সুচিক্কণ দাস- লোকসভা ভোটের পর দেশে আরও একবার ক্ষমতায় বসতে চলেছে জোট সরকার। এমনই পূর্বানুমান দেশের অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের। এবং সেই অভিমুখে কিছু তৎপরতা শুরুও হয়ে গেছে।
গত শতকের নয়ের দশকের শেষ দিকে ভারতে জোট রাজনীতির সূচনা। এরপর জোট এগিয়েছিল নানা পরীক্ষা–‌নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে। সেই প্রক্রিয়াতেই একে একে এসেছিল ন্যাশনাল ফ্রন্ট, থার্ড ফ্রন্ট, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (‌এনডিএ)‌ ও ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (‌ইউপিএ)‌। শেষ পর্যন্ত জোট হিসেবে টিকে যায় এনডিএ ও ইউপিএ। এবার ভোটের আগে থেকেই অবশ্য বিজেপি ও কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে ন্যাশনাল বা থার্ড ফ্রন্টের আদলে ফেডারাল ফ্রন্ট গড়ার ভাবনা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এবং সেই প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন টিআরএস নেতা কেসিআর।
এনডিএ ও ইউপিএ জোট টিকে যাওয়ার কারণ এই দুই জোটের নেতৃত্বে রয়েছে জাতীয় চরিত্রের দল বিজেপি ও কংগ্রেস। এই দুই স্থায়ী চরিত্রের জাতীয় দলকে কেন্দ্র করেই জড়ো হয় আঞ্চলিক দলগুলি। এককভাবে কংগ্রেসের দেশ শাসনের পালা শেষ হওয়ার পর মাঝের একটা পর্ব বাদ দিলে, জাতীয় ও আঞ্চলিক দল মিলে জোট গড়ে দেশ শাসনের ব্যবস্থাটা এদেশে এখন একটা ব্যবস্থা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে ২০১৪–‌র লোকসভা নির্বাচন ছিল একটা ব্যতিক্রম। সেবার এককভাবে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেয়ে দেশশাসনের ভার পেয়েছিল বিজেপি। দীর্ঘদিন পর স্থানিক, আঞ্চলিক, ধর্মীয়, জাতপাতগত সমীকরণ সরিয়ে রেখে বিজেপিকে, আরও বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদিকে, দুহাতে সমর্থন দিয়েছিলেন এদেশের ভোটদাতারা। ফলে, ২০১৪–‌র নির্বাচন ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটা উল্লেখযোগ্য বছর হিসেবে থেকে যাবে।
আঞ্চলিক দলগুলির শক্তি
এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো। ভারতের রাজনীতিতে জাতীয় দলগুলির ভূমিকা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, তার পাশাপাশি আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান, বিস্তার ও সংহতিও জাতীয় রাজনীতির একটা স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নীচের সারণির দিকে নজর দেওয়া যাক:

জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলির প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ

দল        ১৯৯৬     ১৯৯৯     ২০০৫     ২০০৯     ২০১৪
বিজেপি ২০.২৯   ২৩.৭৫   ২২.১৬   ১৮.৮০      ৩১
কংগ্রেস  ২৮.৮০   ২৮.৩০  ২৬. ৫৩  ২৮.৫৫      ১৯
চার বাম 
দল        ৯.১০        ৫.৪০     ৭.৪২     ৭.৪৫  ৪.৬৩
আঞ্চলিক 
দল        ৩০.৯২  ৩১.৬৭    ৩৫.৬৬  ৩৪.৬৬ ৩৪.৩৭
নির্দল     ——    ——                              ৫.১৯     (অন্যান্য)                                                       ১০
সূত্র : নির্বাচন কমিশন
ওপরের সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে, গত ২৫ বছর অর্থাৎ আড়াই দশক বা সিকি শতাব্দীর পরিসরে  বিজেপির ভোটের হার দাঁড়িয়েছে গড়ে ২৩.২% এবং কংগ্রেসের গড় ভোটের হার দাঁড়িয়েছে ২৬.২৩%। দুই জাতীয় দল মিলে ৪৯.৪৩%। উল্টোদিকে, একই সময়ের পরিসরে আঞ্চলিক দলগুলির গড় ভোটের হার দাঁড়িয়েছে, ৩৩.৪৫%। তবে এই ভোট সারা দেশজুড়ে বহু ছোটবড় আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে বিভাজিত। কিন্তু সব মিলিয়ে ধরলে আঞ্চলিক দলগুলির মোট ভোটের শতাংশ এক তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। এটাও খেয়াল করা দরকার যে, ব্যতিক্রমী বছর ২০১৪ সালেও আঞ্চলিক দলগুলির শক্তি তেমন ক্ষয় হয়নি। এই সিকি শতাব্দীর পরিসরে বামেদের গড় ভোটের হার দাঁড়িয়েছে ৬.৮%। যদিও ৯৬–‌এর তুলনায় ২০১৪ সালে বামেদের ভোট যথেষ্টই কমেছে।
‘‌‌নানা ভাষা, নানা মত’‌
আঞ্চলিক দলগুলিকে বিশ্লেষণ করলে মোটা দাগের কতগুলি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে।
১)‌ এদের মধ্যে কিছু দল নিজ নিজ রাজ্যে নির্ধারক শক্তি এবং তারা ওইসব রাজ্যে ঘুরে ফিরে এককভাবে বা জোট গড়ে ক্ষমতায় আসে। তৃণমূল, ডিএমকে, এআইএডিএমকে, তেলুগু দেশম, টিআরএস, আরজেডি, অকালি দল, শিবসেনা, এনসিপি, জেডিইউ, জেডিএস, এসপি, বিএসপি, অগপ, ন্যাশনাল কনফারেন্স এই ধরনের দল। 
২)‌ আবার এদের চেয়েও অনেক ছোট ছোট দলও রয়েছে যাদের ভোটের শতাংশ বা আসন তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। কিন্তু সরকার গড়ার সংখ্যা জোগাড় করার জন্য জোটে তাদের মর্যাদা বাড়ে কিংবা কমে। 
৩)‌ বড় আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে মূলত দুটি ধরন দেখা যায়। জাতপাত ভিত্তিক ও আঞ্চলিক ভাষা বা সংস্কৃতি ভিত্তিক। মধ্য ও উত্তর ভারতে প্রথম ধরনের ও দক্ষিণে দ্বিতীয় ধরনের দলগুলির আধিক্য রয়েছে।
৪)‌ আঞ্চলিক দল আবার সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে রয়েছে মূলত দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তরপূর্ব এবং উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়ে।
৫)‌ এই সব দলগুলির একটা বড় অংশ কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয়েছিল। পরে সেই দলগুলি আঞ্চলিকতা বা জাতপাতের ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের শক্তি সংহত করে। অনেক রাজ্যে নিখাদ আঞ্চলিকতার ভিত্তিতেই স্বাধীনভাবে দলগুলির উদ্ভব হয়। বিজেপি ভেঙে এখনও কোনও আঞ্চলিক দল তৈরি হয়নি। 
৬)‌ এ ধরনের দলগুলির একটা বড় অংশ নানা ধরনের রাজ্যগুলির বৃহত্তর কৃষক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। তারা নিজ নিজ রাজ্যের শহুরে মধ্যবিত্তকেও কাছে টানে। বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্ষমতাসীন আঞ্চলিক দলগুলির সরকারের সঙ্গে যোগসূত্র থাকলেও, শিল্পমহল আসলে নির্ভর করে থাকে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর।
গত সিকি শতাব্দীর অভিজ্ঞতা বলছে, চাইলেই ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট থেকে বহুবিধ বৈচিত্র‌্যসম্পন্ন আঞ্চলিক এইসব দলগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। বরং কোনও কোনও রাজ্যে তারা আরও বেশি শক্তি সঞ্চয় করে চলেছে। এখানেই লুকিয়ে রয়েছে ভারতীয় সংবিধানের ফেডারালিজমের শক্তি। গত শতকে কংগ্রেসে বিরাট আকারের ভাঙনের পরবর্তী দশকগুলিতে, বিশেষত গত সিকি শতাব্দীতে এভাবেই ফেডারালিজম এদেশে এক অন্য চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলিই হল ফেডারালিজমের আরেক রূপ। এটাই ভারতীয় বহুত্ববাদকে ধরে রাখার নতুন আধার। 
এভাবে ভাবলে আঞ্চলিক দলগুলির শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে দিয়েই ভারতীয় ইতিহাসের আধুনিক ধারাকে মেনে নেওয়া হয়। মেনে নিতে হয়, যে শুধু প্রাচীন আঞ্চলিক সংস্কৃতি বা প্রাচীন ধর্ম বা নিখাদ জাতপাত নয়, আধুনিক রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারিত্ব ভিত্তিক এই দলগুলি ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো ভারতীয় সমাজেরও একটা অঙ্গ। এদের মধ্যে রয়েছে সমকালীন অর্থনীতি ও রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আবার অনেক দলের মধ্যে টিকে আছে প্রাচীন জাতপাত ও ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতির অনেক উপাদান। অগ্রসরতা ও পশ্চাদ্‌পদতার  দ্বান্দ্বিক সঙ্ঘাতের মধ্যে দিয়েই এগোচ্ছে প্রক্রিয়াটি। তবে অনেক সময় সাময়িক রাজনৈতিক লাভের জন্য সুবিধাবাদী অবস্থানও নিতে দেখা যায় কোনও কোনও দলকে। এতে তাদের ভাবমূর্তিরও সমস্যা তৈরি হয়। 
দ্বিমুখী সম্পর্ক
জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে সম্পর্কও দ্বিমুখী। যে–‌কোনও ভোটের সময়, (‌লোকসভা, বিধানসভা, পঞ্চায়েত, পুরসভা)‌ এই দলগুলির মধ্যে সম্পর্ক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার। ভোটে কে কাকে হারিয়ে ক্ষমতা দখল করবে, সে নিয়ে তীক্ষ্ণ সঙ্ঘাত চলতেই থাকে।
কিন্তু রাজ্য বা স্থানীয় রাজনীতিতে নিজ নিজ পরিসর ছেড়ে যখন আঞ্চলিক দলগুলি জাতীয় দলের সঙ্গে জোট বেঁধে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল করে, তখন তাদের সম্পর্ক কিন্তু সহযোগিতামূলক। মূলত সহযোগিতা লাগে সরকার টিকিয়ে রাখতে।
কিন্তু আঞ্চলিক শক্তি চিরকাল তো আঞ্চলিক থেকে যাবে না। কারণ তাকেও গোটা দেশ শাসনের স্বার্থে তাদের জাতীয় স্বার্থে মাথা ঘামাতে হবে (প্রতিরক্ষা, টেলিকম ইত্যাদি মন্ত্রকের গুরুত্ব)।  আবার, যে–‌কোনও জন উন্নয়ন কর্মসূচিকে (‌দারিদ্র‌্য দূরীকরণ, কৃষি সমস্যা)‌ কার্যকর করতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব এলাকা নেই। কারণ দেশের প্রধান প্রধান এলাকাগুলো তো রাজ্যগুলিরই কর্তৃত্বে। সেখানে জাতীয় দলকে মাথা ঘামাতে হবে রাজ্যগুলির নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতকে কেন্দ্র করে।  এখানেই দু’‌তরফের সহযোগিতার একটা পৃথক ক্ষেত্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষত এই শতকে দারিদ্র‌্য দূরীকরণ, সাক্ষরতা বা কৃষি সমস্যা যদি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়, তাহলে জাতীয় সরকার, আঞ্চলিক সরকার, দুই সরকারের আমলা, রাজ্য ও কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ দল, সবাইকে নিয়ে গড়ে তোলা যায় পৃথক একটা ফোরাম। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি আলোচনা করে একটা রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে। এভাবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলির তালমিলের একটা পথ খোলা যায় কিনা, তা ভেবে দেখা যেতে পারে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top