‌‌তাপস গঙ্গোপাধ্যায়- গত ২৫ জুলাই নব্বইয়ে পা–‌রাখার কথা ছিল সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের। রেখেও ছিলেন। জন্ম ১৯২৯ সালে অসমের তেজপুরে। বাবা নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পেশায় ব্যবসায়ী মা বীণাপাণিদেবী। ২ ‌ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সোমনাথ। বড়দা দেবনাথ অল্প বয়সে মারা যান। মাঝে ৩ দিদি— অনিতা, নমিতা ও কবিতা। তেজপুরে জন্ম হলেও, সোমনাথ বড় হয়েছেন কলকাতায় এবং সেই কলকাতায় যখন ভবানীপুর ছিল কলকাতার নামী আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্যবসায়ীদের বসতভূমি। ছেলেবেলায় সোমনাথ থাকতেন ৫২ হরিশ মুখার্জি রোডে, যে বাড়িটাকে তখন বলা হত আলিপুর চিড়িয়াখানার মিনি সংস্করণ। হরিণ, ময়ূর, শজারু, খরগোশ— নানা জাতের পশু‌পাখি এবং একটি মাছ ভর্তি পুকুর ছিল ওই ভবনের প্রধান আকর্ষণ। আর ওই বাড়িতে থাকতেন সোমনাথের কাকারা। যৌথ পরিবারের অন্যতম সেরা ফসল ছিলেন সোমনাথ। তার প্রমাণ তাঁর পরবর্তী জীবন।
নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত নামী ব্যারিস্টার ছাড়াও ছিলেন আদ্যোপান্ত রাজনীতির লোক। হিন্দু মহাসভার সভাপতির দায়িত্ব যেমন পালন করেছেন, তেমনই ১৯৪৮–‌এ পশ্চিমবঙ্গে তেভাগা এবং তখনকার মাদ্রাজ প্রদেশের, আজকের তেলেঙ্গানায় কৃষক আন্দোলনে সিপিআই যখন ‘‌এ আজাদি ঝুটা হ্যায়’‌ বলে‌, সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়ে ভারত সরকারের কোপে পড়ে নিষিদ্ধ হয়, তখন এনসি চ্যাটার্জি অল ইন্ডিয়া সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের তরফে আদালতে কমিউনিস্টদের হয়ে মামলা লড়েন। কমিউনিস্ট পার্টি কট্টর হিন্দু মহাসভা–‌বিরোধী হলেও, জ্যোতি বসু কখনও নির্মলচন্দ্রের সাহায্য বিস্মৃত হননি। তাই দেশের প্রথম নির্বাচনে (‌১৯৫১–’‌‌৫২)‌ কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনে নির্দল প্রার্থী হয়ে নির্মলচন্দ্র লোকসভার ভোটে দাঁড়ান ও জয়ী হন। হিন্দু মহাসভার সভাপতিকে যে কট্টর হিন্দুত্ববাদী হতে হবে, এরকম কোনও রাজনীতি নির্মলচন্দ্র যেমন জীবনে মানেননি, পরবর্তী জীবনে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র সোমনাথ, সিপিএমের সদস্য হয়েও, সিপিএমের টিকিটে লোকসভার সদস্য থেকে স্পিকার হয়েও রাজনৈতিক গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দেননি।
স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশন সোমনাথদের হরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির উল্টোদিকেই। সেই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, প্রেসিডেন্সি কলেজের বিএ, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে সে যুগের সফল আইনজীবীদের সন্তানদের মতো সোমনাথও প্রথমে যান কেমব্রিজে। সেখানেও পর পর বিএ এবং এমএ পাশ করেন। পরে লন্ডনের মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টার হয়ে ঘরে ফেরেন। শুরু হয় বাবার মতোই কলকাতা হাইকোর্ট থেকে তাঁর আইনজীবী জীবন এবং পরবর্তী পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম সেরা আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি পান।
পাশাপাশি বাবার মতোই শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন।
১৯৬৮ সালে সিপিএমের মেম্বার হন সোমনাথ। তিন বছর পরে ১৯৭১–‌এ বাবার মৃত্যুর ফলে লোকসভা আসনের যে অন্তর্বর্তী নির্বাচন হয়, পার্টির নির্দেশে সোমনাথ দাঁড়ান এবং জয়ী হন। সেই শুরু। ১৯৭১ থেকে ২০০৯— টানা ৩৮ বছর ছিলেন লোকসভার সদস্য, মাঝে অল্প সময়ের একটি ব্রেক ছাড়া। সেই ব্রেকই জন্ম দেয় রাজ্যের আর এক রাজনৈতিক তারকা মমতা ব্যানার্জির। ১৯৮৪–‌র লোকসভা নির্বাচনে সোমনাথ জীবনে প্রথম ও শেষবার হারেন। মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার চেয়েও সঞ্জীব ও তীর্থঙ্কর নামে দুটি ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যুর আদালতে সিবিআই তদন্তের দাবির বিরোধিতা করেই ডেকে আনেন তাঁর পরাজয়। সংবাদমাধ্যমের প্রচারই ছিল সেদিনের পরাজয়ের মূল কারণ। ওই পরাজয়ের পর ওই বছরই বোলপুর লোকসভার সিপিএম প্রার্থী ডাঃ শরদীশ রায়ের আকস্মিক মৃত্যুর ফলে অনুষ্ঠিত অন্তর্বর্তী নির্বাচনে বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে হারিয়ে তিনি আবার লোকসভায় যান। ১৯৯৬ সালে লোকসভা তাঁকে সেরা সাংসদের সম্মানে ভূষিত করে।
জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় রাজ্যের শিল্পোন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন সোমনাথ। ওই পর্বে রাজ্যের ও দেশের তাবৎ শিল্পপতিদের একটা বড় সংখ্যা এ রাজ্যে শিল্পস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং–‌এ সই করেন। কাগজে এ সময়ে তাঁর নামকরণ হয় ‘‌মউদাদা’‌।
২০০৪–‌এর নির্বাচনে অটলবিহারী বাজপেয়ীর এনডিএ–‌র হারের পর ড.‌ মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ–‌১ ক্ষমতায় আসে। সোমনাথবাবুর দীর্ঘ লোকসভা জীবনের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি তাঁকে অন্য সদস্যদের শপথগ্রহণের জন্য প্রোটেম স্পিকার নিযুক্ত করেন। প্রোটেম স্পিকার থেকেই তিনি সরাসরি ওই চতুর্দশ লোকসভার স্থায়ী স্পিকার হন। কারণ, ওই সময় সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট বাইরে থেকে ড.‌ সিংয়ের মন্ত্রিসভাকে সমর্থন জানায়। বিরোধ বাধে, যখন চার বছর পর ড.‌ মনমোহন সিং পরমাণু শক্তি প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে অগ্রসর হন। সিপিএম এই ইস্যুতে তাদের সঙ্গে বামফ্রন্টের সমর্থন প্রত্যাহার করে। দল থেকে সোমনাথবাবুকেও স্পিকার পদে ইস্তফা দিতে বলা হয়। সোমনাথবাবু পরিষ্কার বলেন, লোকসভার অধ্যক্ষ পদটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং নিরপেক্ষ। তিনি পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। সিপিএমের তখনকার সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। এই ঘটনাটি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালিদের একটি বড় অংশকে যে সিপিএম–‌বিমুখ করে তোলে, তার প্রমাণ মমতা ব্যানার্জির তৃণমূলের একের পর এক জয় ও সিপিএমের ক্রমাগত হার ও হ্রাসপ্রাপ্তি। তবে সোমনাথবাবু আর নির্বাচনে দাঁড়াননি। ২০০৯–‌এ চতুর্দশ লোকসভার আয়ু শেষ হলে নিজেই বাণপ্রস্থে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পরবর্তী ৮ বছর দক্ষিণ কলকাতার বসন্ত রায় রোডের অন্যতম এই বিখ্যাত বাসিন্দা একটা বড় সময় কাটিয়েছেন স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের নিয়ে কখনও কলকাতা, কখনও শান্তিনিকেতনে। সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত না থাকলেও, দেশের কোথাও রাজনৈতিক অনাচার ও অজাচার হলেই তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠে জোয়ার আসত।
লালগোলার বিখ্যাত রাজপরিবারের সন্তান রেণুদেবীকে সোমনাথ বিয়ে করেন বিলেত যাওয়ার আগে, ১৯৫০–এ। ছেলে প্রতাপ চট্টোপাধ্যায় বাপ–‌ঠাকুর্দার মতোই আইন পেশায় যুক্ত। দুই মেয়ে অনুরাধা ও অনুশীলা পিতৃঅন্ত প্রাণ। মনে আছে, ২০০৪–‌এ সোমনাথবাবু যখন স্পিকার হন, তখন মেয়েদের অনুরোধ এড়াতে না পেরে ওই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, রাশভারী মানুষটি নির্বাচনী ধকলের ছাপ মুখ থেকে তুলে ফেলার জন্য ফেসিয়ালে রাজি হন। দক্ষিণ কলকাতার সেই হরিশ মুখার্জি রোডের একটি সাঁলো থেকেই এসেছিলেন নরসুন্দর, দেশের ৫৪২ জন লোকসভা সদস্যের অধ্যক্ষকে ফর্সা করতে। এ প্রসঙ্গ তুললেই সোমনাথবাবু হেসে ফেলতেন। বলতেন, এ আমার মেয়েদের পাগলামি।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top