আজ এমন পেশার মানুষদের নিয়ে লিখব, যাদের কথা তেমন করে কেউ বলছে না। দু–‌একজন যদি বা বলেও থাকে তা একেবারেই ব্যতিক্রম।  যদি বলা উচিত ৮০, বলেছে ১০ বা ১৫।
এই কোভিড দুঃসময়কালে কত যোদ্ধার কথা শুনছি। বলছিও।  কিন্তু ‘‌তাহাদের কথা’‌ কেন বাদ?‌
অনেকদিন ধরেই জেনে এসেছি, পুলিশকে গাল দেওয়াটাই রীতি। সেটাই বৈপ্লবিক, প্রগতিশীল, তারুণ্যের জোয়ার, জাগরণের উন্মেষ, চেতনার বোধোদয়। পুলিশকে গাল মানে তুমি শিক্ষিত, তুমি সাহসী। পুলিশকে গাল মানে ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির।’‌ পুলিশকে গাল মানে ‘‌সাথীদের খুনে রাঙা পথে দেখো হায়নার আনাগোনা’‌।  শেখানো হয়েছে, পুলিশ হচ্ছে ‘‌রাষ্ট্রের নিপীড়ন যন্ত্র/‌ প্রতিবাদ ভেঙে দেওয়ার মন্ত্র’‌। নিরীহকে ধরে পেটানো ছাড়া পুলিশের আর তেমন কোনও কাজ নেই। এছাড়া পুলিশের নাকি আর একটাই কাজ রয়েছে। ঘুষ খাওয়া। না না, একটা নয়, দুটো কাজ। ঘুষ খাওয়া আর ভিআইপি দেখলে ফটাফট স্যালুট করা। গদ্যে আছে, বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা। আর পদ্যে আছে, পুলিশ তুমি যতই মারো, মাইনে তোমার একশো বারো। মাইনে ‘‌একশো বারো’ এখন অবশ্য খাটে না।
এর সঙ্গে শিখেছিলাম, পুলিশের প্রশংসা করা মানে পুলিশের দালালি করা। আর পুলিশের দালালি মানে ‘‌দাও গলা কেটে’‌। ‌
আমার গলা কাটা যায় যাক, আমি আজ পুলিশের হয়ে ‘‌দালালি’‌ করব। করে দায়িত্ব পালন করব। গর্ব বোধ করব। বলব, বেশ করেছি। অনেক আগে করা উচিত ছিল। এই ফঁাকে বলে রাখি বাবা, আমার কোনও আত্মীয় পরিজন পুলিশে কাজ করেন না। আমার সঙ্গে কোনও পুলিশ কর্তার আলাপ নেই। আমাকে তো কেউ চেনেনই না। চেনবার কোনও কারণও নেই, আমি অতি সাধারণ। তারপরেও আমি তাদের হয়ে গলা ফাটাব।
এবার করোনার সময় বাংলায় পুলিশ যে ভূমিকা পালন করেছে এবং করছে তাতে এই ফোর্সের সকলকে মেডেল দেওয়া উচিত। তাদের পরের প্রজন্মের যেন সেই মেডেল দেখে বুক ভরে যায়। পুলিশের সর্বোচ্চ স্তর থেকে শুরু করে সাধারণ স্তর পর্যন্ত সবাই অসীম সাহসের সঙ্গে কাজ করছেন। অফিসার থেকে হাবিলদার। এমনকী সিভিক পুলিশ পর্যন্ত। সাহসের সঙ্গে রয়েছে কর্তব্য বোধ, মানবিকতা এবং প্রবল পরিশ্রম। দু’‌হাত তুলে এই ফোর্সকে অভিনন্দন জানাই। হাতে না পারি মনে মনে ফুলের পাপড়ি ছুড়ে সংবর্ধনা জানাই।
পুলিশ ফোর্সের কর্তব্যবোধের খবর আমি প্রথম পাই দু’‌মাস আগে। আমার এক তরুণ প্রকাশক বন্ধুর কাছে। বরানগরের কাছে তার পাড়া কন্টেনমেন্ট জোন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল তখন। দোকান বাজার সব বন্ধ। থানা থেকে ফোন নম্বর দিয়ে গেল।
’‌কিছু দরকার হলে ফোন করবেন।’‌
সেই প্রতিশ্রুতি শুনে সবাই হেসে বঁাচে না। থানা প্রয়োজনের জিনিস বাড়ি বয়ে এনে দেবে?‌ বিশ্বাসই করতে চায় না কেউ। দুদিন পরেই সেই প্রকাশক তরুণটি মায়ের ওষুধ চেয়ে থানায় ফোন করে। নির্দিষ্ট সময়ে বাড়িতে ওষুধ চলে আসে। পরে শুনলাম, শুধু এই একজনের বাড়ি নয়, বাংলার কয়েক হাজার বাড়িতে ওষুধ, প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ। ভিআইপি নয়, সাধারণ মানুষের বাড়ি।
আচ্ছা, এই সময়ে পুলিশ কী করল না?‌
এই ভয়ঙ্কর সময়ে সবাই কোনও না কোনও সময়ে ঘরে। একমাত্র পুলিশ সব সময় পথে। সংক্রমণের খবর সবার আগে যায় তাদের কাছে। লোকাল থানায়। পেশেন্টকে হাসপাতালে, বাড়ির লোকদের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছে তাদেরই। সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীরা থাকলেও পুলিশকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হচ্ছে সবথেকে বেশি। গোড়ায় একাজ ছিল খুব কঠিন। বিপজ্জনক। কোনও এলাকা সংক্রমণের ভয়ে বন্ধ করে দিতে হলে ডাকতে হয়েছে সেই পুলিশকে। কেউ মারা গেল, সৎকারে নিয়ে যেতে হয়েছে এবং হচ্ছে পুলিশকে। কোনও কোনও সময় সেখানে নির্মম, অসভ্য, অমানবিক বিক্ষোভ হচ্ছে। সামলাচ্ছে পুলিশ। পাড়াতেও তাই। খবরে পড়লাম, এক পাড়ার কিছু ‘‌অমানুষ’ ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীকে পর্যন্ত‌ নিজের বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে না। অপরাধ তিনি হাসপাতালে যাচ্ছেন।‌ পাড়ায় থাকা চলবে না। পরিত্রাতার ভূমিকায় ছুটে গেছে পুলিশ। দোকানে, বাজারে, পথচারী, গাড়ির যাত্রীরা কেউ মাস্ক না পরলে বা  ভিড় করলে আমরা উল্টো দিকে পালাচ্ছি। পুলিশকে সেদিকেই যেতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি যাতে মানা হয় তার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে তাদেরই। অফিসে, বাজারে, ব্যাঙ্কে, নার্সিংহোমে কেউ সংক্রমণ হলে ‘‌সিল’ করবার ব্যবস্থা হয়েছে। কোনও থানা সংক্রমণের কারণে আজ পর্যন্ত সিল করা হয়েছে?‌ হয়নি। থানা ‘‌সিল’‌ করা যায় না। পুলিশকর্মীরা সেই অবস্থাতেও সবাই ডিউটি করেছেন। কামাই করেননি। অনেকেরই কম বেশি ‘‌ওয়ার্ক ফর্ম হোম’–‌এর ব্যবস্থা আছে। পুলিশ ফোর্সের নেই।‌ এর সঙ্গে রয়েছে ট্রাফিক সামলানো, নিত্যদিনের আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক দলের বিক্ষোভ। তাদেরও সামলাতে হচ্ছে।
আমি যতগুলো ঘটনা শুনেছি তাতে দেখেছি, এই সঙ্কটকালে সাধারণ মানুষের প্রতি পুলিশের আচরণ যথেষ্ট ভাল। এখন পর্যন্ত তেমন অভিযোগ শুনিনি। একদিকে নিজের প্রাণের ভয়, অন্যদিকে বিপুল কাজের চাপ, তারপরেও ‘‌ভাল‌ আচরণ’‌ রাখা খুব কঠিন।‌ তবে কোনও সময়ে ‘‌আচরণ’‌ এতটাই ‘‌ভাল’ হয়ে যাচ্ছে,‌ যে বিরক্তও লাগছে। মনে হচ্ছে, যে মাস্ক পরছে না, তাকে থানায় নিয়ে গিয়ে একদিন হাজতে রাখতে অসুবিধে কীসের?‌ বাকিদের শিক্ষা হত।
আজ লকডাউন শিথিল হওয়ায় এবং তিনটে মাস কেটে যাওয়ায় করোনা আতঙ্কে আমরা কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু প্রথম মাসের কথা একবার ভাবুন তো। নিঝুম, ভয়ঙ্কর আতঙ্কের পথে কারা ছিল সেদিন?‌ ছিল পুলিশ। একমাত্র পুলিশ।
একটা ঘটনা বলি।
দমদম থেকে এক পরিচিত আমাকে সেদিন ফোন করেছিলেন। ঘটনা তিনিই বললেন। তার বাবার বয়স এখন বাহাত্তর। তিনি কলেজে পড়বার সময়ে ছিলেন কঠিন বামপন্থী। পুলিশকে মনে করতেন ‘‌শ্রেণিশত্রু’‌। সেই বিশ্বাসে খবরের কাগজে আলতা দিয়ে পোস্টারও লিখেছেন। এপ্রিল মাসের এক রাতে ভদ্রলোকের হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হল। বাবার করোনা হয়েছে ভেবে আমার পরিচিতজন খুব ভয় পেয়ে যান। হাসপাতালে যেতে হবে। কিন্তু যাবেন কীসে? গাড়ি কোথায়?‌ প্রতিবেশী, যারা ‘‌শ্রেণিগত’‌ ভাবে এতদিনের ‘‌বন্ধু’‌ ছিলেন, তারা করোনা হতে পারে এমন ‘‌বন্ধু’র জন্য গাড়ি বের করতে অস্বীকার করেন। হয় গাড়ি খারাপ, নয় তেল নেই। শেষ পর্যন্ত পাড়ার মোড়ে টহলদারিতে থাকা একটি পুলিশ জিপ ভদ্রলোককে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ভদ্রলোকের করোনা হয়নি। পরীক্ষাও করতে হয়নি। পরদিনই বাড়ি ফিরে আসেন।
সময়কালে এবং পরিস্থিতিতে শ্রেণি বিন্যাস এবং শ্রেণি চরিত্র বদলায়। পুঁজির চরিত্র বদলে শত্রু, মিত্রের সংজ্ঞাও বদলে যায়। এখানে সেই গুরুগম্ভীর আলোচনায় যেতে চাই না। শুধু বলতে চাই, শত্রু মিত্র জানি না, কোভিড আতঙ্কে এইটা শিখেছি, পুলিশ ছুঁলে কত ঘা হয় জানি না, তবে এই সঙ্কটকালে সে হাত না বাড়ালে, অনেকের বড় বিপদ হয়ে যেত। জীবন মরণের বিপদ।
করোনার সঙ্কটকালে পুলিশ ফোর্স সম্পর্কে এই উপলব্ধি আমার কাছে একটা বড় প্রাপ্তি। হয়তো ভবিষ্যতের কোনও ঘটনায় ধারণা বদলাবে, কিন্তু এই উপলব্ধি মিথ্যে হবে না। করোনার লড়াইতে পুলিশকে দেওয়া অভিনন্দন, স্যালুট প্রত্যাহার করব না কোনওদিন।
এবার একটা দুঃখ প্রকাশ করবার পালা।
গত সপ্তাহে আমি এই কলমে একটি চমৎকার ভিডিওর খবর লিখেছিলাম। নাম ‘‌ভালবাসার ভাইরাস ছড়িয়ে দিন’‌। এখানে পাঠ করেছেন ডা.‌ কৌশিক লাহিড়ী। আমি নাম ভুল লিখে ফেলেছিলাম। দুঃখিত। অতি সুপরিচিত ডা.‌ লাহিড়ী সুচিকিৎসক, সুলেখক। তিনি পাঠেও যে এমন সুন্দর তা নিশ্চয় অনেকের জানা ছিল না। তঁার মেঘমন্দ্র কণ্ঠের পাঠ মর্ম স্পর্শ করল। ইউটিউবে দেখলে এবং শুনলে মন ভরে যায়। তবে এটি কোনও ‘‌প্রতিবেদন’‌ ছিল না, খবরটি এই অনামী, অখ্যাত মানুষটির ‘‌দেখব, বলব, শুনব’‌ নামের কলমে লেখা হয়েছিল। যে কলম এবং কলমচির নাম মনে রাখা অপ্রয়োজনীয়, ‘‌প্রতিবেদন’‌ মনে রাখাই সহজ। তবে এই প্র‌য়োজনীয় ভিডিওর খবর সবার আগে মুদ্রিত ভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে অখ্যাত কলমচি হিসেবে গর্ব বোধ করছি।
ভুল আরও একটা হয়েছে। ‘‌মানুষের মন’ পত্রিকার নাম উল্টো লিখে ফেলেছিলাম।
যাঃ বাবা, নামে এত ভুল হচ্ছে কেন?‌ আচ্ছা, নাম টাম লেখা একদম বন্ধ‌ করে দিলে কেমন হয়?‌ নো নাম, নো ভুল। ভেবে দেখি।
মন ভাল?‌ নাকি মন খারাপ?‌ কোন গল্প দিয়ে আজকের কলম শেষ করব?‌ জানি না। একটা ঘটনার কথা লিখি, যার যা ইচ্ছে ভেবে নেবেন।
সেদিন দুপুরে যে বাড়ি থাকি তার গেট খুলছি। নিঝুম, শুনশান পথ। কড়া রোদ। আমার মুখে মাস্ক, মাথায় টুপি, হাতে গ্লাভস। তাড়াতাড়ি গেট খুলে বাড়ির নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে যেতে পারলে বঁাচি। হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, একটি ‌ছাব্বিশ সাতাশ বছরের তরুণ। ফিটফাট পোশাক। ফুলহাতা শার্ট। চকচকে জুতো। হাতে ফাইল।
‘‌এক্সকিউজ মি।’‌
আমি বললাম, ‘‌কিছু বলবেন?‌’‌
‘‌আমি.‌.‌.‌ব্যাঙ্ক থেকে আসছি। একটা অ্যাকাউন্ট কী করতে পারবেন?‌’‌
আমি থমকে গেলাম। বললাম, ‘‌আমাকে মাপ করবেন।’‌
ছেলেটি পৃথিবীর সবথেকে মলিন হেসে বলল, ‘‌না না, কোনও অসুবিধে নেই।’‌
ছেলেটি অসহায় ভাবে আবার এ বাড়ি ও বাড়ির দিকে তাকিয়ে এগোতে থাকে। যদি কাউকে দেখা যায়। আবার যদি এই ঘন দুপুরে কাউকে বলা যায়— ‘একটা অ্যাকাউন্ট কী করতে পারবেন?’‌
সে জানে এই করোনা সময়ে কেউ অচেনা মানুষকে বাড়িতে ঢুকতে দেবে না, কাছে এসে কথাও বলতে চাইবে না। এই ভয়ঙ্কর আর্থিক সময়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা তো অসম্ভব। তারপরেও সে সকালে জুতো পালিশ করে, চুল আঁচড়ে বেরিয়েছে। উপায় যে নেই। একটা অ্যাকাউন্ট করতে পারলে হয়তো একটু কমিশন মিলবে। যা এখন প্রায় অসম্ভব।
এটা কি মন খারাপ?‌ নাকি মন ভাল করবার গল্প?‌
আমার কাছে মন ভাল করবার। সহজে মৃত্যুর দিনে কঠিন বেঁচে থাকবার লড়াই যে মানুষ লড়ছে, তাকে দেখলে আমার মন ভাল হয়ে যায়। এই তরুণটিও আমার কাছে কোভিড ওয়্যারিয়র। কোভিড যোদ্ধা।
হে অচেনা তরুণ, তোমাকে সেলাম।

জনপ্রিয়

Back To Top