ভাষা।    
কিন্তু এই তুলনায় বৃহত্ত্বই হিন্দির একমাত্র সুপারিশ নয়। তার রাজনৈতিক শক্তি অন্য সব ভাষার চেয়ে বেশি, কারণ তা ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বের স্বীকৃত ভাষা, দক্ষিণের চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারি পর্যন্ত হিন্দির দাবি সমর্থন করেছিলেন। এক দিকে তার ‘ইনফরম্যাল’ সাংস্কৃতিক শক্তি (তাকে ‘অপসাংস্কৃতিক’ বললেও ঘটনা বদলায় না), অন্যদিকে তার রাজনৈতিক শক্তি তাকে দুর্ধর্ষ করে তুলেছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই ঘটনা যে, অসম, ওডিশা থেকে শুরু করে উত্তর–পুব ভারতের ত্রিপুরা সমস্ত রাজ্য হিন্দি ভাষাকে গ্রহণ করেছে।  আগে বাঙালিরা ওডিশা আর অসমে ‘বৃহৎ বঙ্গ’  অঞ্চলে ধরে নিত, এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, তারা সেই আত্মপরিচয়ের চেয়ে ভারতের অঙ্গ হতে বেশি আগ্রহী। ওখানে গিয়ে বাংলা বললে তাঁরা সহজে ফিরে বাংলা বলতে চান না।  এই না–চাওয়া অন্যায় বলে আমি মনে করি না।    
শক্তি বেড়েছে, কিন্তু যারা সেই শক্তির উৎস, তারা যদি মনে করে আমরা জোর করে এই শক্তি জাহির করব তখনই নানা  বিপত্তি ঘটবে। কস্তুরীরঙ্গণ কমিটির শিক্ষা–প্রস্তাবে এটা নেই, কিন্তু এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, বর্তমান শাসকদল এই অছিলায় নতুন করে অনিচ্ছুকদের ওপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। হিন্দির অন্যান্য গুণ বা উপযোগিতার চেয়ে তাকে নিয়ে ভিন্ন একটা সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে। ‘হিন্দু, হিন্দি, হিন্দুস্তান’— এই স্লোগান সম্বন্ধে প্রচুর ভারতীয়ের, এমনকি হিন্দিভাষীদেরও অনেকের নীতিগত আপত্তি তো আছেই। হিন্দুত্বের ধারণা হিন্দির ধারণাকে শক্তি দিলে তা যেমন হবে অবৈধ, তেমনই হিন্দুস্তানের ধারণাকেও তার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়।  আমরা মনে রাখি, ‘হিন্দুস্তান’ বলে কোনও দেশ নেই, আমাদের সংবিধানে দেশের স্বীকৃত নাম ‘ভারত’, ইংরেজিতে ‘ইন্ডিয়া’। এ দুয়ের সঙ্গে হিন্দুস্তানের কোনও যোগ নেই, আর ‘হিন্দু’ কথাটা যে মূলত ‘সিন্ধু’র অপভ্রংশ তাও আমাদের মনে আছে।  আর হিন্দি ‘রাজভাষা’ (‌কেন জানি না অনেক অবাঙালি বন্ধু এই শব্দটা ব্যবহার করেন) নয় জাতীয় ভাষা, ২০১০ সালে গুজরাট হাইকোর্টের রায় তা জানিয়েই দিয়েছে। অষ্টম তফসিলের আরও একুশটা ভাষাও ‘জাতীয়’ ভাষা। যাই হোক, শিক্ষামন্ত্রী এবং স্বয়ং কস্তুরিরঙ্গণের সাফাইয়ে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা আপাতত দূর হয়েছে।  
তবে (বা তবু) হিন্দি শিখব কেন?  শিখব নিজেদের প্রয়োজনে। ভারতের একটা বৃহৎ অংশের সঙ্গে কথা বলতে পারার সুযোগ তৈরি করব, তাতে আমাদের সুবিধেই হবে। কর্মক্ষেত্রেও হিন্দি কাজে লাগবে। প্রয়োজনেই মানুষ ভাষা শেখে, ভাষা ব্যবহার করে।  প্রয়োজন না থাকলে শেখা ভাষা ভুলতে সময় লাগে না।  অন্য ভাষাও নিশ্চয়ই শিখব।  হিন্দি নিয়ে ঠাট্টা করতেই পারি, ‘কণ্ঠলাংগোঠি’ (necktie), ‘বালুডাকিনি’ (sandwich), ‘গোপন ছুকরি’ (private secretary), ‘টেবিলকা উপর বাত্তিকা নীচে লে ঠকাঠক, দে ঠকাঠক’ (‌টেবিল টেনিস) ইত্যাদি বলে আসর জমাব, কিন্তু দরকার বুঝলে হিন্দি ভাষাটা ভাল করে শিখব। অন্যেরাও বাংলা নিয়ে ঠাট্টা করুক না!  তাতে ভাষার কিছু এসে যায় না।  
কিন্তু ক্ষমাহীন অপরাধ করব তখনই যখন অতি উৎসাহে নিজের ভাষাটাকে তুচ্ছ জ্ঞান করব, অন্য ভাষার সঙ্গে তার খিচুড়ি তৈরি করব, অথচ ২১ ফেব্রুয়ারি আর ১৯ মে এলে বুক চাপড়াতে থাকব।  একটা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে বিবিসি বাংলাকে পৃথিবীর মধুরতম ভাষা বলেছে বলে বড়াই করব। খবর নিন, বিবিসি এ কথা বলেনি। কিন্তু পৃথিবী মধুরতম বলুক না বলুক, বাংলা আমার মাতৃভাষা।  কেউ বলুক বা না বলুক, আমরা জানি বিপুল তার গৌরব, অসীম তার শক্তি ও সৌন্দর্য। ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক...’ ‌

ছবি: টি এরা

জনপ্রিয়

Back To Top